স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হান বলেছেন, চিকিৎসাজনিত কোনো জটিলতায় নয়, ‘কোনো একটা টেকনিক্যাল ফল্টের কারণে’ এ ঘটনাটা ঘটছে বলে তার ধারণা।
মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা মাসুকা তার তিন দিন বয়সী মৃত নাতনিকে কোলে জড়িয়ে নির্বাক বসে ছিলেন। পাশেই অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন তার পুত্রবধূ মীম।
কোরবানির ঈদের আগের দিন ঢাকার আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর খবর নাড়িয়ে দিয়ে গেল পুরো বাংলাদেশকে। হঠাৎ করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ছয়টি শিশু কেন শ্বাসকষ্টে ছটফট করে মারা গেল, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস ঘটনাস্থল ঘুরে দেখে বলেছেন, হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডের যে অংশে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে, সেখানকার পরিবেশ ‘শ্বাসরুদ্ধকর’ ছিল।
আর অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হান বলেছেন, চিকিৎসাজনিত কোনো জটিলতায় নয়, ‘কোনো একটা টেকনিক্যাল ফল্টের কারণে’ এ ঘটনাটা ঘটছে বলে তার ধারণা।
মঙ্গলবার রাতে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে ছিলেন ১১ জন প্রসূতি এবং তাদের ছয়জনের ছয়টি বাচ্চা। শিশুগুলোর বয়স এক থেকে তিন দিন। আরো পাঁচটি বাচ্চা চিকিৎসার কারণে আগে থেকেই এনআইসিইউতে (শিশুদের জন্য বিশেষায়িত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) ছিল।
বাচ্চাদের ঠান্ডা লাগছে জানিয়ে রাতে এসি বন্ধ করতে বলেন কয়েকজন মা। ঘণ্টাখানেক পর আবার এসি চালু করা হয়। ভোরের দিকে শিশুগুলোর শ্বাসকষ্টের মত লক্ষণ ও বমিভাব দেখা দেয়। তাদের নেওয়া হয় এনআইসিইউতে। সেখানেই একে একে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়।
এসি থেকে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়েছিল বলে কথা উঠলেও সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এসিতে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও তা বলতে পারেনি।
আদ-দ্বীন হাসপাতাল নির্ধারিত বিল্ডিং কোড এবং স্বাস্থ্যসেবা–সংক্রান্ত অবকাঠামোগত মানদণ্ড পুরোপুরি মেনে চলছিল কি না, সেই প্রশ্নও এখন সামনে আসছে।
শোকস্তব্ধ পরিবারগুলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অবহেলা, গাফিলতি, এমনকি তথ্য গোপনের অভিযোগ এনেছে। এমনকি অভিভাবকরা এও বলছেন-শিশুগুলো মারা যায়নি, তাদের ‘হত্যা’ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, গাফিলতি বা অবহেলা ছিল কি না তা বলা যাবে তদন্তের পর। আর আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন বলেছেন, এ ঘটনায় তারা ‘অত্যন্ত দুঃখিত এবং ব্যথিত’। তিনি বলেন, "আমি একজন মা হিসেবে বলতে চাই এর এর চেয়ে বড় ব্যথা বা পেইন আর কিছু হতে পারে না। যেই বাচ্চাগুলো মারা গেছে, তাদের বাবা-মার কষ্ট আমরা ফেরত দিতে পারব না। কিন্তু যেন এই ধরনের ঘটনা এখানে অন্য কোথাও যেন না হয়, এটা অবশ্যই আমাদের তদন্ত করতে হবে।”
তবে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল সরাসরি আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেই দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, “হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে ছয়টি প্রাণ ঝরে গেছে। এসি বন্ধ রাখার ফলে আর কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকায় অক্সিজেনের অভাবে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের মত পরিস্থিতি হওয়ায় সম্ভবত তাদের মৃত্যু হয়েছে। এরই মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন। হাসপাতালে পুলিশ মোতায়েনসহ তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। শিশু মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে যা যা করা দরকার, সব করা হবে।”
কী ঘটেছিল রাতে
