যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি: লাভ–ক্ষতির হিসাবের মাঝে নতুন অনিশ্চয়তা

আজাদ প্রতিবেদন
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

নয় মাসের টানা আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া  ‘‘এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)’ ঘিরে দেশে যখন লাভ–ক্ষতির বিশ্লেষণ চলছিল, ঠিক তখনই নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে মার্কিন আদালতের রায় ও হালনাগাদ শুল্ক ঘোষণা। নতুন সরকার ইতোমধ্যে চুক্তির পরিণতি জানতে ওয়াশিংটনকে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল বহু দেশের ওপর উচ্চ হারে ‘পারস্পরিক শুল্ক’ আরোপের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্ক ধার্য হয়; দরকষাকষিতে তা ২০ শতাংশে নেমে আসে। আগে থেকে থাকা ১৫ শতাংশ শুল্কসহ মোট হার দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশ। এই প্রেক্ষাপটে ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা–ওয়াশিংটনের মধ্যে ART চুক্তি সই হয়, যাতে সম্পূরক শুল্ক ১ শতাংশ পয়েন্ট কমে ১৯ শতাংশে আসে (মোট ৩৪ শতাংশ)।

তবে সাম্প্রতিক রায়ে যুক্তরাস্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত ‘পারস্পরিক শুল্ক’ বাতিল করে। এরপর অন্য আইনের আওতায় প্রথমে ১০ শতাংশ, পরে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা আসে। এ পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের চুক্তির কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন জোরালো হয়েছে।

সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা ঢাকা-ওয়াশিংটন বাণিজ্যচুক্তির পরিণতি কী হবে তা জানতে চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন সরকার। সোমবার নাগাদ এ চিঠি দেওয়া হতে পারে বলে শনিবার রাতে জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। মার্কিন আদালতের রায়ের পর এ নিয়ে করণীয় ঠিক করতে শনিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠকও করেছেন কমর্কর্তারা।

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের দিন কয়েক আগে ৯ ফেব্রুয়ারি সই হয় ‘এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) নামের ঢাকা-ওয়াশিংটন বাণিজ্য চুক্তিটি। ভোটের ডামাডোলের কারণে এ নিয়ে আলোচনা কিছুটা আড়ালেই ছিল। ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকরা এ চুক্তির বিভিন্ন দিক চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে শুরু করেন। তারা দেখতে পান, এটি বাংলাদেশের জন্য ‘কঠোর’ এক চুক্তি। কেউ কেউ এতে বাণিজ্যের চেয়ে ‘রাজনৈতিক উপাদান’ বেশি থাকার কথাও বলেছেন।

নির্বাচনের পাঁচ দিন পর নতুন সরকার শপথ নেওয়ার দিন ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) এক আলোচনা সভায় নতুন সরকারের কাছে চুক্তিটি আবার পর্যালোচনার আহ্বান জানান কয়েকজন ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতির বিশ্লেষক।

‘পারস্পারিক সুবিধার’ মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে করা এ চুক্তিকে বিশ্লেষকদের একজন বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূল নয় বলেও মনে করছেন। তার মতে, এটি ‘চাপিয়ে দেওয়া এক ধরনের শর্ত’।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মার্কিন আদালতের রায়ের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এটাকে ‘অবিলম্বে রদ’ করতে উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এবং এটা আসলে এখন পর্যন্ত বাস্তবায়নের কোনো ধরনের বাধ্যবাধকতার মধ্যেও পড়েনি। ফলে সেই সুযোগও রয়েছে।

গোপনীয়তায় সঙ্গে করা এ চুক্তিকে সফলতা হিসেবে তুলে ধরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তা তৈরি পোশাক খাতের জন্য লাভবান হওয়ার কথা বলে আসলেও এ খাতের রপ্তানিকারকরা বলছেন ভিন্ন কথা।

যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে দেশটির বাজারে পোশাক রপ্তানিতে শূন্য শুল্কের কথা অন্তর্বর্তী সরকার বললেও ছাড় মিলবে মূলত অতিরিক্ত আরোপ করা সম্পূরক শুল্কে। সেখানেও রয়েছে নানা শর্ত। রফতানিকারকরা বলছেন, কোনো পোশাক পণ্য তৈরিতে তুলার পরিমাণ কত শতাংশ হতে হবে, কতখানি ছাড় পাওয়া যাবে সেটিও ‘অস্পষ্ট’।

এ চুক্তি বাস্তবায়ন হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ক্ষতির শঙ্কার কথা উঠে এসেছে কারও কারও কথায়। পোল্ট্রি শিল্পের উদ্যোক্তারা ব্যবসা ছেড়ে দেওয়ার হুমকিতে পড়তে পারেন বলেও দাবি কারও কারও। এতে খাদ্য নিরাপত্তাও পড়তে পারে হুমকির মুখে বলে শঙ্কা তাদের।

তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ এটিকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের যুক্তি, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে যে ধরনের শুল্ক বাধার মধ্যে পড়তে হবে তা কাটিয়ে উঠতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এমন চুক্তি হওয়া দরকার। এ বাণিজ্যচুক্তি পরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) দ্বার খুলতে সহায়তা করবে।

ভারত-ইইউয়ের মধ্যে সম্প্রতি হওয়া চুক্তির উদাহরণ দিয়ে এক বিশ্লেষক বলেন, শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়- এমন চুক্তির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সঙ্গেও। মূলত এসব চুক্তির মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য শুল্ক ও বাধা তুলে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের তরফে এ চুক্তির দেখভাল করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। চুক্তিটির ভালো মন্দের বিষয়ে এক প্রশ্নে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর তা বাংলাদেশের জন্য অনুকূল বলে মত দেন। শনিবার তিনি বলেন, “কারণ কটন স্পেসিফিক যে ডিলটা ছিল ওটা তো আমাদের জন্য প্রচণ্ড ফেভারেবল ছিল। বাকি যে জিনিসগুলো এগুলো লোকে যত কথাই বলুক না কেন আমরাতো ওই সময় অনেক ভালো চুক্তি করেছি,  ‘কারণ যেগুলো তারা বলছে, আর্টিকুলেট করছে সেগুলো আদারওয়াইজ অন্য জায়গায়, বিভিন্ন জায়গায় আমরা সেগুলো চুক্তি-টুক্তি করেছি। অনেক আগে চুক্তি করেছি।’ উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “যেমন ইন্টারন্যাশনাল লেবার ল মানব, ওগুলো, আমরা যে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইট ইমপ্লিমেন্ট করব। এগুলো অনেক আগে চুক্তি করে স্বীকৃতি দিয়ে আসছি। অন্য ইয়েতে (চুক্তিতে)- যেমন ডব্লিউটিওতে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি। এসমস্ত আমরা করেছি। ওগুলোর জন্য এখন বলা ঠিক আছে যে, মূল বাণিজ্য চুক্তিটা- সেটা আমাদের জন্য খুব ফেভারেবল ছিল।"


কী আছে চুক্তিতে, সমঝোতার জন্য কী করেছে বাংলাদেশ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর চড়া হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা আসে। পরে দর কষাকষি করে এ হার ২০ শতাংশ নামে, যা ১ অগাস্ট কার্যকর হয়। আগে থেকেই বাংলাদেশি পণ্যে ছিল ১৫ শতাংশ শুল্ক; সব মিলিয়ে শুল্ক দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশ।

বাড়তি এ শুল্ক কমাতে অন্তর্বর্তী সরকার টানা নয় মাসের বেশি সময় ধরে আলোচনা চালায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। সমঝোতায় পৌঁছাতে মার্কিন পণ্যের আমদানি বাড়ায় বাংলাদেশ। বোয়িং, গম, সয়াবিন, তেলসহ বিভিন্ন মার্কিন পণ্যের আমদানি বাড়াতে দেয় প্রতিশ্রুতি।

