শিশুর ভেতরের সম্ভাবনা বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারলে দেশের ভবিষ্যৎ আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, একটি পরিবারের ভিত্তি যেমন সন্তানদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার ওপর নির্ভর করে, তেমনি একটি দেশের ভবিষ্যৎও নির্ভর করে তার শিশুদের সুস্থ, নিরাপদ ও সুষম বিকাশের ওপর।
মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে শিশু অধিকার দিবস ২০২৬ ও প্রতিষ্ঠানটির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিন দিনব্যাপী এ আয়োজনের এবারের প্রতিপাদ্য ‘শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত’। সকালে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে প্রায় ১৫০ শিশু তাকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানায়। পরে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়।
শিশুদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দিনের আয়োজন মূলত তাদের নিয়ে। তাই বড়দের বক্তব্যের চেয়ে শিশুদের কথা শোনাই হওয়া উচিত এ ধরনের অনুষ্ঠানের অন্যতম লক্ষ্য। নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, শিশু একাডেমির কার্যক্রম শুরুর সময় তিনিও শিশু হিসেবে এখানে এসেছিলেন। শিশু একাডেমির ‘শিশু’ ম্যাগাজিনে তাঁর ও তাঁর ছোট ভাইয়ের লেখা প্রকাশিত হওয়ার স্মৃতিও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন তিনি।
শিশুদের কেবল পড়াশোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি ও সংগীতচর্চার সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। শিশুদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শুধু পড়ালেখা নয়, খেলাধুলাও করতে হবে। কারও ভালো লাগে ছবি আঁকতে, কেউ কবিতা আবৃত্তি করতে পারে, কেউ গান, নাচ বা বাদ্যযন্ত্রে আগ্রহী। প্রত্যেক শিশুর মধ্যে কোনো না কোনো গুণ রয়েছে। সেই গুণ বিকশিত করার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ।
নিজের গিটার ও কিবোর্ড শেখার আগ্রহের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, যারা গিটার, হারমোনিয়াম, বাঁশি বা অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পছন্দ করে, তাদের সেটি ভালোভাবে শেখা উচিত। গান, নাচ কিংবা কেরাত ও কোরআন তেলাওয়াতের প্রতিও যেসব শিশুর আগ্রহ রয়েছে, তাদের সেই প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শিশুদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায় থেকে প্রথমবারের মতো সারা দেশে ২২ লাখ শিশু ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে ১১ লাখ ছেলে ও ১১ লাখ মেয়ে। এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখা গেলে তৃণমূল থেকেই ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
শিশুদের প্রতিভা খুঁজে বের করতে ‘নতুন কুঁড়ি’ কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্রীড়া কার্যক্রমও নতুন করে চালুর কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। সিলেট থেকে শুরু করে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়াম পর্যন্ত বিভিন্ন আয়োজনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিশুদের শুধু শিল্প ও সংস্কৃতিতে নয়, খেলাধুলাতেও দক্ষ করে তুলতে হবে। প্রত্যেক শিশুর অন্তত একটি ক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
শহর ও গ্রামের শিশুদের মধ্যে সুযোগের বৈষম্য কমানোর ওপরও জোর দেন সরকারপ্রধান। তাঁর মতে, দেশের অধিকাংশ পরিবারের পক্ষে ব্যক্তিগতভাবে সন্তানদের গান, বাদ্যযন্ত্র, খেলাধুলা বা শিল্পচর্চার সব সুযোগ করে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই স্কুল পর্যায় থেকেই এসব সুবিধা সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুরাও শহরের শিশুদের মতো নিজের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ-সংক্রান্ত কাজগুলো মোটামুটি গুছিয়ে আনা হয়েছে। ২০২৭ অথবা ২০২৮ সাল থেকে পুরো প্রক্রিয়া চালুর লক্ষ্য রয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী গান, বাদ্যযন্ত্র ও খেলাধুলার বিভিন্ন ক্ষেত্র বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে বলেও জানান তিনি।
ভবিষ্যৎ উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের কথা বিবেচনায় নিয়ে স্কুল পর্যায় থেকেই অতিরিক্ত বিদেশি ভাষা শেখানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আরবি, ম্যান্ডারিন, জার্মান ও জাপানিজসহ কয়েকটি ভাষার মধ্য থেকে শিশুরা নিজেদের পছন্দের একটি ভাষা বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, তৃতীয় একটি ভাষায় দক্ষতা ভবিষ্যতে বিদেশে পড়াশোনা কিংবা কর্মক্ষেত্রে অন্য দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে শিশুদের সহায়তা করবে।
তবে শিক্ষা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক দক্ষতার পাশাপাশি শিশুদের মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, শিশুদের দেশের প্রকৃতি ও পশুপাখির প্রতিও মানবিক হতে হবে। বাড়ি, স্কুল ও আশপাশের গাছের যত্ন নেওয়া এবং পশুপাখির প্রতি সদয় আচরণের অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ শিশু একাডেমির সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত এবারের কর্মসূচি ৬ থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। শিশুদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, স্মারক উপহার, স্মরণিকা ‘শৈশব’ প্রকাশ, শিশুদের আঁকা ছবির প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দেশের বিভিন্ন এলাকার শিশুদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে মতবিনিময় করবেন এবং শিশু জাদুঘর ভবনে সোলার প্যানেল ও সাবস্টেশন উদ্বোধন করবেন।
প্রধানমন্ত্রী আগের দিন দেওয়া এক বাণীতেও প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত শৈশব, নৈতিক ও বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ নিশ্চিত করাকে সরকারের অঙ্গীকার হিসেবে উল্লেখ করেন।