সকালে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হান। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহিদ রায়হান রাতের ঘটনাপ্রবাহের একটি বিবরণ দেন। তিনি বলেন, “আমরা যে ঘটনাটা জানতে পারছি, সেটা হল, প্রথমে ২টার সময়, রাত ২টার সময় বাচ্চার কোনো একজন গার্ডিয়ান বাচ্চাদের ঠান্ডা লাগছে বলে এসি অফ করতে বলেন। এসিটা এক ঘণ্টা অফ ছিল। তাহলে হল ৩টা। ৪টার সময় প্রথম বাচ্চাটা অসুস্থ হয়। একটা বাচ্চা কান্নাকাটি করে অসুস্থ হয়, তখন নার্স ওই বাচ্চাটাকে এনআইসিইউতে নিয়ে যায়। নিয়ে যাওয়ার ১৫-২০ মিনিট বা আধা ঘণ্টা পর বাচ্চাটা আবার ইম্প্রুভ করে। করার পর তাকে আবার এই ভিকটিম এরিয়াতে নিয়ে আসে।”
ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, “এখানে আনার পর তখন হয়তো ধরেন সাড়ে ৪টা বা পৌনে ৫টা এরকম বাজে। ৬টার সময় নার্স খেয়াল করেন একজন বাচ্চা মারা গেছে। তাকে সাথে সাথে এনআইসিইউতে নেয়। সাবসিকোয়েন্টলি বাচ্চাগুলো খারাপ হতে থাকে। পরবর্তীতে সব বাচ্চাগুলোকেই এনআইসিইউতে নেওয়া হয় এবং দুঃখজনকভাবে এনআইসিইউতে তাদের মৃত্যু হয়, ছয়টা বাচ্চার।”
আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ডা. নাহিদ ইয়াসমিনও হাসপাতালের পক্ষে আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে এসে রাতের ঘটনার একটি বিবরণ দেন। তিনি বলেন, “হঠাৎ করে আমরা খবর পেয়েছি, যে তাদের (পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে থাকা ছয় শিশুর) শ্বাসকষ্ট হয়েছে এবং (ভোর) ৬টার সময় তাদেরকে এনআইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং এনআইসিইউতে নেওয়ার পরে, দুই বাচ্চাকে মৃত পাওয়া গেছে আর বাকি চারটা বাচ্চা ভেরি ক্রিটিক্যাল অবস্থায় ছিল। তাদেরকে ভেন্টিলেটরে দেওয়া হয়েছে। আমাদের নিওনেটাল আইসিইউতে ডাক্তাররা আছে, তারা অনেক চেষ্টা করেছে, রক্ষা করতে... মোট বাচ্চা ছয়টা মারা গেছে।”
সাংবাদিকদের প্রশ্নে আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক বলেন, বাকি বাচ্চাগুলো আগে থেকেই এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল, তারা ‘খুব ভালো অবস্থায়’ আছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও এক বিবৃতিতে ‘গভীর দুঃখ ও শোক’ প্রকাশ করে রাতের ঘটনার একটি বিবরণ দিয়েছে। সেখানে বলা হয়, “ঘটনার প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২৬ মে ২০২৬ দিবাগত রাত ২টার দিকে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড-২ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রগুলো চালু থাকলেও একাধিক নবজাতক শিশুর মায়েরা সেগুলো বন্ধ করার জন্য বলেন। এক পর্যায়ে কর্তব্যরত নার্সরা সেগুলো বন্ধ করে দেন। রাত ৩টার দিকে আবার এসি চালু করা হয়। এরপর রাত ৪টার দিকে একজন বাচ্চা অস্বাভাবিকভাবে কান্না করতে থাকলে দ্রুত নবজাতক শিশুর পরিচর্যা কেন্দ্র এনআইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে অন্য ৫ জন বাচ্চাকেও দ্রুত সময়ের মধ্যে এনআইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়।”
বিবৃতিতে বলা হয়, “সকাল ৬টার সময় প্রথম বাচ্চা মারা যায় এবং সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে অন্য ৫ নবজাতক শিশু মারা যায়।”
‘শ্বাসরুদ্ধকার পরিবেশ’
ঘটনাস্থল ঘুরে দেখার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “ভোরে এই রুমটিতে এসি জটিলতা অথবা যে কোনো কারণেই হোক ওখানের যে পরিবেশ একটি সাফোকেটিভ পরিবেশের মতো আমরা পেয়েছি। ওখানে আসলে এসি এমনভাবে ছিল যে, এসিটি বন্ধ করলে ওখানে আর ভেন্টিলেশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। এরকম একটি পরিস্থিতিতে আমরা ভোরে ৬ জন শিশুকে হারিয়েছি।”
একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ওই ছয় শিশুর ‘সাফোকেশন’ হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। তার কতক্ষণ পর একটা বাচ্চা মারা যায়? ওই সময় হাসপাতালের কোনো ডাক্তার, নার্স সেখানে ছিলেন কি না।
জবাবে অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “আমরা রুমটি পরিদর্শন করে যেটা দেখেছি, ওখানে কর্তব্যরত সেবিকা ছিলেন। একটি সেবিকাদের টিম ছিলেন। এবং আমরা জানতে পেরেছি যে ওই রুমে যখন কোনো বাচ্চা অসুস্থ হয়, ওনারা হাসপাতালের যে প্রচলিত যে সিস্টেমটি আমরা দেখেছি যে ওনারা এই বাচ্চাদেরকে পাঁচ তলায় এনআইসিইউতে চিকিৎসার জন্য পাঠান। এই জায়গাটিতে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে যে একটি দুর্বলতা আছে এবং কর্তৃপক্ষ এটি আমাদেরকে জানিয়েছেন। কিন্তু সেবার দিক থেকে কোনো ত্রুটি আছে কিনা, এটি আমরা অবশ্যই খতিয়ে দেখব এবং এ বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে।”
