ইরানের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার কারণ কী?

আজাদ ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

ভঙ্গুর অর্থনীতির প্রতিবাদে তেহরানের বড় বাজারের ব্যবসায়ীরা সপ্তাহ চারেক আগে যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন, তা অনেকটা স্তিমিত হয়ে এলেও ইরানের সিংহভাগ মানুষ এখনও ইন্টারনেট সেবার বাইরে রয়েছেন।

গণআন্দোলনে রূপ নেওয়া ওই বিক্ষোভের পর দেশটির বেশির ভাগ মানুষ এখন ঘর থেকে বের হওয়ারও সাহস পাচ্ছেন না। কারণ বিক্ষোভে যোগ দেওয়া হাজার হাজার মানুষকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে; প্রাণ গেছে বহুজনের। ইরান সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করেনি।

তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা— হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির হিসাবে, বুধবার পর্যন্ত ২ হাজার ৬১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও এই সংখ্যাকে ‘অতিরঞ্জিত’ দাবি করেছে ইরান সরকার।

আন্দোলনকারীদের উপর দমনপীড়নের প্রতিবাদে চলতি সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দেন। তাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে যায়।

তবে বুধবার তিনি কিছুটা পিছু হটেন এবং জানান, তেহরান আন্দোলনকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা থেকে বিরত থাকার আশ্বাস দিয়েছে।


কিন্তু বিক্ষোভকারীরা আপাতত চুপচাপ থাকলেও তাদের উদ্বেগ দূর হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কাও রয়ে গেছে।

এছাড়া যে ভঙ্গুর অর্থনীতির কারণে মাস খানেক আগে বিক্ষোভ দানা বেঁধেছিল, তা আরও খারাপ হয়েছে বলে আল জাজিরার এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

অর্থনীতি নিয়ে বিক্ষোভ কেন?
লন্ডনের ‘এসওএএস’ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এমেরিটাস অধ্যাপক হাসান হাকিমিয়ান বলেন, “এবারের অস্থিরতার মূল কারণ নিঃসন্দেহে অর্থনীতির ভঙ্গুর দশা।

“দশকের পর দশক ধরে দেশটিতে যে দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা চলছে, তা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে আরও তীব্র হয়েছে। আর এ বিষয়টি সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশকে চরম দুর্ভোগে ফেলেছে।” তিনি বলেন, “এর বাইরে গেল কয়েক মাসে ইরান তীব্র পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। পানি-বিদ্যুতের ভয়াবহ সংকট ও মারাত্মক বায়ুদূষণ, যা একসঙ্গে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

ইরানি মুদ্রা— রিয়ালের বিনিময় মূল্য এখনো অনেক কম। গত ২৮ ডিসেম্বর ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দাম রেকর্ড নিচে নেমে গেলে প্রথম বিক্ষোভ শুরু হয়।

বিক্ষোভ দমাতে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়ায় দেশটিতে এটিএম সেবা এখনও বন্ধ রয়েছে এবং ফ্লাইট চলাচলও স্বাভাবিক হয়নি।

ভার্জিনিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক জাভাদ সালেহি-ইসফাহানি বলেন, “যদি ধরে নেওয়া যায় যে আন্দোলনের কারণে প্রায় এক মাস শাটডাউন চলেছে, তাহলে বলা যায়, এই সময়ে ইরানের অর্থনীতি প্রায় ৫০ শতাংশ সচল ছিল। “সেই হিসাবে এক মাসে দেশটির জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। ডলারে এই ক্ষতির পরিমাণ নির্ভর করে কোন বিনিময় হার ধরা হচ্ছে, তার ওপর। তবে এক বছরে সেটি আনুমানিক ২ হাজার থেকে ৯ হাজার কোটি ডলারের মধ্যে হতে পারে।”

নিষেধাজ্ঞার প্রভাব ফেলেছে যেভাবে
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের সময়কার ইরানের অর্থনীতি এবং আজকের অর্থনীতির রাত-দিন পার্থক্য। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা এবং অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারে পরিবর্তন— সব কিছু মিলে অর্থনীতিকে প্রায় স্থবির করে দিয়েছে।

এই স্থবিরতার একটি বড় কারণ হলো, ইরান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশগুলোর একটি। ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শুরু হয় ইসলামি বিপ্লবের পরপরই; যুক্তরাষ্ট্রের হাত ধরে। এরপর ২০০৬ সালে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে জাতিসংঘ।