এ নিয়ে দেন দরবারের মধ্যে ৯ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে আরোপিত পারস্পরিক সম্পূরক শুল্ক ১ শতাংশ পয়েন্ট কমে হয় ১৯ শতাংশ। তাতে করে মোট শুল্কহার আগের কমে হয় ৩৪ শতাংশ।

নতুন এ আরটি চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ছাড় দেবে; কিন্তু বিনিময়ে তাদের পণ্য আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের বাজারে তাদের আরও বড় ছাড় দেওয়ার অঙ্গীকার করতে হয় অন্তর্বর্তী সরকারকে।

চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ আগামী ৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য (গম, সয়াবিন, তুলা) এবং ১৫ বছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের এলএনজি আমদানির প্রতিশ্রুতি দেয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য ১৪টি বোয়িং কেনার সম্মতিও দেওয়া হয়।

পোল্ট্রি শিল্পে নেতিবাচক প্রভাবের কথা বলছেন দেশি উদ্যোক্তারা চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাংস, পোল্ট্রি, প্রক্রিয়াজাত মাংস, সিলুরিফর্মেস (ক্যাটফিশ জাতীয় মাছ) এবং ডিমের মত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কোনো বাধা তৈরি না করার সমঝোতায় সই করায়।

একই সঙ্গে চুক্তিতে মার্কিন দুগ্ধ-নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বাংলাদেশের দুগ্ধ-নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমান স্তরে দেখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্য ছাপিয়ে এতে রাজনৈতিক উপাদানও যুক্ত হয় নতুন আরেকটি শর্তে। এ শর্তে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ অন্য দেশ থেকে কী আমদানি করবে বা করবে না সেক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ দেখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রায় ২৫০০টি পণ্যের শূন্য শুল্ক সুবিধা পেয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, কাঠ ও কাঠজাত পণ্যসহ অন্যান্য পণ্য। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজারে ৭ হাজার ১৩২টি ট্যারিফ লাইন বা এইচএস কোডে মার্কিন পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়েছে।

এর মধ্যে ৪ হাজার ৯২২টি ট্যারিফ লাইনের পণ্য চুক্তি সইয়ের দিন হতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। ১ হাজার ৫৩৮টি ট্যারিফ লাইনের পণ্যের শুল্কহার ৫ বছরের মধ্যে শূন্য করা হবে এবং ৬৭২টির শুল্কহার ১০ বছরের মধ্যে শূন্য করা হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ শুল্ক ছাড়ে দেখা যাবে বাংলাদেশে একচেটিয়াভাবে বড় হতে থাকবে মার্কিণ পণ্যের বাজার। কারণ দেশটির পণ্য তৈরির সক্ষমতা বেশি, বৈচিত্র্যও বেশি।

উল্টোদিকে বাংলাদেশের মূল লাভ হচ্ছে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক যদি যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বা সিনথেটিক সুতা দিয়ে তৈরি হয়, তবে সেটিতে সম্পূরক শুল্ক ১৯ এর বদলে শূন্য হবে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের একক প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র।

কী বলছেন বিশ্লেষকরা
বড় সুযোগ পেলেও সক্ষমতার কারণে বাংলাদেশের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সব পণ্য রপ্তানি সম্ভব না। তেমনি মার্কিন সব পণ্যের চাহিদাও বাংলাদেশে রাতারাতি বাড়বে না।

বাণিজ্য বিশ্লেষক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ কারণে চুক্তির শুল্ক ছাড়ের বিষয়ের চেয়েও বড় করছেন দেখছেন অন্য একটি শর্তকে। যেখানে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ দেখার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। তাদের কথা না মানলে রীতিমতো বাড়তি শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়া হয়েছে। তার মতে, এটি ট্যারিফ বা শুল্ক বাধার বাইরে বড় ধরনের অশুল্ক বাধা, ‘এটা এমন একটা চুক্তি হয়েছে যে যেটা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি স্বাধীনতাকে পুরোপুরি ক্ষুণ্ণ করবে। সুতরাং যেকোনোভাবে এ ধরনের একটা চুক্তি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না। সুতরাং এই সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে খারিজ করার জন্য উদ্যোগ নেয়া দরকার। এটা আসলে কোনো চুক্তি হয়নি। এটা আসলে এক ধরনের চাপিয়ে দেওয়া একটা এক ধরনের শর্ত।’

