দীর্ঘ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়া সফরে গেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। সফরে স্বাগতিকদের বিপক্ষে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলবে টাইগাররা। ডারউইনের মারারা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বাংলাদেশ সময় ভোর সাড়ে ৬টায় মাঠে গড়াবে প্রথম টেস্ট।
সংস্কৃতির পার্থক্যটা এমনই। ডারউইনে অনুশীলনে নামার আগেই ড্রেসিংরুমে বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের একাদশ জানিয়ে দিয়েছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। গণমাধ্যমেও প্রকাশ করেছে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি। অথচ বাংলাদেশ এখনো উৎকণ্ঠায়—কে খেলবেন, কে ফিট, আর কাকে নিয়ে একাদশ সাজানো হবে, সেই সিদ্ধান্তই যেন শেষ মুহূর্তে।
ডারউইন টেস্ট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের সংবাদ সম্মেলন ছিল গোছানো ও পরিপাটি। প্রশ্ন ছিল টু দ্য পয়েন্ট, উত্তরও এসেছে স্ট্রেইট ব্যাটে। বিপরীতে, শান্তকে শুরুতেই যখন নিজেদের একাদশ নিয়ে প্রশ্ন করা হলো, বাংলাদেশের অধিনায়কের উত্তর, ‘না। এখনো না। কারণ কারও কারও নিগল আছে। আমরা আগামীকাল সকালে সিদ্ধান্ত নেব।’
কামিন্স যেখানে ম্যাচের আগের দিনই দল ও সতীর্থদের ফুরফুরে রাখছেন, বাংলাদেশ হাঁটছে অনেকটা উল্টো পথে। রাতভর অপেক্ষার পর ম্যাচ শুরুর আগে কেউ কেউ জানতে পারেন, তিনি একাদশে আছেন কি না। বাংলাদেশের অধিনায়কেরা বহুবার এই সংস্কৃতি বদলের কথা বলেছেন। বছরের পর বছর আশার কথাও শুনিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা বদলায়নি।
অস্ট্রেলিয়া এরই মধ্যে নিজেদের একাদশ ঘোষণা করেছে। কিন্তু চোটের সমস্যার কারণে বাংলাদেশ এখনও একাদশ ঠিক করতে পারেনি। শান্ত জানিয়েছেন, ম্যাচের দিন সকালেই একাদশ চূড়ান্ত হবে। তিনি বলেন, ‘এখনও একাদশ সাজানো হয়নি। দলে কিছু ছোটখাটো চোট সমস্যা রয়েছে। তাই কাল আমরা একাদশ নির্ধারণ করব।’
গত ১৪ জুন ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ চলাকালে পেশির চোটে পড়েন লিটন। চোট ব্যবস্থাপনায় কিছু বিভ্রান্তির কারণে অনুমিত সময়ের বেশ পরে মাঠে ফেরা হচ্ছে তার। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের পর জিম্বাবুয়ে সফরে কোনো সংস্করণেই খেলা হয়নি তার। অস্ট্রেলিয়ার সফরের শুরুতে ডারউইন টেস্টের স্কোয়াডেও ছিলেন না লিটন। তবে ফিটনেসের নাটকীয় উন্নতিতে টেস্ট দলে ফেরেন বাংলাদেশ দলের এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটার। এবার মূল মঞ্চে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চ্যালেঞ্জ নেয়ার অপেক্ষায় তিনি। লিটনের চোট নিয়ে নাজমুল শান্ত জানান, ‘লিটন শতভাগ ফিট আছে এখন। লিটন ভাই আসায় অবশ্যই ব্যাটিংয়ের গভীরতা আরও বেড়েছে। ধারাবাহিকতা আছে তার। কাল যে টেস্ট শুরু হবে আশা করি ব্যাটিং ইউনিট হিসেবে ভালো করবে। প্রস্তুতি ভালো হয়েছে।'

শরিফুলকে নিয়েও আশার কথা জানিয়েছেন শান্ত, তবে প্রথম টেস্টে এই বাঁহাতি পেসারের খেলার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। টাইগার টেস্ট অধিনায়ক এ প্রসঙ্গে বলেন, 'শরিফুল ফিটনেস টেস্ট পাস করেছে। ভালো বোলিংও করছে। আশা করি দ্বিতীয় টেস্টে খেলবে।'
পায়ের চোটের আগে দারুণ ফর্মে ছিলেন এবাদত হোসেন। কিন্তু চোট কাটিয়ে ফেরার পর ভালো করতে পারছেন না। তবে অধিনায়কের আস্থা আছে এবাদতকে নিয়ে, 'এবাদত ইনজুরির আগে দুর্দান্ত খেলছিল। চোট কাটিয়ে ফেরার পর ২-৩টি টেস্ট খেলেছে। ভালো বোলিং করছে। কাল খেলার সুযোগ পেলে আশা করি দলের জন্য বিশেষ কিছু করবে।'
