বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় নতুন কমিশন হচ্ছে না, এখন কী হবে?

আজাদ ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় নতুন তদন্ত কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে সরকার৷ তারা মনে করছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত ফজলুর রহমান কমিশনের তদন্তই ঠিক আছে৷ তারা সেটা ধরেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে৷কিন্তু সেই পদক্ষেপ কী, তা এখনো স্পষ্ট নয়৷

২০০৯ সালের ওই ঘটনায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছিল৷

অন্তর্বর্তী সরকারের ওই কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘‘সরকার সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে৷ কারণ আমাদের কমিশন হয়েছিল সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে৷ ফলে আদালতের নতুন নির্দেশ ছাড়া এই সরকারের কশিমন গঠনের কোনো এখতিয়ার ছিলো না৷''

আর বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে করা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান পাবলিক প্রসিকিউটর মো. বোরহান উদ্দিন জানান, ‘‘সরকারের দিক থেকে নতুন কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি৷ ফলে মামলা যেভাবে চলছিল সেভাবেই চলবে৷ নতুন কোনো নির্দেশ আসলে তখন দেখা যাবে৷''

পিলখানা হত্যা দিবসে বুধবার ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস' উপলক্ষ্যে বনানীর সামরিক কবরস্থানে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘‘এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরকার নতুন করে কোনো তদন্ত কমিশন করবে না৷ যেহেতু জাতীয় একটা স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠিত হয়েছিল৷ দক্ষ ও উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়েই গঠিত হয়েছিল৷ কমিশনের প্রতিবেদন একনজরে যা দেখেছি, তাতে ৭০টির মতো সুপারিশমালা এসেছে, যার অনেকগুলোই বাস্তবায়নাধীন৷ আর বিচারাধীন যে মামলাগুলো আছে, কিছু আপিল বিভাগে আছে, এই বিচারিক প্রক্রিয়াটা সমাপ্ত করা হবে৷ এ ছাড়া অন্য যে সুপারিশগুলো আছে, সেগুলোও ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে৷''

দুইদিন আগে তিনি যে নতুন তদন্ত কমিশন গঠনের যে কথা বলেছিলেন সে ব্যাপারে বলেন, ‘‘আগে পুরো প্রতিবেদন না দেখেই পিলখানা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কমিটি নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছিলাম৷ এখন তা সংশোধন করলাম৷''

কমিশন প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান বলেন, ‘‘সরকারের এই সিদ্ধান্তে আমি খুশি৷ কারণ এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বিডিআর বিদ্রোহের ব্যাপারে সরকার তার অবস্থান পরিষ্কার করলো৷ ভারতের সাথে ভবিষ্যতে সম্পর্ক কী হবে তাও পরিষ্কার করলেন তারা৷''

আর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ মনে করেন, ‘‘এর ফলে বিচার প্রক্রিয়া আরো দীর্ঘায়িত হতে পারে৷ হত্যা মামলায় যারা দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন তারা তাদের ছেড়ে দেয়ার দাবি করতে পারেন৷''

তদন্ত প্রতিবেদনে যা আছে
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ওই বছরের সালের ২৪ ডিসেম্বর আদালতের নির্দেশে অন্তর্বর্তী সরকার তদন্ত কমিশন গঠন করে৷ কমিশন ২০২৫ সালে ২৯ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করে৷

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের মূল সমন্বয়কারী সেই সময়ে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস৷ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও এর সঙ্গে যুক্ত ছিলো৷ আর পুরো ঘটনায় শেখ হাসিনার গ্রিন সিগন্যাল ছিলো৷ প্রতিবেদনে কীভাবে আলামত নষ্ট করা হয় তারও উল্লেখ করা হয়েছে৷

এভাবে নতুন করে বিচার করলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে’

01:21
শেখ হাসিনা ও তাপস ছাড়াও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের নাম এসেছে তদন্তে ৷

এর বাইরে শেখ হাসিনার সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ ও ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক লে. জেনারেল (অব.) মোল্লা ফজলে আকবরকেও দায়ী করা হয়৷ প্রতিবেদনে সামরিক বাহিনী ও পুলিশের কর্মকর্তাদের নামও আছে৷