অন্তর্বর্তী সরকার এটিকে কীভাবে মেনে নিয়েছে এটা তার কাছে বিস্ময়,  ‘আমরা আসলে এটার জন্য অন্তত অন্তর্বর্তী সরকারকে নিন্দা জানাতে চাই যে তারা এরকম একটা উদ্যোগ কীভাবে তারা মেনে নিয়েছে,” যোগ করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের আদালত যে রায় দিল তার রেফারেন্স ধরেই এটি বাতিলের চেষ্টা সম্ভব বলে ভাষ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক গোলাম মোয়াজ্জেমের। এ চুক্তির আরও কিছু দুর্বল দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে চুক্তিটি এখন এমন হয়েছে এটা শুল্কের চেয়ে বহুগুণ অন্য অনেক বিষয়কে এর মধ্যে যুক্ত করা হয়েছে। কৃষি, বাণিজ্য, মেধাসত্ত্ব, সার্ভিস, অয়েল, গ্যাস সবকিছু যুক্ত করা হয়েছে যেটা কোনভাবেই মানা যায় না। সুতরাং এই চুক্তিটি নিয়ে সরকারের কোনভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

ঢাকায় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিসিআই আয়োজিত ‘যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি: বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রভাব’ শীর্ষক আলোচনায় গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান এ চুক্তি কেন করা হল সেই প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, এটি বাণিজ্য চুক্তি ভাবলে ভুল হবে। বাণিজ্য চুক্তির চেয়েও বেশি কিছু। চুক্তিতে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মুহূর্তে চুক্তির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এটা পুরোপুরি নজিরবিহীন। এটা কল্পনা করা যায় না। যে একটা সুপার পাওয়ারকে একটা দুর্বল অর্থনীতির দেশ একটা ‘ডিফারেন্সিয়াল ট্রিটমেন্ট’ দিচ্ছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এ অধ্যাপকও এটি পর্যালোচনার কথা বলেন, ‘এটা নতুন গভর্মেন্টের কাছে দেওয়া উচিত ছিল। তারা এটা রিভিউ করা দরকার ছিল। কোনো স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন হয়নি। আমরা কেউই, এই রুমের কেউই আমরা জানি না। বাংলাদেশেরও কেউ এটা জানে না। অল্প কয়েকজন বাদে।’

ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান বলেন, এ চুক্তি এমন এক চুক্তি, যার থেকে বের হওয়া কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য সব দেশ চুক্তি করেছে, বিশেষত কম্বোডিয়া বা মালয়েশিয়া যে চুক্তি করেছে তাতে নমনীয় শব্দ ব্যবহার হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তার পক্ষে কঠোর নীতি আরোপ করেছে।

এর সংশোধনে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে চুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নীতি বাদ দেওয়ার সমালোচনা করেন তিনি।

অপরদিকে বাংলাদেশ যে শুল্ক বাধা তৈরি করে রেখেছিল- এ চুক্তি তা কাটানোর প্রথম ধাপ হিসেবে দেখতে চান পিআরআই চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার। তার ভাষ্য, ‘বাই ২০৩৫ আমরা একদম জিরো রেটে চলে যাবো আমেরিকার সাথে (এ চুক্তির আওতায়)। তাহলেতো আমেরিকার সাথে একটা এফটিএ করতে পারি। এই একটা দরজা তো খুলল। কেননা এটা আমরা কারোর সঙ্গে করতে পারছি না।’ ভারতের উদাহরণ দিয়ে তিনি এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি করার পরামর্শ দেন।

