যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করার আগে বিএনপি ও জামায়াতের কাছ থেকে ‘সম্মতি’ নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর-এর সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, “ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ আমাদের প্রধান দুটি দলের নেতাদের সঙ্গে নির্বাচনের আগেই কথা বলেছেন এবং তারাও এতে সম্মতি দিয়েছিল। সুতরাং এমন না যে, বিষয়টি অন্ধকারে করা হয়েছে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চুক্তি করার সমালোচনার প্রেক্ষাপটে তিনি এসব কথা বলেন। উল্লেখ্য, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন খলিলুর রহমান, পরে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন তিনি।
চুক্তির সময়রেখা
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত ধারাবাহিক আলোচনা চলে। সে সময় বাংলাদেশের জন্য শুল্কহার ২০ শতাংশে নামানো হয়। তিনি বলেন, “এই চুক্তি নির্বাচনের তিন দিন আগে হঠাৎ করে করা হয়নি। জুলাই মাসেই মূল সমঝোতা হয়েছিল।’ তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও ম্যানমেড ফাইবার দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শূন্য শতাংশ পাল্টা শুল্ক এবং ‘রুলস অব অরিজিন’ নিয়ে দরকষাকষিতে সময় লেগেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৩৭ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়।
পরে দরকষাকষির মাধ্যমে তা কমে দাঁড়ায় ২০ শতাংশে। আগে থেকেই থাকা ১৫ শতাংশসহ মোট শুল্ক দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশ। নয় মাস আলোচনার পর সাম্প্রতিক চুক্তিতে শুল্ক আরও ১ শতাংশ কমানো হয়েছে।
এই চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং-এর উড়োজাহাজ কেনা, গম, তুলা ও সয়াবিন আমদানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সমালোচনা ও জবাব
এই চুক্তি নিয়ে সমালোচনা করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি। সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “অনির্বাচিত সরকার কীভাবে এমন একটি চুক্তি করে যেতে পারে, যার দায় নির্বাচিত সরকারকে নিতে হবে—এতে আমরা হতভম্ব।”
তবে খলিলুর রহমান বলেন, “আমরা বাংলাদেশের স্বার্থ বিসর্জন দিইনি। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তির ভাষার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে, প্রায় একই রকম।” তিনি জানান, চুক্তিতে ‘এন্ট্রি ক্লজ’ ও ‘এক্সিট ক্লজ’ রয়েছে— নোটিফিকেশন ছাড়া চুক্তি কার্যকর হবে না এবং ৬০ দিনের নোটিস দিয়ে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে।
সামরিক সহযোগিতা প্রসঙ্গ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জিসোমিয়া (GSOMIA) ও আকসা (ACSA) চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে কিনা—এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। আকসা বা জিসোমিয়া—এই শব্দগুলো উচ্চারিত হয়নি।’
ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হবে না। দেশের নিরাপত্তাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।”
নির্বাচন ও আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গ
পল কাপুর আওয়ামী লীগের রাজনীতি স্বাভাবিক করার বিষয়ে কোনো বার্তা দেননি বলে জানান খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বিস্মিত হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, “নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে।”