ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা প্রতিনিয়ত শহরটিতে হামলা চালিয়ে বাসিন্দাদের বাড়িঘর ও জমি দখল করছে বা আগুন দিচ্ছে
ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের শেষ খ্রিষ্টান-অধ্যুষিত শহর তায়বেহ এখন আতঙ্কের জনপদ। ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, জমি দখল, অগ্নিসংযোগ এবং চলাচলে বিধিনিষেধে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে প্রায় ১,২০০ মানুষের এই শহরের জীবন।
জেরুজালেম থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত তায়বেহ ঐতিহাসিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস, বাইবেলে বর্ণিত ‘এফ্রাইম’ এই শহরেই যিশু জেরুজালেমে শেষ যাত্রার আগে আশ্রয় নিয়েছিলেন। শহরটিতে রয়েছে পঞ্চম শতাব্দীর সেন্ট জর্জ গির্জার ধ্বংসাবশেষ।
কিন্তু সেই ঐতিহ্যের শহরেই এখন প্রতিদিন বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা। স্থানীয়দের অভিযোগ, তায়বেহর আশপাশের পাহাড় ও কৃষিজমিতে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা একের পর এক ঘাঁটি তৈরি করছে। শহরের মেয়র সুলাইমান খুরিয়েহর দাবি, তায়বেহ ঘিরে প্রায় সাতটি অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে, যার কয়েকটি শহরের পৌরসভার জমিতেই অবস্থিত।
শহরের বাসিন্দা স্যান্ড্রা বসির জানান, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তিনি বারবার দরজার তালা পরীক্ষা করেন। বাড়িতে চার সন্তান থাকায় হামলার আশঙ্কা তাকে সবসময় তাড়া করে। তার সাত বছরের ছেলেও বাইরে খেলতে ভয় পায় এবং বাবাকে কাজে যেতে নিষেধ করে—যদি তিনি আর ফিরে না আসেন।

তায়বেহ ঘিরে কিভাবে সামরিক কার্যক্রম বাড়ছে ম্যাপে তা দেখাচ্ছেন শহরের মেয়র সুলাইমান খুরিয়েহ। ছবি: আল জাজিরা
শুধু বসতবাড়িই নয়, হামলার শিকার হচ্ছে স্থানীয়দের ব্যবসা ও কৃষিজমিও। রোনাল্ড বসিরের দাবি, দুই দশকের বেশি সময় ধরে পরিচালিত তার পাথরের খনি ও কংক্রিট কারখানায় প্রায় ৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগ রয়েছে এবং সেখানে ৪০ জন স্থানীয় ফিলিস্তিনির কর্মসংস্থান হয়েছে। কিন্তু গত মার্চে বসতি স্থাপনকারীরা তার খনিতে হামলা চালিয়ে সেটি দখল করে নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগ করেও কোনো কার্যকর সহায়তা না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত কারখানা ও খনি পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানান রোনাল্ড।
তায়বেহর খ্রিষ্টান নেতাদের আরও অভিযোগ, গির্জা ও কবরস্থানের কাছে আগুন লাগানো হয়েছে। কৃষিজমিতেও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি আগুন নেভাতে যাওয়া ফায়ার সার্ভিসের গাড়িকেও বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
পানির সংকটও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরের গুরুত্বপূর্ণ পানির উৎস একটি ঝর্ণার নিয়ন্ত্রণও বসতি স্থাপনকারীরা নিয়ে নিয়েছে। ফলে কৃষিকাজ ও দৈনন্দিন জীবনে বিপাকে পড়েছেন বাসিন্দারা।
মেয়র সুলাইমান খুরিয়েহর নিজের আঙুরক্ষেত ও কূপও দখল হয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বসতি স্থাপনকারীরা খামারের তালা কেটে সেখানে তাঁবু স্থাপন করে এবং তাদের পশুদের জন্য কূপের পানি ব্যবহার করছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারাও পশ্চিম তীরের ‘এরিয়া বি’-তে অবৈধ বসতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বছরের শুরুতে এসব বসতি সরানোর কথা বললেও তার ডানপন্থি সরকারের মন্ত্রীদের বিরোধিতার কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন ‘পিস নাও’-এর হিসাব অনুযায়ী, পশ্চিম তীরজুড়ে প্রায় ৩৯০টি অবৈধ আস্তানা ও ফার্ম রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২১টি রয়েছে ‘এরিয়া বি’-তে।
তায়বেহর বাসিন্দাদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে শুধু জমি ও ব্যবসা নয়, ধীরে ধীরে তাদের নিজেদের শহরেই টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। বহু শতাব্দীর খ্রিষ্টান ঐতিহ্য বহন করা এই শহর তাই এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের মুখোমুখি।