ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের দিকে পূর্ণমাত্রায় অগ্রসর হচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর জাতীয় নির্বাচনে বড় ধরনের সংঘাত না হওয়ায় কমিশনের ভেতরে স্বস্তি ফিরেছে। সেই ধারাবাহিকতায় জনপ্রতিনিধিশূন্য হয়ে পড়া সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভাগুলোতে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব পুনর্বহালের প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে সংস্থাটি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হবে সিটি করপোরেশন দিয়ে, শেষ হবে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের মাধ্যমে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, মেয়াদোত্তীর্ণ তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো— ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। স্থানীয় সরকার বিভাগ ইতোমধ্যে এ তিন সিটির নির্বাচনের বিষয়ে কমিশনকে চিঠি দিয়েছে। আগামী কমিশন সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে সম্ভাব্য তফসিল নির্ধারণের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে জানা গেছে।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, ধারাবাহিকভাবে নির্বাচন আয়োজন করা হলে সিটি করপোরেশন দিয়ে শুরু এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে শেষ করার পরিকল্পনাই অনুসরণ করা হবে। সিটি নির্বাচন শেষে পর্যায়ক্রমে বাকি নয়টি সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে অনুষ্ঠিত হবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন।
বর্তমানে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বড় অংশই প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৭টি উপজেলা পরিষদ এবং ৬৪টি জেলা পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করা হয়। ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই এখন নির্বাচিত নেতৃত্ব নেই। এতে স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রম, বাজেট বাস্তবায়ন ও নাগরিক সেবা প্রদানে ধীরগতি দেখা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে আদালতের আদেশে মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন শাহাদাত হোসেন। তবে পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচিত হলে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে প্রশাসনিক প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র তালিকা হালনাগাদ, ভোটার তালিকা পর্যালোচনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং নির্বাচনী সরঞ্জাম প্রস্তুতের কাজ ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় নির্বাচনেও প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
এদিকে জাতীয় সংসদের দুটি শূন্য আসনে উপনির্বাচনের প্রস্তুতিও সমান্তরালে চলছে। শেরপুর-৩ আসনে প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে নির্বাচন স্থগিত ছিল এবং বগুড়া-৬ আসন প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগে শূন্য হয়েছে। ঈদুল ফিতরের পর এ দুটি আসনে ভোটগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনের বিষয়েও কমিশন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। সাধারণ আসনের অনুপাতে দলভিত্তিক সংরক্ষিত আসন নির্ধারণ করে নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দায়িত্ব গ্রহণের পর জানিয়েছেন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভায় দ্রুত জনপ্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে পুরো নির্বাচন সূচি চূড়ান্ত করতে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিটি করপোরেশন নির্বাচনই হবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ধাপ। রাজধানী ও বন্দরনগরীর ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনার দক্ষতাও এ নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও পরীক্ষিত হবে।
সব মিলিয়ে, জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে এগোচ্ছে দেশ। সিটি করপোরেশন দিয়ে শুরু হয়ে ইউনিয়ন পরিষদে শেষ হওয়ার এই দীর্ঘ নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে মাঠপর্যায়ে গণতান্ত্রিক কাঠামো আরও শক্তিশালী হবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের।