ন্যাটো সম্মেলন শেষে প্রকাশ্যে এক বিমানে উঠলেও সেটি ছিল ‘ডিকয়’; খাবার বহনের কার্টে করে ট্রাম্পকে নেওয়া হয় অন্য সামরিক বিমানে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলন শেষে যে বিমানে উঠেছিলেন, সেটিকে দেখেই সবাই ধরে নিয়েছিলেন—সেখানেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পথে রওনা হয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে সেটি ছিল নিরাপত্তা কৌশলের অংশ। ইরানের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় ট্রাম্পকে গোপনে অন্য একটি সামরিক বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। আর সেই অভিযানে ব্যবহার করা হয় খাবার পরিবহনের বিশেষ কার্ট।
একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তা সোমবার এ তথ্য জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে ইরানের হুমকিকে যথেষ্ট গুরুতর ও বিশ্বাসযোগ্য মনে করেছিল মার্কিন কর্তৃপক্ষ। তাই প্রেসিডেন্টের প্রকৃত যাত্রাপথ গোপন রাখতে নজরদারি ও বিভ্রান্তি তৈরির কৌশল নেওয়া হয়।
ক্যামেরার সামনে এক বিমান, গন্তব্য ছিল অন্য
তুরস্কে যাওয়ার সময় ট্রাম্প কাতারের দেওয়া একটি বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমানে ভ্রমণ করেছিলেন। সম্মেলন শেষে ফেরার সময় তিনি পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান ব্যবহার করবেন—এমন তথ্যও প্রকাশ্যে জানানো হয়েছিল। ট্রাম্পকে সেই বিমানে উঠতেও দেখা যায়। কিন্তু সেটি ছিল আসলে একটি ‘ডিকয়’ বা বিভ্রান্তি তৈরির ব্যবস্থা।
প্রকাশ্য প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর ট্রাম্পকে খাবার পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত একটি বিশেষ কার্টে করে বিমানের নিচ থেকে বের করে আনা হয়। এরপর গাড়িতে করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আরেকটি বিমানের কাছে। ওই বিমানেই তিনি গোপনে তুরস্ক ছাড়েন।
ওয়াশিংটন পোস্টও এর আগে গোপন এই অভিযানের খবর প্রকাশ করেছিল। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পকে বহনকারী তৃতীয় বিমানটি ছিল সি-৩২এ—বোয়িং ৭৫৭-এর সামরিক সংস্করণ।
কেন এত গোপনীয়তা?
ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই—কেন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে প্রকাশ্যে ঘোষিত বিমান থেকে সরিয়ে নিয়ে এতটা গোপনীয়তার সঙ্গে অন্য বিমানে তোলা হলো? মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও ঘটনাপ্রবাহ থেকে এর প্রধান কারণ হিসেবে সামনে আসছে ইরানের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা।
তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প ও তাঁর ব্যবহৃত যেকোনো বিমান সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য হতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল মার্কিন কর্তৃপক্ষের মধ্যে। ফলে ট্রাম্প কোন বিমানে উঠেছেন, কোন পথে যাচ্ছেন এবং কোন বিমানটি প্রকৃতপক্ষে তাঁকে বহন করছে—এসব তথ্য আড়াল করাই ছিল নিরাপত্তা পরিকল্পনার অন্যতম অংশ।
এ কারণেই সাংবাদিকদেরও এমন একটি তথ্য দেওয়া হয়েছিল, যাতে ধারণা তৈরি হয় ট্রাম্প যে বিমানে উঠেছেন, সেটিতেই তিনি তুরস্ক ছাড়বেন। বাস্তবে সেটি ছিল অন্য একটি কৌশল।
আমেরিকার অনেক শত্রু তাকে টার্গেট বানিয়েছে’
হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেউং আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ট্রাম্পের যাতায়াতে বিভ্রান্তি তৈরির কৌশল ব্যবহার করা হয়। তিনি বলেছিলেন, আমেরিকার অনেক শত্রু প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। এসব হুমকি মোকাবিলায় বিভ্রান্তি তৈরি ও ভুল পথে পরিচালিত করার কৌশলসহ হাতে থাকা বিভিন্ন উপায় ব্যবহার করা হয়।
এই বক্তব্যের সঙ্গে তুরস্ক থেকে ট্রাম্পকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।
‘ডিকয়’ বিমান কেন?
