বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগস্ট যেন আওয়ামী লীগের জন্য এক অস্বস্তিকর অধ্যায়ের নাম। এই মাসেই দলটির ইতিহাসে ঘটেছে সবচেয়ে মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড, সবচেয়ে ভয়াবহ রাজনৈতিক হামলা এবং সবচেয়ে বড় ক্ষমতাচ্যুতির ঘটনা।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় নিহত হন ২৪ জন। আর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের সরকারের পতন ঘটে।
তিনটি ঘটনার সময় আলাদা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও ভিন্ন। প্রথমটি ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার নাটকীয় পালাবদল, দ্বিতীয়টি ছিল রাজনৈতিক সমাবেশে নজিরবিহীন হামলা এবং তৃতীয়টি ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনঅসন্তোষের বিস্ফোরণ।
তবু তিনটি ঘটনাই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে, যার প্রভাব এখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্পষ্ট।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫: নেতৃত্ব হারানোর পরও ফিরে এসেছিল আওয়ামী লীগ
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যা করা হয় ধানমন্ডির বাসভবনে। এর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে কারাগারে হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া জাতীয় চার নেতাকেও।
স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় আওয়ামী লীগ একসঙ্গে হারায় দলের প্রতিষ্ঠাতা নেতৃত্বের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের।
রাজনৈতিকভাবে তখন আওয়ামী লীগের সামনে ছিল অস্তিত্বের সংকট। কিন্তু দলটি বিলীন হয়ে যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ের সাংগঠনিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক কর্মীদের মাধ্যমে দলটি টিকে থাকে। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর দলের পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া আরও গতি পায়।
এরপর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, বিভিন্ন নির্বাচন ও রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ আবার জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়। ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে।
এখানেই ১৯৭৫ ও ২০২৪ সালের আওয়ামী লীগের সংকটের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য দেখা যায়। ১৯৭৫ সালে দলটির ওপর ভয়াবহ আঘাত এলেও দীর্ঘমেয়াদে আওয়ামী লীগকে জনসমর্থন ও সাংগঠনিক কার্যক্রম ধরে রাখার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
২১ আগস্ট ২০০৪: রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে অবিশ্বাসের গভীরতা
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা বাংলাদেশের রাজনীতির আরেকটি বাঁকবদলের ঘটনা। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে একের পর এক গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। এতে আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন এবং আহত হন কয়েকশ মানুষ। শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও আহত হন। এই হামলার রাজনৈতিক অভিঘাত ছিল দীর্ঘস্থায়ী। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আগে থেকেই ছিল, তা আরও তীব্র অবিশ্বাস ও বৈরিতায় রূপ নেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২১ আগস্টের পর দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের জায়গা আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে।
তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ের কারণ হিসেবে শুধু ২১ আগস্টের হামলাকে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক পরিবর্তন, তৎকালীন সরকারের কর্মকাণ্ড, বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান এবং দুই দলের সাংগঠনিক পরিস্থিতিও নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
তবে একটি বিষয়ে সন্দেহ কম—২১ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ-বিএনপি সম্পর্কের ওপর দীর্ঘস্থায়ী দাগ রেখে গেছে।
৫ আগস্ট ২০২৪: এবার সংকটের উৎস দলের বাইরে নয়, জনঅসন্তোষে
১৯৭৫ ও ২০০৪ সালের ঘটনাগুলোর তুলনায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সংকট নিয়ে আসে।
কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে পরিণত হয়। একপর্যায়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে এক দফা আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলন দমনে সরকারের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং ব্যাপক প্রাণহানির অভিযোগ ওঠে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে জুলাই-অগাস্টের আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা প্রায় ১,৪০০ হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়েন এবং দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন।
এর পর আওয়ামী লীগের ওপর নেমে আসে আরও বড় সাংগঠনিক সংকট। দলের শীর্ষ নেতাদের একটি অংশ দেশ ছাড়েন, অনেকে আত্মগোপনে যান এবং অনেকে গ্রেপ্তার হন। দলটির কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়।
অর্থাৎ, ১৯৭৫ সালের মতো এবারও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সংকটে পড়েছে। কিন্তু পার্থক্য হলো—এবার সংকটটি শুধু নেতৃত্ব হারানোর কারণে নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাপক জনঅসন্তোষ, রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন এবং দলের দীর্ঘ শাসনামলের নানা অভিযোগ।

এবার কি ১৯৭৫-এর মতো ফিরে আসতে পারবে আওয়ামী লীগ?