এর মধ্যে গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ বাঁধায় দেশটিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও নষ্ট হয়ে যায়।

১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনের অবসান ঘটে। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরান থেকে তেল আমদানি বন্ধ করে দেয় এবং ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের ইরানি সম্পদ জব্দ করে।

১৯৯৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন নির্বাহী আদেশ জারি করে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে ইরানের তেল ও গ্যাস খাতে বিনিয়োগ এবং ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করতে নিষেধ করেন।

এর এক বছর পর মার্কিন কংগ্রেসে একটি আইন পাস হয়, যেখানে ইরানের জ্বালানি খাতে বছরে ২ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বলা হয়।

২০০৬ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ পারমাণবিক শক্তি-সংক্রান্ত উপকরণ ও প্রযুক্তির বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা দেয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদ জব্দ করে।

পরের বছরগুলোতে জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করে; একই পথে হাঁটে ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ)।

২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও ইইউয়ের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তিতে সই করে ইরান।

এই চুক্তির আওতায় ইরান ১৫ বছর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও সংশ্লিষ্ট গবেষণা থেকে বিরত থাকতে রাজি হয়।

কিন্তু ২০১৮ সালে নিজের প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন এবং ইরানের ওপর সব নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেন।

২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে (আইআরজিসি) ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর।

এরপর ২০২০ সালের ৩ জানুয়ারি ইরাকের বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর ইরানের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইরানের ওপর আবার জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়। ওই সময় আর্থিক নিষেধাজ্ঞা স্থায়ীভাবে তুলে নেওয়ার একটি প্রস্তাব জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উঠলেও তা নাকচ হয়ে যায়।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের তেল থেকে আসা রাজস্বের প্রায় সবই অবরুদ্ধ রয়েছে। এছাড়া বিদেশে সম্পদ জব্দ ও বাণিজ্য সীমিত করার পাশাপাশি তাদের ব্যাংকগুলোকে নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত আর্থিক সংস্থা ও কোম্পানি এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের মতো সংস্থাকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এসব সংস্থা ও কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্র বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবসা করতে পারছে না।

বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান কেপলারের ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের রপ্তানি তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনছে চীন। নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এই তেলের সিংহভাগই পরিবহন করা হয় গোপন তেল ট্যাংকারের মাধ্যমে।


কী প্রভাব পড়ছে ইরানিদের ওপর?
গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ বাঁধার আগে থেকেই অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করতেন, ইরানের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের ফাঁদে আটকা পড়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব অনুযায়ী, ব্যাপক মূল্যস্ফীতির বিপরীতে ইরানের প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ০.৬ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা সাধারণত বার্ষিক ২ থেকে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে আদর্শ মনে করেন।

গত আট বছরে ইরানিদের ক্রয় ক্ষমতা প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার মান পড়ে যাওয়ায় খাদ্যদ্রব্যের দাম গত বছরের তুলনায় গড়ে ৭২ শতাংশ বেড়েছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে খোলা বাজারে ১ মার্কিন ডলারের মূল্য ছিল প্রায় ১৩ লাখ ৬০ হাজার রিয়াল, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন। দেশটিতে বেকারত্বের হারও বেশি; প্রায় ২০ শতাংশ।

এখন কী হবে?
নাম প্রকাশ না করে তেহরানের এক বাসিন্দা আল জাজিরাকে বলেন, “গত দুই–তিন দিনে বিক্ষোভ শান্ত হয়েছে, কারণ অনেক মানুষ নিহত হয়েছেন। তাই মানুষ ঘরের বাইরে যায়নি।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্দোলন স্তিমিত হয়ে এলেও অর্থনীতি নিয়ে মানুষের মধ্যে এখনও ক্ষোভ রয়েছে।

অধ্যাপক হাকিমিয়ান বলেন, “বাস্তবতা হল, দ্রুত সংকট সমাধানের কোনো উপায় বর্তমান শাসনব্যবস্থার কাছে নেই। তারা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বিক্ষোভ দমনে সফল হলেও মূল সমস্যাগুলো থেকেই যাবে। “যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ সম্ভবত কোনো ধরনের উপকার হবে না।”

বিষয়:

এলাকার খবর

সম্পর্কিত