শীতের আগমনী বার্তা আর উত্তরের সীমান্তঘেঁষা জনপদের নৈসর্গিক সৌন্দর্য—দুইয়ের টানে পর্যটকের আনাগোনা বেড়েছে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। তাঁদের প্রধান আকর্ষণ হিমালয়ের তৃতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা। তবে গত কয়েক দিন ধরে মেঘের আড়ালে থাকায় এখনো অনেক পর্যটককে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে সেই শুভ্র পর্বতশ্রেণির দেখা পাওয়ার জন্য।
কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা না মিললেও তেঁতুলিয়ায় পর্যটকদের আনন্দে ভাটা পড়েনি। সমতলের চা-বাগান, বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, সীমান্ত নদী মহানন্দা, জেলা পরিষদ ডাকবাংলো, তেঁতুলিয়া পিকনিক কর্নারসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে দিনভর ভিড় থাকছে। এর সঙ্গে নতুন আকর্ষণ হিসেবে যোগ হয়েছে তেঁতুলিয়ার প্রাণকেন্দ্র চৌরাস্তা বাজারের ঐতিহাসিক ‘তেঁতুলতলা’।
চৌরাস্তা বাজারে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী তেঁতুল গাছটি দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত। কারও কাছে এটি ছায়া ও বিশ্রামের জায়গা, কারও কাছে তেঁতুলিয়ার ইতিহাস ও স্মৃতির অংশ। এবার উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয়দের উদ্যোগে গাছটির চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নতুন করে সাজানো হয়েছে। রাতে বসানো হয়েছে বর্ণিল আলোকসজ্জা। সন্ধ্যা নামার পর আলোয় আলোকিত তেঁতুল গাছটি এখন পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ছে। নানা রঙের আলোয় গাছটির অবয়ব বদলে যায়। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, অন্ধকারের মধ্যে আলোকিত কোনো শিল্পকর্ম দাঁড়িয়ে আছে। পর্যটকেরাও সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, ভিডিও করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে আলোকসজ্জায় সাজানো তেঁতুল গাছের ছবি।

ঢাকা থেকে আসা পর্যটক নাফিজ আনম বলেন, তেঁতুলতলার পরিবেশ রাতে বেশ আকর্ষণীয়। আশপাশের দুধ চা, খাবারের দোকান এবং রাতের আড্ডার সঙ্গে আলোকিত গাছটি ভ্রমণের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমন রাব্বি নওশাদ বলেন, আগেও তেঁতুলিয়ায় এসেছিলেন। তখন ঐতিহাসিক গাছটি অনেকটাই অবহেলিত ছিল। এবার এসে রাতে আলোকসজ্জায় গাছটির নতুন রূপ দেখে ভালো লেগেছে। ভোরে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার আশায় ডাকবাংলোয় গেলেও মেঘের কারণে তা দেখা যায়নি। তবে সমতলের চা-বাগান, সীমান্ত এলাকা ও মহানন্দার সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন।
রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক সুমনা জামান বলেন, তেঁতুলিয়ায় এসে প্রথমেই তাঁর চোখে পড়ে ঐতিহাসিক তেঁতুল গাছটি। দিনের বেলায় সাধারণ মনে হলেও রাতে আলোকসজ্জায় এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নেয়। সেখানে ছবি তুলেছেন বলেও জানান তিনি।
তেঁতুলিয়ার পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নর্থবাংলা ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজমের পরিচালক আহসান হাবিব বলেন, ঐতিহাসিক গাছটি দীর্ঘদিন তেমনভাবে নজরে ছিল না। স্থানীয় তরুণ ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সেটিকে নতুন করে সাজানো হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ তেঁতুলিয়ার পর্যটন আকর্ষণ বাড়াতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তিনি।
তেঁতুলিয়ায় শুধু তেঁতুলতলাই নয়, পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ সমতলের চা-বাগান। সীমান্তঘেঁষা এই অঞ্চলে চা-বাগানের সবুজ বিস্তৃতি, আঁকাবাঁকা সড়ক ও খোলা আকাশ পর্যটকদের আলাদা অভিজ্ঞতা দিচ্ছে। মহানন্দা নদীর তীরেও ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। নদীর ওপারে ভারতের ভূখণ্ড, সীমান্তের কাঁটাতার, ভারতীয় চা-বাগান এবং সন্ধ্যার পর সীমান্তের সার্চলাইটের আলো পর্যটকদের কৌতূহল বাড়ায়।
বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টও পর্যটকদের অন্যতম গন্তব্য। পাশাপাশি জেলা পরিষদ ডাকবাংলো এলাকা থেকে ভোরে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য পর্যটকদের ভিড় থাকে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে তেঁতুলিয়া থেকেই দূরের হিমালয় পর্বতশ্রেণির শুভ্র চূড়া দেখা যায়। এ দৃশ্য দেখতেই প্রতিবছর শরৎ ও শীত মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকরা ছুটে আসেন।

এবারও পর্যটকদের আগাম উপস্থিতিতে তেঁতুলিয়া ও পঞ্চগড়ের আবাসিক হোটেলগুলোতে চাপ বেড়েছে। অনেক হোটেলের কক্ষ আগেভাগেই বুকিং হয়ে গেছে। তেঁতুলিয়ায় থাকার জায়গা না পেয়ে কেউ কেউ ডাকবাংলো এলাকার উঁচু স্থানে তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটাচ্ছেন। আবার অনেকে পঞ্চগড় জেলা শহরে অবস্থান করে দিনের বেলায় তেঁতুলিয়ার বিভিন্ন পর্যটন স্পট ঘুরে দেখছেন।
তবে গত এক সপ্তাহ ধরে মেঘের কারণে কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা না পাওয়ায় কিছুটা হতাশ পর্যটকেরা। ভোর থেকে অপেক্ষা করেও অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন পর্বতশৃঙ্গ না দেখেই। মেঘের একটি স্তর সরে গেলেই আরেকটি স্তর এসে ঢেকে দিচ্ছে দূরের পাহাড়। ফলে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অপেক্ষাটিও এখন তেঁতুলিয়া ভ্রমণের একটি অংশ হয়ে উঠেছে।
তেঁতুলিয়ার পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নে আরও কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোসাঃ শুকরিয়া পারভীন। তিনি বলেন, ঐতিহাসিক তেঁতুল গাছটি এ অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। গাছটির চারপাশ পরিষ্কার করে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দিনে মানুষ এর ছায়ায় বসছেন, আর রাতে আলোকসজ্জায় ভিন্ন সৌন্দর্য উপভোগ করছেন।
জেলা প্রশাসক জানান, তেঁতুলিয়া পিকনিক কর্নার ও মহানন্দা পার্কও নতুন করে সাজানোর কাজ চলছে। মহানন্দা নদীর তীরে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। শিশুদের জন্য আলাদা পার্ক নির্মাণের কাজও চলছে। লক্ষ্য হচ্ছে, তেঁতুলিয়াকে শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার স্থান হিসেবে নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা।
কাঞ্চনজঙ্ঘা মেঘে ঢাকা থাকলেও তেঁতুলিয়ার পর্যটন মৌসুমে তাই ভাটা পড়েনি। ঐতিহাসিক তেঁতুল গাছের নতুন সাজ, সমতলের চা-বাগান, সীমান্তের নদী ও পাহাড়ঘেঁষা প্রকৃতি মিলিয়ে উত্তরের এই জনপদে তৈরি হয়েছে ভিন্ন এক পর্যটন আবহ। সন্ধ্যার পর বর্ণিল আলোয় তেঁতুলতলা সেই আবহে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।