দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বহিষ্কার, কঠোর বার্তা আর বিভিন্ন পর্যায়ে সমঝোতা ও আলোচনার পরও প্রায় ৭৬টি আসনে ধানের শীষের প্রার্থীকে এখন বিএনপি পরিচয়ের ৮৭ জন ‘বিদ্রোহী’ নেতার মুখোমুখি হতে হবে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে বিএনপির রাজনীতি করা এসব আগ্রহী প্রার্থী দলের টিকেট না পেয়ে বিদ্রোহী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। দলের প্রতীক না পেয়ে দলের কঠোর অবস্থানের পরও ভোটের লড়াইয়ে থাকছেন স্বতন্ত্র হিসেবে; যা মোট সংসদীয় আসনের এক-চতুর্থাংশ।
মঙ্গলবার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে নির্বাচন কমিশন থেকে প্রাপ্ত তালিকা বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বুধবার এসব প্রার্থীদের হাতে প্রতীক বরাদ্দ দেবে নির্বাচন কমিশন। এর পরদিনই শুরু হবে ভোটের লড়াইয়ের মূল পর্ব- প্রচার।
আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির রাজনীতি করা এসব ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের আর সরে যাওয়ার সুযোগ নেই। ব্যালটে তাদের নাম থাকবে। তবে এখন সমঝোতা কিংবা দলের আদেশ মেনে কেউ ভোটের লড়াইয়ে না থাকার ঘোষণা হয়ত দিতে পারবেন।
এমনটা না হলে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগের তিন সপ্তাহে ২৯৮ আসনের মধ্যে এক চতুর্থাংশটিতে ভোটের প্রচারে দেখা মিলবে বিএনপির বিদ্রোহীদের।
এমন নেতাদের বিরুদ্ধে বিএনপি কঠোর অবস্থানে থাকবে বলে আগেই তুলে ধরেছিলেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
দলীয় ও শরিক জোটের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট করার বিষয়ে জানতে চাইলে মঙ্গলবার রাতে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির এই সদস্যসচিব বলেন, “বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী বলে কেউ নেই। যে দলের প্রতীক ধানের শীষ পাবেন, তিনিই বিএনপির প্রার্থী।”
তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, “দলের সদস্য হয়ে যদি দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ প্রার্থী হন, অবশ্যই তার বিরুদ্ধে দল কঠোর সিদ্ধান্ত নেবে। এরই মধ্যে কয়েকজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে।”
বিদ্রোহী যারা তারা কারা
এসব ‘বিদ্রোহীদের’ মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক নেতা, জেলা কমিটির নেতা, বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা রয়েছেন।
দলীয় নির্দেশ অমান্য করে ঢাকা বাদে ৬৩ জেলায় ১১৮টি আসনে প্রায় ১৭৯ জন বিএনপি নেতা ধানের শীষ প্রতীকের মনোনীত প্রার্থীর বাইরে মনোনয়নপত্র দিয়েছিলেন।
এরপর অনেক নেতার সঙ্গেই বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি কথা বলে এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেওয়ার আহ্বান জানান। দল থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়, প্রার্থিতা অব্যাহত রাখলে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে।
এমনকি দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানও কারও কারও সঙ্গে ঢাকায় কথা বলেছেন। তারা প্রত্যাহারও করে নিয়েছেন।
অনেক ক্ষেত্রে জেলা পর্যায়েও আলোচনা-সমঝোতার মাধ্যমে কেউ কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। কোথাও কোথাও বিএনপি প্রার্থীর বিপরীতেও বিকল্প হিসেবে কেউ কেউ মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। তারা তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এভাবে প্রায় অর্ধেক বিএনপি নেতা তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
কিন্তু তারপরেও প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসনে ধানের শীষের বিপরীতে দলটির সাবেক নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়ে গেছেন।