এই প্রশ্নটিই এখন আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৫-এর পর আওয়ামী লীগ ফিরে এসেছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তনের পেছনে ছিল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি, দলীয় সাংগঠনিক কাঠামো এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শিকড়।
২০২৪ সালের পর পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। একদিকে দলটির বিরুদ্ধে আন্দোলন দমন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক, দুর্নীতি ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ দেশের বাইরে বা আইনি জটিলতায় রয়েছেন। সবচেয়ে বড় বিষয়, আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব কাঠামো ছিল শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে। ফলে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে দলটি নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে পারে কি না, সেটি বড় প্রশ্ন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো বড় দল দীর্ঘদিনের জন্য অদৃশ্য হয়ে থাকেনি।
তবে প্রত্যাবর্তন আর আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া এক বিষয় নয়।
আওয়ামী লীগের সামনে এখন তিনটি বড় প্রশ্ন
প্রথমত, নেতৃত্বের পরিবর্তন। শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নেতৃত্ব কাঠামো কি নতুন বাস্তবতায় বদলানো সম্ভব? দ্বিতীয়ত, অতীতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন। জুলাই-আগস্টের সহিংসতা ও দীর্ঘ শাসনামলের অভিযোগ নিয়ে দলটি কী অবস্থান নেয়, তার ওপর ভবিষ্যৎ জনগ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই নির্ভর করতে পারে। তৃতীয়ত, নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্যতা। বাংলাদেশের তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলকে যেভাবে দেখছে, সেই বাস্তবতায় পুরোনো রাজনৈতিক ভাষা ও কৌশল দিয়ে দলটির পক্ষে জনসমর্থন ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে।
আগস্ট কি সত্যিই আওয়ামী লীগের জন্য ‘অভিশপ্ত’ মাস?
১৫, ২১ ও ৫— আগস্টের এই তিনটি তারিখ আওয়ামী লীগের ইতিহাসে তিনটি ভিন্ন বিপর্যয়ের প্রতীক হয়ে আছে। কিন্তু এগুলোর মধ্যে সরাসরি কোনো পরিকল্পিত যোগসূত্র ছিল—এমন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।
১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতা। ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলার পেছনে ছিল ভিন্ন রাজনৈতিক সংঘাত। আর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, আন্দোলন ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের অভিযোগের পরিণতি।
তাই আগস্টকে আওয়ামী লীগের জন্য ‘অভিশপ্ত মাস’ বলা রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও ইতিহাসের বিচারে এটিকে কেবল কাকতালীয় ঘটনাগুলোর সমষ্টি হিসেবেই দেখা বেশি যুক্তিসংগত।
তবে কাকতালীয় হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য কম নয়।
কারণ তিনটি আগস্ট—১৯৭৫, ২০০৪ ও ২০২৪—প্রতিবারই আওয়ামী লীগের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
১৯৭৫ সালে দলটি নেতৃত্ব হারিয়েও ফিরে এসেছিল। ২০০৪ সালে হামলার শিকার হয়ে আরও তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণের মুখে পড়েছিল। আর ২০২৪ সালে জনঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে এখন অস্তিত্ব ও পুনর্গঠনের প্রশ্নে দাঁড়িয়ে আছে।
এবারের প্রশ্ন তাই শুধু আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় ফিরবে কি না—তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, ফিরতে চাইলে আওয়ামী লীগ কি আগের আওয়ামী লীগ হিসেবেই ফিরবে, নাকি নেতৃত্ব, রাজনীতি ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন বদলে একটি নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে?
সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পরবর্তী অধ্যায়—আর আগস্টের ইতিহাসে দলটির পরবর্তী পাতা।
সূত্র: বিবিসি