শুল্ক বাধা কমানোর পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে পরামর্শ দিয়ে আসা অর্থনীতির এ বিশ্লেষক বলেন, ‘ওয়ার্ল্ড ট্যারিফ এখন গড়ে ৬ শতাংশে নেমেছে। ওখানে আমাদের গড় ৫৫ শতাংশের ওপরে। এটা তো হতে পারে না।’

বাংলাদেশ যেহেতু রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে পারছে না সে কারণে কত পণ্যে সুবিধা পেল তা না দেখে পোশাক খাতের সুবিধাই আমলে নিতে চান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাড়তি কেনাকাটার বিষয়ে বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক এই পরামর্শক বলেন, আগের যে ‘চুরি অনেক কমেছে’। বিমান এখন অনেক লাইনে এসে গেছে। ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারলে ২০-২৫টা উড়োজাহাজ আগামী ১০ বছরে লাগবে। সো এয়ারক্রাফট তো কিনতে কোনো অসুবিধা নেই ‘

যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় সয়াবিন, গম ‘সস্তা মূল্যে’ পাওয়া যায় বলে তিনি তুলে ধরেন।


ব্যবসায়ীরা কী বলছেন?
তৈরি পোশাক রফতানিকারক শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ এখনও চুক্তির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সুতা কত শতাংশ ব্যবহার করতে হবে এবং কীভাবে এ সুবিধা ব্যবসায়ীরা পাবে তা নিয়ে ‘অস্পষ্টতা’ দেখছেন। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক এই সভাপতি বলেন, ‘এ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে কারিগরি কিছু বিষয় আছে। যেমন নাম্বার ওয়ান এটার কোনো উদাহরণ নেই আজ পর্যন্ত যে, কোনো দেশ ইউএস কটন ইউজ করে এন্ট্রি পাইছে (শুল্কমুক্ত) আমেরিকায়। এটা হলো নাম্বার ওয়ান।’ একটি টুপি বানানোর উদাহারণ দিয়ে তিনি বলেন, এতে কাপড় ছাড়াও আরও উপাদান আছে। মার্কিন তুলা দিয়ে কাপড়ের অংশটুকু বানালেও এটির অন্য ভ্যালু এডিশনের পর শুল্ক ছাড়ের হিসাব কীভাবে হবে তার পুরোটাই অস্পষ্ট। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানির ব্যয় অনেক। আর সেখানে কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় হলে তখন দামও বেড়ে যেতে পারে। তার ভাষ্য, ‘আমেরিকান কটনের কিছু সুবিধা আছে কাজ করার। কিন্তু দিনশেষে ক্রেতা যে দর দেয় সেখানে তো ব্যবসা আসা লাগবে। তো যেখানে লাভ হবে সেখানে ঝুঁকবে ব্যবসায়ীরা।’ মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর তিনিও নতুন সরকারের এটি পর্যালোচনায় রাখার কথা বলেন।

বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, ‘এরকম একটা জটিল একপক্ষীয় চুক্তির অধীনে যে বেনিফিট আমি পাব সেইটা সহজ হবে এমন স্বপ্ন দেখার কোনো কারণ নেই।’

এ চুক্তি দেশের পোল্ট্রি খাতেও নেতিাবচক ভূমিকা ফেলতে পারে, যা খাদ্য নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করতে পারে বলে আশঙ্কা বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ও বর্তমান উপদেষ্টা খন্দকার মনির আহমেদের। তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির ফলে তাদের পণ্য বাংলাদেশে বাজার দখল করলে দেশের উদ্যোক্তাদের টেকাতে সরকারের ভর্তুকি দেওয়া লাগবে। এর প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানেও, ‘দিনশেষে যে কথাটা বলব সেটা হচ্ছে, এই চুক্তি একটা বড় বিপর্যয়। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য।’

এলাকার খবর

সম্পর্কিত