এর মধ্যে বাগেরহাটের চারটি আসনের প্রত্যেকটিতেই বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী রয়ে গেছেন। জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য এম এ এইচ সেলিম নিজে তিনটি আসন থেকে নির্বাচন করছেন।
কেন দলের নির্দেশের বাইরে প্রার্থী হলেন- এমন প্রশ্নে সেলিম বলেন, “এখানে চারটি আসনে দল থেকে যাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তাদের কেউ পাশ করার মত যোগ্য প্রার্থী না। আমার যদি সুযোগ থাকত, তাহলে আমি চারটি আসনেই নির্বাচন করতাম। কিন্তু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে আমি তিনটি আসনে নির্বাচন করছি। কারণ, আমি আগে সংসদ সদস্য ছিলাম। আমি এই আসনগুলো বিএনপির জন্য পুনরুদ্ধার করতে চাই। এটাই আমার চ্যালেঞ্জ।
“আমি বিএনপির লোক। আমি বিএনপির বাইরের কেউ না। আমি আমার নির্বাচনি প্রচারে বিএনপির কথা, তাদের উন্নয়নের কথা, খালেদা জিয়ার কথা, তারেক রহমানের কথাই বলব।”
তিনি বলেন, “আমি যদি তিনটি আসনে নির্বাচন না করি, তাহলে এসব আসন জামায়াতে ইসলামীর হাতে চলে যাবে। আমি এটা মানতে পারি না।”
বাগেরহাট-২ সদর আসন থেকে সেলিমের আপন ভাই জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান সমন্বয়ক এম এ সালাম মনোনয়নপত্র জমা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি তা প্রত্যাহার করে নেন।
অন্য আসনগুলোর মধ্যে জেলাওয়ারি বিশ্লেষণে দেখা যায়, পঞ্চগড়, শরীয়তপুর, কক্সবাজার, লক্ষ্মীপুর, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লালমনিরহাট, ভোলা, সিরাজগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, খুলনা, সাতক্ষীরা, ভোলা, ফেনী, পিরোজপুর, নরসিংদীর, রাঙামাটি, বান্দরবানের মত জেলায় দলীয় নির্দেশ অমান্য করে কোনো বিএনপি নেতা প্রার্থী হননি।
আবার নোয়াখালী-৬, নড়াইল-১ আসনে তিনজন ‘বিদ্রোহী’ হয়ে রয়েছেন। দিনাজপুর-৫, রাজশাহী-৫, নাটোর-১, বাগেরহাট-১, নারায়ণগঞ্জ-৩, নারায়ণগঞ্জ-৪, গোপালগঞ্জ-২, মাদারীপুর-১, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে দুজন করে বিএনপির বিদ্রোহী নেতা রয়ে গেছেন।
কিছু ব্যতিক্রমও ছিল। যেমন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নামে যে তিনটি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল সেখানে প্রত্যেক স্থানেই ‘বিকল্প প্রার্থী ছিল। ৩০ ডিসেম্বর সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী মারা যান। এরপর ওই তিনটি আসনে বিকল্প প্রার্থীরাই দলীয় প্রার্থী হন।
সুনামগঞ্জের পাঁচটি আসনেই বিএনপি দুজন করে প্রার্থীকে মনোনয়নের দিয়েছিল। পরে অবশ্য একজন করে প্রত্যাহার করে নেন। যদিও সুনামগঞ্জের দুটি আসনে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ রয়েই গেছে।
এছাড়া চট্টগ্রাম-৬ আসনে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও খন্দকার গোলাম আকবরকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। তারা দুজনই মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। শেষে দলের টিকেট পেয়েছেন গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী।
নেত্রকোণা-৪ (মোহনগঞ্জ, মদন, খালিয়াজুরি) আসনে সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের পাশাপাশি সেখানে তার স্ত্রী তাহমিনা জামান শ্রাবণীও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। শ্রাবণী তার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এমন আরও বেশ কয়েকটি আসনেই হয়েছে।
চব্বিশের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যাক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকায় নিবন্ধনও স্থগিত হয়েছে, ফলে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির পর প্রথমবারের মত দেশের অন্যতম প্রাচীন এ দলকে ছাড়াই নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
