গ্রামে ভয়াবহ লোডশেডিং: ভুগছে কৃষি, পোল্ট্রি, মৎস্য খাত

আজাদ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

জ্বালানি সংকটের মধ্যে গ্রীষ্মের শুরুতেই ভয়াবহ লোডশেংডিয়ের কবলে পড়েছে দেশ; তীব্র গরমের এই সময়ে শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষকে ভুগতে হচ্ছে বেশি। শহরের পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং হলেও গ্রামের মানুষ কোথাও কোথাও ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ আসছে। আর তাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষি, পোল্ট্রি ও মৎস্য খাতে; ক্ষতির মুখে পড়ছে গ্রামীণ অর্থনীতি। বিদ্যুৎ স্বল্পতার সঙ্গে জ্বালানি তেলের সংকট শিল্প-কলকারখানার সক্ষমতাকে ব্যাহত করছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চাহিদার তুলনায় দিনে দুই থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হচ্ছে। এ পরিস্থিতির জন্য ভারতের আদানির একটি এবং এস এস পাওয়ারের একটি ইউনিট বন্ধ থাকাকে দায়ী করা হচ্ছে।

লোড শেড করে ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে মফস্বল আর গ্রামীণ জনপদ। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কোথাও কোথাও চাহিদার তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহের চিত্রও পাওয়া যাচ্ছে।

এ অবস্থায় এসএসসি পরীক্ষার্থীদের পড়তে হচ্ছে চরম ভোগান্তিতে। আর বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সন্ধ্যা ৭টায় দোকানপাট বন্ধের ঘোষণায় ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্থবিরতার কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে লোডশেডিংয়ের ভয়াবহতা কমার আশা দেখছেন।

তবে তার ভাষ্য, “পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও লোডশেডিং শেষ হবে না। তখনও প্রায় ১২০০ মেগাওয়াটের মত লোডশেডিং থাকতে পারে, তবে সেটা এখনকার তুলনায় অনেক কম।”

কোল্ড স্টোরেজ: আলু ও বীজ নিয়ে শঙ্কা
শোডশেডিংয়ের কারণে সংকটে পড়েছে হিমাগারগুলো। দিনে অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় তাদের জেনারেটর চালু রাখতে হয়। সেখানেও জ্বালানি তেলের সংকট।

কুমিল্লা সদর উপজেলার আমতলী এলাকায় হক অ্যান্ড সন্স কোল্ড স্টোরেজের কমপ্রেশার মেশিনের অপারেটর মো. বাবুল সরকার বলছিলেন, জেলায় ২০টির বেশি হিমাগার রয়েছে, এসব হিমাগারের অধিকাংশই আলু ও বীজে পূর্ণ। তার ভাষ্য, “গত এক সপ্তাহ ধরে দিনে গড়ে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাই না। এভাবে চলতে থাকলে আলু নষ্ট হবে, বীজও নষ্ট হবে। বাবুল বলেন, “এখানে প্রতিনিয়ত আলু নির্ধারিত তাপমাত্রায় রাখতে হয়। পচনশীল এসব সবজি সঠিক তাপমাত্রায় না রাখলে নষ্ট হতে শুরু করবে। বীজ আলু তাপমাত্রার ক্ষেত্রে আরো বেশি সতর্ক থাকতে হয়। তাপমাত্রার হেরফের হলেই বীজ নষ্ট হয়ে যাবে।”

সংকটের কথা বললেন জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার আর বি কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক সেলিম হোসেনও। তিনি বলেন, “দিন গড়ে ছয় ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। এতে প্রতি মাসে আমাদের অতিরিক্ত ১৫ লাখ টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। এভাবে চললে, ইতিহাসের সর্বোচ্চ ক্ষতির মুখে পড়বে হিমাগারগুলো।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কুমিল্লা অঞ্চলের উপ-পরিচালক মিজানুর রহমান সংকটের বিষয়ে জেলা প্রশাসককে ‘অবহিত করার’ কথা বললেন। তার আশা, এই সংকট ‘হয়ত থাকবে না’।