কমিশনের সভাপতি আ ল ম ফজলুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ওই ঘটনার সময় ৯২১ জনের মতো ভারতীয় বাংলাদেশে এসেছিল৷ তার মধ্যে ৬৭ জনের মতো লোকের কোনো হিসাব মিলছে না৷ তারা কোন দিক দিয়ে বের হয়ে গেছে, এটা ঠিক বলা যাচ্ছে না৷'' তিনি বলেন, ‘‘এই ব্যাপারেও আমরা সরকারকে সুপারিশ করেছি ওই ব্যক্তিরা কোথায়, কেন আসলো; সেটা খুঁজে বের করার জন্য৷ এ বিষয়ে ভারতের কাছে জানতে চাওয়ার জন্য আমরা সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিলাম৷ কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এটা নিয়ে তখন ভারতের সঙ্গে কোনো যোগাযোগও করেনি, চিঠিও দেয়নি৷ আর তারা প্রতিবেদনও প্রকাশও করেনি৷ কেন করেনি তারাই বলতে পারবে৷ তবে আমরা প্রকাশের অনুরোধ করেছিলাম৷''

তিনি বলেন, ‘‘আমরা বিচারে যে দুইটি মামলা আছে তা নিয়ে তদন্ত করিনি৷ আমাদের তদন্ত ছিলো এর নেপথ্যে কারা ছিলো তা বের করা৷ আমরা তা করেছি৷ আমরা দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র উদ্‌ঘাটন করেছি৷ এখন সরকার যদি আমরা যাদের দায়ী করেছি তাদের বিচারের আওতায় আনতে চায় তাহলে ফৌজদারি তদন্ত লাগবে৷ কমিশন হিসাবে আমরা আমাদের তদন্তের পক্ষে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ দিয়েছি৷ কিন্তু বিচারের আওতায় আনতে যে প্রক্রিয়া আছে তা অনুসরণ করতে হবে৷''

বিডিআর হত্যা ও বিচার
২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা ২৭ মিনিটের দিকে বিজিবির (তখনকার বিডিআর) বার্ষিক দরবার চলাকালে দরবার হলে ঢুকে পড়ে একদল বিদ্রোহী সৈনিক৷ এদের একজন তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের বুকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করেন৷ বিদ্রোহী সৈনিকরা সেনা কর্মকর্তাদের ওপর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে৷ তারা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করে তাদের পরিবারকে জিম্মি করে ফেলে৷ পুরো পিলখানায় এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়৷ চারটি প্রবেশ গেট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আশপাশের এলাকায় গুলি ছুঁড়তে থাকে তারা৷ বিদ্রোহীরা দরবার হল ও এর আশপাশের এলাকায় সেনা কর্মকর্তাদের গুলি করতে থাকে৷

ঘটনার ৩৬ ঘণ্টা পর এ বিদ্রোহের অবসান হয়৷ পরে পিলখানা থেকে আবিষ্কৃত হয় গণকবর৷ সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় সেনা কর্মকর্তাদের লাশ৷ তখনকার বিডিআর মহাপরিচালকসহ ৫৭ সেনা কর্মকর্তা, একজন সৈনিক, দুই সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী, ৯ বিজিবি সদস্য ও পাঁচজন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হন৷

এই ঘটনায় দুইটি মামলা হয়৷ একটি বিস্ফোরক আইনে এবং আরেকটি হত্যা মামলা৷ ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর পুরান ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত হত্যা মামলার রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন, ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়৷ খালাস দেয়া হয় ২৭৮ জনকে৷ চারজন আসামি বিচার চলাকালে মারা যাওয়ায় মামলার দায় থেকে তারা অব্যাহতি পায়৷

পরে হাইকোর্ট ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৫২ জন আসামির মধ্যে ১৩৯ জনের ফাঁসির রায় বহাল রাখেন৷ একই সঙ্গে আটজনের মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন ও চারজনকে খালাস দেয়া হয়৷

এছাড়া বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন পাওয়া ১৬০ জন আসামির মধ্যে ১৪৬ জনের সাজা বহাল রাখে হাইকোর্ট৷ এদের মধ্যে দুইজন আসামির মৃত্যু হয় এবং ১২ জন আসামিকে খালাস দেয়া হয়৷

বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মামলায় এত বেশিসংখ্যক আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় আর কখনো হয়নি৷ আর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সবাই সাবেক বিডিআরের সদস্য৷ ওই ঘটনার বাংলাদেশ রাইফেলস-এর (বিডিআর) নাম পরিবর্তন করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) রাখা হয়৷

এই মামলার চিফ পাবলিক প্রসিকিউটর মো. বোরহান উদ্দিন ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘হত্যা মামলাটি এখন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারের সর্বশেষ ধাপে আছে৷ আর বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা মামলাটি বিচারে আছে৷ সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে৷ এপর্যন্ত ৩০২ জন সাক্ষী দিয়েছেন৷ বুধবারও আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে৷''