নিরাপত্তা অভিযানে ‘ডিকয়’ বা বিভ্রান্তিকর বাহন ব্যবহারের উদ্দেশ্য হলো সম্ভাব্য হামলাকারী বা নজরদারিকারীদের প্রকৃত লক্ষ্য সম্পর্কে বিভ্রান্ত করা। তুরস্কের ঘটনাতেও প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে একটি বিমানে উঠতে দেখা গেছে। ফলে বাইরে থেকে নজরদারি করা কোনো পক্ষের কাছে সেটিই ট্রাম্পের প্রকৃত গন্তব্য বলে মনে হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
অন্যদিকে, খাবারের কার্ট ব্যবহার করে তাকে গোপনে সরিয়ে নেওয়া এবং পরে অন্য সামরিক বিমানে তোলা হয়। এতে ট্রাম্পের প্রকৃত যাত্রাপথ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
হুমকি কি নির্দিষ্ট কোনো বিমানের বিরুদ্ধে ছিল?
না—এমনটাই আগের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, হুমকিটি কাতারের দেওয়া নির্দিষ্ট বিমানটির বিরুদ্ধে ছিল না। ট্রাম্প যে বিমানেই ভ্রমণ করতেন, সেটিই সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য হতে পারত।
অর্থাৎ ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দু ছিল বিমানটি নয়, বরং ট্রাম্পের অবস্থান। এ কারণেই বিমান বদলের পাশাপাশি তাঁর যাত্রাপথ ও প্রকাশ্য গতিবিধি নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এয়ার ফোর্স ওয়ানও পুরোপুরি নিরাপদ নয়?
তুরস্ক থেকে ফেরার পরদিন সাংবাদিকদের দেওয়া বক্তব্যে স্টিভেন চেউং নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানের নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি জানান, নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ান অত্যাধুনিক এবং প্রেসিডেন্ট ও তাঁর কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এতে উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে।
তবে তুরস্কের ঘটনায় যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা হলো—আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকার পরও মার্কিন প্রেসিডেন্টের চলাচল নিয়ে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। প্রকাশ্যে একটি বিমানে ওঠা, এরপর খাবারের কার্টে করে গোপনে বেরিয়ে যাওয়া এবং অন্য একটি সামরিক বিমানে করে দেশ ছাড়ার পুরো ঘটনাই সেই সতর্কতার মাত্রা তুলে ধরে।
নিরাপত্তা ঝুঁকির নতুন ইঙ্গিত
তুরস্ক থেকে ট্রাম্পকে সরিয়ে নেওয়ার এই গোপন অভিযান শুধু একটি প্রেসিডেন্টের ভ্রমণ কৌশল নয়; বরং মার্কিন নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ইরানের সম্ভাব্য হুমকিকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে, তারও একটি ইঙ্গিত। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—ট্রাম্প কোথায় আছেন, কোন বিমানে আছেন এবং কখন কোথা থেকে উড়ছেন—এই তিনটি তথ্যই সম্ভাব্য হামলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রকাশ্যে এক বিমান, আড়ালে আরেক বিমান—আর মাঝখানে খাবারের কার্ট। তুরস্ক থেকে ট্রাম্পের ফেরার এই অস্বাভাবিক কৌশল শেষ পর্যন্ত একটি বিষয়ই সামনে এনেছে: **মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা এখন কতটা গভীর, তা বোঝাতে এই ঘটনাই যথেষ্ট।**