তবে বিদ্যুতের গ্রাহকরা বলছেন, কুমিল্লা জেলার ১৭টি উপজেলাতেই পরিস্থিতি মোটামুটি একইরকম। প্রতিদিনই কমপক্ষে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের মধ্যে থাকতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কুমিল্লা অঞ্চলের অধীনে রয়েছে কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও লক্ষ্মীপুর জেলা।

এ অঞ্চলে পিডিবির প্রধান প্রকৌশলী শেখ ফিরোজ কবির জানান, ছয় জেলায় অফপিক আওয়ারে এক হাজার ৩৮০ মেগাওয়াট এবং পিক আওয়ার এক হাজার ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। সঙ্কট থাকায় ২০০ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের ধকল নিতে হচ্ছে।

এদিকে শেরপুর শহরের চন্দন চাল এবং আটাকলের ব্যবস্থাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলছিলেন, বিদ্যুতের কারণে তাদেরও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তার মধ্যে আছে জ্বালানি তেলের সংকট। তাদের গাড়িগুলো তেল নেওয়ার জন্য পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও পর্যাপ্ত তেল মিলছে না। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে এক ধরনের অচলবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

শেরপুরে পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী সাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, পাঁচটি উপজেলায় তাদের গ্রাহক এক লাখ ২১ হাজার। এর মধ্যে শিল্প-কলকারখানার গ্রাহক নয় হাজারের মত। জেলায় চাহিদা ৪২ মেগাওয়াট, বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে ২৮-৩২ মেগাওয়াট।

‘এক ঘণ্টা থাকলে ২ ঘণ্টা থাকে না’
কক্সবাজারের উপকূলীয় উপজেলা টেকনাফের মানুষ বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে ত্যক্ত-বিরক্ত। কোনো কোনো দিন ১২-১৩ ঘণ্টাও লোডশেডিং হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ।

শাহ পরীর দ্বীপের বাসিন্দা আবু তালেব বলছিলেন, “এখানে ২৪ ঘণ্টায় কতবার বিদ্যুৎ যায় তার হিসাব নেই। একবার গেলে ২ ঘণ্টা বেশি সময় লাগে আসতে। এসে আবার এক ঘণ্টাও থাকে না।”

ব্যাটারিচালিত রিকশা চালক নুরুল ইসলাম রাতে চার্জ দিয়ে দিনে রিকশা চালান। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যাটারি ঠিকমত চার্জ হয় না। তাতে তার আয় কমে গেছে; সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে।

টেকনাফ পল্লী বিদ্যুৎ আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন বলেন, “জ্বালানি তেল সংকটের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডের সরবরাহ কম। রাতে টেকনাফে চাহিদা ৩২-৩৩ মেগাওয়াট। কিন্তু বরাদ্দ পাই ১৭-১৮ মেগাওয়াট।”

শেরপুর শহরের শহীদ বুলবুল সড়কের ঊষা বস্ত্রালয়ের মালিক নীলরতন চাকরি অন্য সমস্যার কথাও বলছেন।

তার ভাষ্য, লোডশেডিং তো আছেই, মানুষ সারাদিন কাজকর্ম শেষে বিকালে বা সন্ধ্যায় কেনাকাটা করতে আসে। কিন্তু সন্ধ্যা ৭টায় দোকানপাট বন্ধ করতে বলেছে সরকার। সন্ধ্যা ৭টায় বিদ্যুতের লোকজন গাড়ি ও লম্বা মই নিয়ে হাজির হচ্ছে। তারা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ভয় দেখাচ্ছে।”

দ্বিমুখী সংকটে শিল্পাঞ্চল
দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পকারখানাগুলো দ্বিমুখী সংকটে পড়েছে। একদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি, অন্যদিকে বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে প্রয়োজনীয় গ্যাস ও ডিজেলের তীব্র সংকট।

ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ এর উপ-মহাব্যবস্থাপক সোলায়মান হোসেন বলছেন, “আমাদের এখানে প্রয়োজন ৩০৭ মেগাওয়াট, কিন্তু পাচ্ছি ১৮৫ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ না থাকলে আপনারা যেমন গরমে রাতে ঘুমাতে পারেন না, গ্রাহকদের চাপে রাতে আমাদেরও ঘুম হয় না।”

সব মিলিয়ে উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে বলে জানালেন আশুলিয়ার নিডল স্টিচ কম্পোজিট লিমিটেডের পরিচালক দেলোয়ার হোসেন। তিনি বললেন, “বিদ্যুৎ দুই ঘণ্টা পরপর ৪০ মিনিট ৫০ মিনিটের জন্য আসে। আবার কখনো পাঁচ মিনিট থাকার পর দুই ঘণ্টার জন্য লোডশেডিং হয়। বিদ্যুতের কারণে প্রায়ই কারখানা ছুটি দিয়ে দিতে হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের (ডিজেল) কারণে জেনারেটরও ঠিকমতো চালাতে পারছি না। আমাদের ছোট কারখানা, পাম্পগুলো থেকে ঠিকমত ডিজেল দিচ্ছে না। বড় বড় কারখানাগুলো পম্পের সঙ্গে কনট্রাক্ট করে সব ডিজেল নিয়ে যায়। বিদ্যুত ও জ্বালানি সংকটের কারণে কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।”

চামড়া ও তৈরি পোশাকের কয়েকটি কারখানার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা দাবি করলেন, বিদ্যুতের অভাবে তাদের উৎপাদন সক্ষমতার ৩০-৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। নির্দিষ্ট সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের পণ্য সরবরাহ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে, ফলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জেনারেটর দিয়ে কারখানা চালাতে গিয়ে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। আবার সব সময় ডিজেলও পাওয়া যাচ্ছে না।

বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সাভারের একমাত্র ট্যানারি শিল্পনগরীতে চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না, যা চামড়া শিল্পে অস্থিরতা তৈরি করেছে।

সালমা ট্যানারির মালিক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, “রোজার ঈদের পর আমাদের যেসব চামড়া ট্যানারিতে এসেছে, সেসবও আমরা সংরক্ষণ করতে পারছি না। দিনের অর্ধেক সময়ই বিদ্যুৎ থাকছে না; এক ঘণ্টা থাকলে আবার এক-দেড় ঘণ্টা নাই।”


সেচে সমস্যা, শঙ্কায় কৃষক
লোডশেডিংয়ের কারণে বোরো খেতের সেচ নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন যশোরের বেনাপোলের কালীয়ানি গ্রামের কৃষক আব্দুল হামিদ। তিনি বলছিলেন, বোরো চাষের পুরোটায় সেচ নির্ভর। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ঠিকমত সেচ কাজ চালাতে পারছে না কৃষক। এ অবস্থা চলতে থাকলে আবাদ ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

টেংরা গ্রামের সেচ পাম্পের মালিক শামীম হোসেন বলেন, “সারাদিন কারেন্ট থাকে না বললেই চলে। মানুষ সেচ নেওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে। দিনরাত সমান তালে চলছে লোডশেডিং। আমরা শেষ সময়ে এসে অসহায় হয়ে পড়েছি।”

একই কথা বলছিলেন বেনাপোলের বারোপোতা গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম। তার ভাষ্য, “দিনের পর দিন সেচ মোটরের পিছনে ঘুরতে হচ্ছে। জমিতে ঠিকমত পানি দিতে পারছি না।”

