তত্ত্বাবধায়ক সরকার কী প্রক্রিয়ায় এবং কাদের নিয়ে গঠন করা হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে বিভিন্ন মতামত ও প্রস্তাব পাওয়া গেছে। আরও উন্মুক্ত আলোচনা শেষে জনগণের জন্য উপযুক্ত যে প্রক্রিয়া সংসদ বিবেচনা করবে, সেটিই গ্রহণ করা হবে। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, এর গঠনপ্রক্রিয়া ও কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলছে। জুলাই জাতীয় সনদে এ বিষয়ে কিছু প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ও রয়েছে। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ক্ষেত্রে কোন ধাপ অনুসরণ করা হবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় এর কাঠামো নির্ধারিত হবে, তা নিয়ে একাধিক বিকল্প নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছ থেকে প্রস্তাব নেওয়া হচ্ছে। সুশীল সমাজ ও অন্যান্য অংশীজনের কাছ থেকেও লিখিত প্রস্তাব ও গঠনমূলক পরামর্শ চাওয়া হয়েছে। এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে জনগণের জন্য উপযুক্ত কাঠামো নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠকে গণমাধ্যমের বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিদের কাছ থেকেও মতামত নেওয়া হয়েছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়া, টেলিভিশন চ্যানেল, অনলাইন পোর্টাল, বার্তা সংস্থা, সাংবাদিক সংগঠন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা বৈঠকে অংশ নেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি নিয়ে মতামত দেওয়া হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগকে অংশগ্রহণমূলক করতে কমিটি সব রাজনৈতিক দলকে আলোচনায় আসার আহ্বান জানিয়েছে। বিরোধী দলের কোনো বক্তব্য বা প্রস্তাব থাকলে আলোচনার মাধ্যমে তা বিবেচনা করা যেতে পারে। জুলাই জাতীয় সনদের কোনো বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের ভিন্ন প্রস্তাব থাকলেও আলোচনার সুযোগ থাকবে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণের প্রস্তাব নিয়েও বৈঠকে মতামত এসেছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ কেউ মনে করেন, কোনো ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। জনগণ কোনো নেতাকে পুনরায় দায়িত্বে দেখতে চাইলে সেই সুযোগ থাকা উচিত—এমন মতও এসেছে। তবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা কর্তৃত্ববাদী শাসনের সুযোগ যাতে তৈরি না হয়, সে বিবেচনায় ১০ বছরের সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণের যে প্রস্তাব দিয়েছিল, সেই অবস্থান থেকে এখনো সরে আসেনি।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশ একক রাষ্ট্র হওয়ায় দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রয়োজন আছে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে জুলাই জাতীয় সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়ে ঐকমত্য হওয়ায় কমিটি সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই এগোতে চায়। সংসদে এ বিষয়ে নতুন কোনো প্রস্তাব এলে তা আলোচনার সুযোগ থাকবে।
সংবিধান সংশোধনের পরবর্তী প্রক্রিয়া তুলে ধরে কমিটির সভাপতি বলেন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়ার পর সংবিধান বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। পরে সেই প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের বিল সংসদে আনার প্রক্রিয়া এগোবে। সংসদে বিল নিয়ে আলোচনা চলার পাশাপাশি সংসদের বাইরেও মতামত নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সদস্য এবং জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নে ভূমিকা রাখা ব্যক্তিদের সঙ্গেও কমিটি আলোচনা করবে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, বিচারক ও সাবেক বিচারক, শিক্ষাবিদ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সামাজিক শক্তি, সংগঠন ও ব্যক্তিদের মতামত নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। গত ১৭ বছরে বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার ও জীবিত ব্যক্তিদের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও মতবিনিময় করা হবে। জুলাইয়ের শহীদদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে বলে জানান তিনি।
জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তি সম্পর্কে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ছয়টি সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনকে ভিত্তি করে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে। এসব কমিশনের সঙ্গে প্রায় সব রাজনৈতিক দলের আলোচনা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোর ভিত্তিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কাজ করেছে।
তবে অন্যান্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন বর্তমানে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ার বাধ্যতামূলক অংশ নয় বলে জানান তিনি। সরকারের প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে নতুন সংস্কার কমিশন গঠন করে সুপারিশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে গণমাধ্যম সংস্কার নিয়ে পৃথক কমিশন গঠনের কথা উল্লেখ করেন তিনি। এমন কমিশনের বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ পরবর্তী সময়ে বিবেচনা করা যেতে পারে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এদিকে সংবিধান সংশোধন নিয়ে আলোচনার পরিধি শুধু বিশেষ কমিটির অভ্যন্তরীণ বৈঠকে সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রাপ্ত মতামতগুলো পর্যালোচনা করে সংশোধনী প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করা হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও এর গঠনপ্রক্রিয়াও সেই আলোচনার অংশ হিসেবে এখনো খোলা রয়েছে।