তিনি বলেন, ‘‘এই মামলায় যারা সাক্ষী দিয়েছেন তারা বিভিন্ন পর্যায়ে বলেছেন, বিডিআর বিদ্রোহের নেপথ্যে শেখ হাসিনা, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ আরো আরো অনেকে ছিলেন৷ আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিলে তাদের মামলায় সম্পৃক্ত করা যায়৷ এই মামলা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকার কনসার্ন৷ ফলে নতুন কোনো ইন্সট্রাকশন না পাওয়া পর্যন্ত এভাবেই চলবে৷ তবে মামলার যে-কোনো পর্যায়ে তদন্ত করে নতুন আসামি যুক্ত হতে পারে,'' বলেন মো. বোরহান উদ্দিন৷

বিস্ফোরক মামলায় মামলায় ৮৩৫ জন বিডিআর সদস্য কারাগারে ছিলেন৷ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সাড়ে তিনশ'র মতো জামিন পেয়েছেন৷ আর বিডিআরের অভ্যন্তরীণ বিচারে কয়েক হাজার বিডিআর সদস্যকে চাকরিচ্যুত এবং বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়৷

বিচার কি নতুন করে হবে?
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা তদন্ত কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান বলেন, ‘‘আমরা কমিশনের প্রতিবেদনে বলেছি, যে দুইটি মামলার বিচার চলছে দুইটি মামলায়ই তদন্তে ত্রুটি এবং দুর্বলতা আছে৷ এখন সরকারের উচিত হবে সেই দুর্বলতাগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করা৷ সেটা করলে নিরপরাধ কেউ যদি শাস্তি পেয়ে থেকে, কাউকে যদি অভিযুক্ত করা হয়ে থাকে তাহলে তাদের তো মুক্তি দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে৷ আর সেজন্য সরকার তদন্ত করাতে পারে৷ কারণ আমরা মামলার তদন্তে দুর্বলতার কথা বললেও সুনির্দিষ্ট করে বলিনি যে ওই দুর্বলতার কারণে নিরপরাধ কেউ ভিকটিম হয়েছি কী না৷ সেটা এখন বের করা দরকার,'' বলেন তিনি৷

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সরকার যদি ফজলুর রহমান কমিশনের তদন্তের ভিত্তিতে নতুন করে বিচার করতে যায় তাহলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে৷ আসলে বিচার পর্যায়ে আদালত যদি মনে করে পুলিশি তদন্তে কোনো ত্রুটি আছে বা সম্পূরক তদন্ত প্রয়োজন তাহলে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিতে পারে৷ সেখানে যদি নতুন কারুর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় তাহলে তাদের বিচারে যুক্ত করতে পারে৷  যেটা ২১ আগস্টের গ্রেনেডে হামলার মামলায় হয়েছিলো৷ সম্পূরক জার্জশিট দেয়া হয়েছিলো৷ তবে সেটা করতে হয় বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই৷ কিন্তু বিডিআর বিদ্রোহের হত্যা মামলার বিচার তো শেষ হয়েছে৷ এখন আপিল বিভাগে আছে৷''

তিনি বলেন, ‘‘বারবার তদন্ত হলে আসামিরা এর বেনিফিট পায়৷ এখন আসামিরা বলতে পারে নতুন তদন্ত অনুযায়ী বিচার হলে তাদের আগে ছেড়ে দেয়া হোক৷ এর ফলে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হয়৷ আর ওই তদন্ত অনুযায়ী যদি বিচার হয় তাহলে যারা কারাগারে আছেন তাদের ঝুলিয়ে রাখা হবে কেন? তাদের আগে ছেড়ে দেয়া হোক৷ আর সিআরপিসিতে কমিশনের তদন্তের কোনো আইনগত মূল্য নাই৷ নতুন করে কিছু করতে হলে আদালতের নির্দেশে ফৌজদারি তদন্ত হতে হবে৷ আর একই হত্যার ঘটনায় তো দুইটি মামলা চলতে পারবে না৷ এইসব কারণেই কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নতুন তদন্তের ব্যাপারে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আপত্তি দেয়া হয়েছিলো,'' বলেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ৷

সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘‘আসলে পিলখানা হত্যা মামলা নিয়ে যদি ওই তদন্তের ভিত্তিতে আবার নতুন করে বিচারের প্রশ্ন ওঠে তাহলে যেসব সেনা কর্মকর্তা হত্যার শিকার হয়েছেন তাদের পরিবারের বিচার না পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে৷ এখন আসলে সরকারের পরবর্তী প্রক্রিয়া কী হয় তা দেখার আছে৷ আর এই কারণেই কিন্তু সেনাপ্রধান রাওয়া ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের তদন্ত কমিশনের বিরোধিতা করেছিলেন৷''

আসামি ও নিহতদের পরিবারের সদস্যরা যা বলছেন
বিডিআর বিদ্রোহে চাকরিচ্যুত এবং সাজাপ্রাপ্তদের সংগঠন বিডিআর কল্যাণ পরিষদের সভাপতি মো. ফয়জুল আলম বলেন, ‘‘তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে এটা প্রমাণ হয়ে গেছে বিডিআর সদস্যরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত না৷ এরসঙ্গে জড়িত শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের নেতারা আর ভারত৷ তাই ফাঁসি, যাবজ্জীবন থেকে বিভিন্ন মেয়াদে যারা দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে আছেন তাদের মুক্তি দিতে হবে৷ তারা তো দায়ী নয়, তাদের ওপর দায় চাপানো হয়েছে৷''

তিনি বলেন, ‘‘আমরা যারা বিডিআর বিদ্রোহের সময়ে ঢাকার বাইরে কর্মরত ছিলাম তাদেরও অন্যায়ভাবে শাস্তি দেয়া হয়েছে৷ আমাকেও সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল৷ ১৮ হাজার ৫১৯ জন বিডিআর সদস্যকে বিডিআরের অভ্যন্তরীণ বিচারে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং শাস্তি দেয়া হয়েছে, তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে৷ আর বিস্ফোরক মামলায় এখনো যারা আটক আছে তাদের জামিন দিতে হবে৷''

মো. ফয়জুল আলম বলেন, ‘‘আমাদের যাদের অন্যায়ভাবে শাস্তি দেয়া হয়েছে, চাকরিচ্যুত করা হয়েছে তাদের দণ্ড ও শাস্তি তুলে নিয়ে চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হবে৷ আমাদের হিসাব করে সব ধরনের সার্ভিস বেনিফিট ও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে৷''

বিডিআর বিদ্রোহে নিহত কর্নেল কুদরত এলাহী রহমান সিদ্দিকের ছেলে অ্যাডভোকেট সাকিব রহমান গত ডিসেম্বরে ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটা মামলা করেছিলাম৷ তদন্তে যাদের নাম এসেছে তাদের যেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর প্রসিকিউট করেন৷''

তবে এক প্রশ্নের জবাবে তখন তিনি বলেছিলেন, ‘‘এই তদন্ত কমিশনের এখতিয়ার হলো মামলাটি যে পর্যন্ত হয়েছে তার বাইরে৷ ফলে হত্যা মামলায় যাদের দণ্ড হয়েছে যেটা নিয়ে নতুন করে কিছু করার সুযোগ নাই৷ কারণ তাদের অপরাধ প্রমাণিত সেটা সেভাবেই থাকবে৷''

বিডিআরের সুবেদার মেজর নুরুল ইসলাম বিডিআর বিদ্রোহের সময় হত্যাকাণ্ডে বাধা দিতে গিয়ে নিহত হন৷ তার ছেলে আশরাফুল আলম হান্নান বুধবার ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের বলেছেন নতুন করে কোনো তদন্ত কমিশন হবে না৷ অন্তর্বর্তী সরকারের তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনই তারা বাস্তবায়ন করবেন৷ এতে আমরা আশ্বস্ত হয়েছি৷ কারণ নতুন কোনো জটিলতা হবে না৷ আমাদের কথা, যে বিচার চলছে তাতে কোনো বাধা দেয়া যাবে না৷ এই বিচার দ্রুত শেষ করতে হবে৷ আমরা বিচারের শেষ ফল দেখার অপেক্ষায় আছি৷ আমরা নিজেরাও ট্রাইব্যুনালে একটা মামলা করেছি৷  সেটা সচল করলেও আরো যারা জড়িত তাদের বিচার সম্ভব৷ যারা এই হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড, যারা বিচারের আওতায় আসেনি, তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে যাদের নাম প্রকাশ পেয়েছে তাদের আলাদা বিচার করতে হবে৷''

 

সূত্র : ডয়েচে ভেলে

এলাকার খবর

সম্পর্কিত