তবে কয়েকদিন আগে কয়েক দফা বৃষ্টি হওয়ায় শেরপুর সদরের কৃষকদের বিপদ একটু কমেছে। উপজেলার পাকুরিয়া ইউনিয়নের তারাগড় গাংপাড় গ্রামের বাসিন্দা খোকন মিয়া বলেন, “বৃষ্টি হওয়ায় ধানক্ষেতের গোড়ায় এখন পানি রয়েছে। তা না হলে বিদ্যুতের যে অবস্থা, ধানের ১৩টা বেজে যেত।”

শেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মো. মাইনউদ্দিন আহমদ জানালেন, জেলায় তাদের গ্রাহক প্রায় ৩ লাখ ২৬ হাজার। বর্তমান গড় চাহিদা ৭০ মেগাওয়াট, পাচ্ছেন ৩৫ মেগাওয়াট। গড়ে ৫০ ভাগ লোডশেডিং করা হচ্ছে।

নাটোরের ভেদরার বিলের কৃষক ওয়াজেদ আলী বলছিলেন, “ধার করে তিন বিঘা জমিতে ধান লাগিয়েছি। কিন্তু ঠিকমত সেচ দিতে পারছি না। পানি দিতে না পারলে ধান নষ্ট হয়ে যাবে। ফসল না তুলতে পারলে আমরা খাব কী, ধার শোধ করব কিভাবে?”

নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, নাটোর জেলাজুড়ে প্রতিদিন ১৮০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। সরবরাহ কমেছে ৫০ থেকে ৬০ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত অবশ্য কৃষকদের আশা দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে তিনি বলেন, সেচ কার্যক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে সরকার রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পোল্ট্রি ও মৎস্য খাতে সংকট
জেলা ও উপজেলা শহরের তুলনায় গ্রামীণ জনপদে বেশি বেশি লোডশেডিং হওয়ায় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত মৎস্য ও পোল্ট্রি খামার বিপদে পড়েছে। মংমনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ, গৌরীপুর, তারাকান্দা, ফুলপুর, ধোবাউড়া, ফুলবাড়িয়া এবং মুক্তাগাছা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সারাদিনে তিন থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না বলে গ্রাহকদের ভাষ্য।

উপজেলার ভন্ডোখোলা গ্রামের মাছ চাষি হারেজ আলী বলেন, “বৈশাখ মাসে পুকুরে সারাক্ষণ পানি দিতে হয়। দিনের বড় একটা সময় লোডশেডিং থাকায় সেচ বন্ধ থাকছে, তাতে মাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।”

ফুলবাড়িয়া উপজেলার আছিম এলাকার আনোয়ার হোসেন বলেন, “গরমে আমার পোল্ট্রি খামারের মুরগি মারা যাচ্ছে। বিকল্প হিসেবে টিনের চালে পানি ছিটাচ্ছি। অনেকে জেনারেটর বা আইপিএসের মাধ্যমে শেডে ফ্যানের ব্যবস্থা করেছে। এই এলাকার অনেক খামারির মুরগি মরে যাচ্ছে।”

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ময়মনসিংহ অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুর হক বলেন, তাদের অঞ্চলের ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা থাকে পিক আওয়ারে ১২০০ থেকে ১৩০০ মেগাওয়াট। আর সরবরাহ পাওয়া যায় ৭০০ থেকে ৯০০ মোগাওয়াট।

ভোগান্তিতে পরীক্ষার্থীরা
মংমনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার কোনাবাড়ি গ্রামের শরিফুল ইসলাম বলেন, তাদের এলাকায় প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা বিদ্যুত থাকে না। ফলে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে।

বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়ে নান্দাইল উপজেলার এসএসসি পরীক্ষার্থী এমরান হাসান বলেন, “লোডশেডিংয়ের কারণে পড়ার রুটিন ঠিক রাখা খুব কঠিন হয়ে পড়ছে। আমরা চাই, বিদ্যুতের এই সমস্যার দ্রুত সমাধান হোক, যাতে আমরা নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করতে পারি।”