তাদের ১৪ দলীয় জোটের দুই শরিক জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টি ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে।
তবে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, জাতীয় পার্টিসহ ‘অধিকাংশ দল’ নির্বাচনে থাকায় এবং এখন পর্যন্ত ভোটের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ থাকায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন।
২৯ ডিসেম্বর ছিল মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ দিন। ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মনোনয়নপত্র বাছাই করা হয়। ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত মনোনয়নের ব্যাপারে আপিল করেন প্রার্থীরা। নির্বাচন কমিশন আপিল নিষ্পত্তি করে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত।
বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে স্বতন্ত্র যারা, দেখতে ক্লিক করুন লিংকে https://drive.google.com/file/d/1YOmhRyvJXop0UBhOWAw8_n-JcBIKP32A/view
কী বলছেন ‘বিদ্রোহীরা’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান মামুন। স্থানীয়ভাবে জেলা কমিটির নেতারা তাকে দলীয় নির্দেশ মেনে ভোটের মাঠ থেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু কর্মী-সমর্থকদের চাপের মুখে তিনি ভোটের মাঠে থেকে যান।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কামরুজ্জামান মামুন বলেন, “দল আমাকে বহিষ্কার করলেও আমি বিচ্ছিন্ন হইনি। আমার সঙ্গে উপজেলার সবাই আছেন। একজন ভুল মানুষকে দল মনোনয়ন দিয়েছে। এজন্য আমাকে নির্বাচন করতে হচ্ছে।”
তিনি বিপুল ভোটে পাশ করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।
নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে নির্বাচন করছেন তিনজন। তারা হলেন- হাতিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য প্রকৌশলী তানভীর উদ্দিন রাজিব, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য প্রকৌশলী ফজলুল আজিম এবং ফজলুল আজিমের সহধর্মিণী শামীমা আজিম।
তিনি কেন প্রার্থী হলেন- জানতে চাইলে প্রকৌশলী তানভীর উদ্দিন রাজিব বলেন, “দীর্ঘ দিন বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আছি। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি হাতিয়ার সাধারণ মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে ছিলাম, আছি। সাধারণ মানুষের আবেগ ও ভালোবাসার কারণে তাদের সম্মতিতে আমি প্রার্থী হয়েছি।
“অন্যদিকে যাকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তিনি হাতিয়ার বাসিন্দা নন। দলীয় নেতাকর্মীদের আবেগ-অনুভূতিকে গুরুত্ব না দিয়ে একজন বহিরাগত প্রার্থী চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিগত দিনে দুঃসময়ে পাশে পায়নি এমন কাউকে বিএনপির নেতাকর্মীরা দলীয় প্রার্থী হিসেবে মেনে নিতে রাজি নন বিধায় আমি প্রার্থী হয়েছি।”
বিজয়ের ব্যাপারে ‘শতভাগ’ আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “১২ ফেব্রুয়ারি বিজয়ী হয়ে হাতিয়ার সাড়ে ৭ লাখ মানুষের পক্ষ থেকে দেশনায়ক তারেক রহমানকে এ বিজয় উপহার দেব ইনশাআল্লাহ।”
প্রায় একই কথা বলেছেন দিনাজপুর-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এ জেড এম রেজওয়ানুল হক। তিনি বলেন, “আমি বিএনপির দীর্ঘ বছরের পরীক্ষিত একজন কর্মী। অনেক জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে দলের স্বার্থ রক্ষা করে চলেছি। বিএনপি হাই কমান্ড আমাকে প্রার্থী না করে আমার প্রতি অবিচার করেছে। এই এলাকায় যার কোনো অবস্থান ও অবদান নেই এমন একজন লন্ডনপ্রবাসী নাগরিককে প্রার্থী করেছে।
“আমি এই আসনের দলীয় নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রার্থী হয়েছি। আমি বিশ্বাস করি, জনগণ আমাকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করবেন ইনশাল্লাহ।” বিডিনিউজ