এই মুহূর্তে বাংলাদেশ দলের অন্যতম বড় তারকা লিটন দাস। উইকেটকিপার-ব্যাটারের ব্যাট হাসলে হাসে বাংলাদেশও। তাই তার ফিট থাকা দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লিটনকে নিয়েই অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যমের আগ্রহও কম নয়। প্রশ্নটা তাই গেল শান্তর কাছে। বাংলাদেশের অধিনায়কের উত্তর, ‘হ্যাঁ, লিটন শতভাগ ফিট আছে।’
লিটনের ফিট থাকার অর্থ, তাকে নিয়েই একাদশ সাজানোর পথে বাংলাদেশ। ফলে জাকের আলীর একাদশের বাইরে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
বাংলাদেশের একাদশ এখনো চূড়ান্ত নয়—অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যমও তা বুঝে গেছে। তবু তাদের আগ্রহ বোলিং কম্বিনেশন নিয়ে। ডারউইনের উইকেট যে ব্যাটিংবান্ধব হবে, তা আগেই জানিয়েছেন কিউরেটর। তবে দিন যত গড়াবে, পেসার ও স্পিনারদের জন্য সহায়তা বাড়তে পারে।
সেক্ষেত্রে দুই স্পিনার ও চার পেসার, নাকি অন্য কোনো সমন্বয়—বাংলাদেশের বোলিং কম্বিনেশন কেমন হতে পারে, সেই প্রশ্নও করা হয়েছিল শান্তকে। ঝটপট উত্তর দিয়েছেন বাংলাদেশের অধিনায়ক, ‘উইকেট দেখে ভালো মনে হয়েছে। আমি মনে করি, আমরা আমাদের স্বাভাবিক কম্বিনেশন—দুই স্পিনার ও তিন পেসার নিয়ে খেলতে পারি। তারপরও আমরা আগামীকাল সকালে কন্ডিশন দেখব। উইকেট দেখারও সুযোগ পাব। এরপরই সিদ্ধান্ত নিতে পারব।’
ঝলমলে ডারউইনের আকাশে কড়া রোদ। সেই তীব্র রোদের নিচে ২২ গজের সবুজ ঘাসকে বেশ সতেজই লাগছিল। ড্রপ-ইন পিচে উইকেট কেমন আচরণ করবে, সেটি অবশ্য সময়ই বলে দেবে। তবে এই উইকেটে বাংলাদেশের গতিময় পেসার নাহিদ রানাকে না পাওয়ার আক্ষেপটা আরও একবার ফুটে উঠেছে শান্তর কণ্ঠে।
তবুও নাহিদকে ছাড়া ভালো করার আত্মবিশ্বাস আছে অধিনায়কের। শান্ত বলেন, ‘অবশ্যই মিস করব (নাহিদ রানাকে)। কিন্তু এখন আসলে “যদি-কিন্তু” চিন্তা করে লাভ নেই। খুবই আনফরচুনেট যে নাহিদ রানা এখানে নেই। তবে এখানে যে পেস ইউনিট আছে, আমি বিশ্বাস করি তারাও এই কন্ডিশন ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারবে।’
ম্যাচের ফল কী হবে, কোন দিকে যাবে কিংবা ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে—এসব নিয়ে আপাতত মোটেও চিন্তিত নন নাজমুল হোসেন শান্ত। তার ভাবনায় একটাই বিষয়—ম্যাচটাকে পাঁচ দিন পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া এবং প্রতিটি সেশনে লড়াই করা।
অধিনায়কের কথাতেই সেটি স্পষ্ট, ‘আমরা পাঁচ দিন ক্রিকেট খেলতে চাই। পাঁচ দিন ভালো ক্রিকেট খেলতে চাই। প্রত্যেকটা সেশন ধরে খেলতে চাই, যেটা আমরা সাধারণত সবসময় বলি। একেকটা সেশন গুরুত্বপূর্ণ। চার দিন যাবে, পাঁচ দিন যাবে না, তিন দিন যাবে—এ ধরনের আলোচনা থাকবেই। তবে খেলোয়াড়দের সবসময় লক্ষ্য থাকবে, আমরা এখানে কতটা ভালো ক্রিকেট খেলতে পারি।’
অন্যদিকে কামিন্সের মিনিট তের সংবাদ সম্মেলনের শুরুটাই ছিল স্কোয়াড ঘোষণায়। অসি অধিনায়ক এসেই দলটা ঘোষণা করেন, ‘আমাদের একাদশে জশ ইংলিস ও স্কটি বোল্যান্ড থাকছে না। দলে আছেন জ্যাক ওয়েদারাল্ড, ট্রাভিস হেড, মার্নাস লাবুশেন, স্টিভ স্মিথ, ক্যামেরন গ্রিন, অ্যালেক্স ক্যারি, মিচেল ওয়েবস্টার, আমি, মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজলউড ও নাথান লায়ন।’
স্কটি বোল্যান্ড ও জশ ইংলিসের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কতটা কঠিন ছিল? সেই উত্তর দেন কামিন্স, ‘দুজনই তো দারুণ খেলোয়াড়, তাই না? আমরা বেশ নিশ্চিত ছিলাম যে লায়নকে একাদশে রাখতে চাই। এরপর মূল বিষয় ছিল পেস আক্রমণের সমন্বয় কেমন হবে, সেটা ঠিক করা। শেষ পর্যন্ত আমরা জশকে বেছে নিয়েছি।
আমরা সবাই জানি স্কটি কতটা ভালো। এমন সিদ্ধান্ত সবসময়ই খুব কঠিন হয়। স্কটিকে আসলে বলার মতো তেমন কিছু নেই। শুধু এটুকুই বলা যায়—সামনে অনেক ক্রিকেট রয়েছে। সে নিজেও নিজের সামর্থ্য ও যোগ্যতা সম্পর্কে জানে। আমি নিশ্চিত, খুব শিগগিরই কোনো না কোনো সময় সে মাঠে নামবে।’