কক্সবাজারের টেকনাফের শাহ পরীর দ্বীপ এলাকার এসএসসি পরীক্ষার্থী ইয়াসিন আরাফাত বলে, “প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। গরমে রাতে পড়াশোনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

নাটোরের গুরুদাসপুরের এসএসসি পরিক্ষার্থী হিমু আক্তার বলেন, “বিদ্যুৎ খুবই সমস্যা। কখন যাচ্ছে না কখন আসতেছে এটা জিজ্ঞেস করতে পারেন। আইপিসের ব্যাটারি যে ঠিকমতো চার্জ হবে, সেই সময়টা বিদ্যুৎ থাকছে না।”

লোডশেডিং কত?
ভারতের আদানি পাওয়ার প্ল্যান্টের একটি ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বুধবার থেকে দেশে লোডশেডিং বেড়ে দুই হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, আদানির ইউনিট এবং বাঁশখালীর এসএস পাওয়ারের একটি ইউনিট চালু হলে আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, আদানির দুই ইউনিট থেকে সর্বোচ্চ ১৪৯৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছিল। বুধবার দ্বিতীয় ইউনিট বন্ধ হয়ে গেলে সরবরাহ সাড়ে ৭০০ মেগাওয়াটে নেমে আসে।

সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বলেন, বুধবার দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট। বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ১২৬ দশমিক ৩৫ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ২ হাজার ৮৬ মেগাওয়াট, যা সামাল দিতে লোডশেড করতে হয়েছে।

লোডশেডিং সামাল দিতে বেশি খরচের ডিজেলচালিত কেন্দ্রও চালাতে হচ্ছে বলে জানালেন পিডিবি কর্মকর্তা জহুরুল। তিনি বলেন, পরীক্ষার সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ কিছুটা ধরে রাখতে খুলনায় ২২৭ মেগাওয়াট অতিরিক্ত উৎপাদন যোগ করা হয়েছে। হরিপুর ও সিদ্ধিরগঞ্জের ইউনিট চালানো হয়েছে। চাঁদপুরে একটি ইউনিটের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ থাকলেও সেটি ১০০ মেগাওয়াটে চালু রাখা হয়েছে। শাহজীবাজারের একটি ইউনিটের কাজও পিছিয়ে শুক্রবারে নেওয়া হয়েছে, যাতে পরীক্ষার সময় সরবরাহে চাপ কমানো যায়। ডিজেল পাওয়ার প্ল্যান্ট অনেকগুলো চালিয়ে পিক টাইমগুলো অনেকটা কভার করার চেষ্টা করছি। তারপরও কিছুটা প্রবলেম হচ্ছে, এটা তো আমরা অস্বীকার করি না।” কতদিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে, এমন প্রশ্নে পিডিবির এই সদস্য বলেন, “এটা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোর প্রতিশ্রুত সময়সূচির ওপর। আদানি কর্তৃপক্ষ বলছে, তিন থেকে চার দিনের মধ্যে তাদের ইউনিট চালু হবে। আর এসএস পাওয়ার জানিয়েছে, আগামী শনি বা রোববারের মধ্যে তাদের একটি ইউনিট উৎপাদনে আসতে পারে।”

এই দুই ইউনিট চালু হলে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ১৩০০ মেগাওয়াট যোগ হবে বলে জানান জহুরুল ইসলাম।

(প্রতিবেদনটি তৈরি করতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জেসমিন মলি, কুমিল্লা প্রতিনিধি তানভীর দিপু, বেনাপোল প্রতিনিধি আসাদুজ্জামান আসাদ, টেকনাফ প্রতিনিধি জসীম মাহমুদ, নাটোর প্রতিনিধি তারিকুল ইসলাম, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি ইলিয়াস আহমদ, সাভার প্রতিনিধি সেলিম আহমদ, শেরপুর প্রতিনিধি আব্দুর রহিম বাদল)

সূত্র : বিডিনিউজ

বিষয়:

লোডশেডিং
এলাকার খবর

সম্পর্কিত