শিশুগুলোর মৃত্যু কীভাবে বা কী কারণে হল, ‘তদন্ত না করে তা বলা সম্ভব নয়’ বলে মন্তব্য করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জাহিদ রায়হান। তিনি বলেন, “আমরা যেটুকু বলতে পারি, সেটা হল যে ছয়জন বাচ্চার সাডেন মৃত্যু এটা চিকিৎসাজনিত কোনো জটিলতায় আমাদের মনে হয় না। মানে পরপর ছয়জন বাচ্চা একই সাথে মারা যাবে, এখানে কোনো একটা টেকনিক্যাল ফল্টের কারণে এই ঘটনাটা ঘটছে বলে আমরা মনে করি।”
এটা বোঝার জন্য ‘ডাক্তার হওয়ার দরকার নাই’ মন্তব্য করে ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, “এটা খুব সাধারণ একটা কমন সেন্স কাজ করবে যে এক ঘণ্টা বা দুই ঘণ্টার মধ্যে ছয়টা বাচ্চা হঠাৎ করে কেন মারা গেল। আপনারা শুনে আশ্বস্ত হবেন, সিআইডির টেকনিক্যাল এক্সপার্ট, এসি এবং অন্যান্য ইলেকট্রিক ইকুইপমেন্টসের ম্যানেজমেন্ট ব্যাপারে যারা এক্সপার্ট, তারা ওই রুমটা বন্ধ করে তাদের মত তদন্ত করছেন। এই তদন্ত রিপোর্টটা আমাদের কাছে ডেফিনেটলি আসবে। সেই অনুযায়ী আমরা একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারব।”
তবে এখন যেমন হামের প্রাদুর্ভাব চলছে, কিংবা ডায়রিয়া বা অন্য কোনো রোগে আধা দিনের মধ্যে একটি হাসপাতালে ছয়টি শিশু হঠাৎ করে মারা যাবে–বিষয়টি তেমন হওয়ার কথা নয় বলে মনে করেন অতিরিক্ত মহাপরিচালক। তিনি বলেন, “এটা হয়ত কোনো টেকনিক্যাল ত্রুটি বা ফল্টের কারণে হচ্ছে। এটা আমাদের দয়া করে একটু সময় দেবেন, আমরা একটু খতিয়ে দেখছি।”
শিশুগুলোর ময়নাতদন্ত করা হবে কি না, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেননি ডা. জাহিদ রায়হান। পুরো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “অস্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য আইনগত যে কথা, সেটা হল ময়নাতদন্ত করা উচিত। কিন্তু এই ছোট বাচ্চা, একেবারেই ছোট, একজন একটা বাচ্চা নিয়ে এসে আমাকে দেখাইছেন এইটুকু একটা বাচ্চা। আমাকে উনি প্রশ্ন করছেন যে এই বাচ্চার ওপর কাটাকুটি কোথায় করবেন আপনারা? আমি উনাকে উত্তর দিতে পারি নাই। তো এটা আমার মনে হয় যে গার্ডিয়ানদের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। আইন আইনের মতো চলবে ইনশাআল্লাহ। আমরা এটাতে সম্পূর্ণ ইনভলভ আছি।”
ময়নাতদন্ত ছাড়া মূল ঘটনা উদঘাটন করা যাবে কি না, সেই প্রশ্নে অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, “ময়নাতদন্ত ছাড়া মূল ঘটনা আইডেন্টিফাই করা ডিফিকাল্ট। ডিফিকাল্ট, কিন্তু তখন আইন আদালত যে কাজটা করবে, সেটা হল সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্সের ওপর ভিত্তি করে আইনের গতি পথ নির্ধারণ হবে।”
তদন্ত কমিটি
আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের যুগ্ম সচিবকে (বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা) সভাপতি করে গঠিত এই কমিটিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালককে (হাসপাতাল-১) সদস্য সচিব এবং অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালককে (আইন শাখা) সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের আদেশে বলা হয়েছে, কমিটি আগামী ৩ দিনের মধ্যে শিশুদের মুত্যুর কারণ অনুসন্ধান এবং প্রতিকারের জন্য করণীয় নির্ধারণ করে প্রতিবেদন দেবে। এছাড়া প্রয়োজনে নতুন সদস্য যুক্ত করতে পারবে।
ডা. প্রভাত চন্দ্র বলেন, “চিকিৎসা ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি ছিল কিনা, এবং যে রুমটিতে উনারা অবস্থান করছিলেন, সেই রুমটিতে যে সেবা দেওয়া হচ্ছিল, সেই সেবার যে পরিবেশ, সেই পরিবেশের মধ্যে যে প্রশ্নটি এসেছে যে ওখানকার এসি জটিলতা অথবা যদি কারিগরি অন্য কোনো, ত্রুটি থাকে, সেগুলো সঠিকভাবে নির্ণয় করে এ বিষয়ে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে তাদের মৃত্যুর কারণ উদঘাটন করে কমিটি আগামী ৪০ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট দেবে। রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে।”
মহাপরিচালক বলেন, এ ব্যাপারে যদি কারো কোনো গাফিলতি থাকে, হাসপাতাল কর্রতৃপক্ষের যদি কোনো অব্যবস্থাপনা থাকে, যদি অবকাঠামোগত কোনো কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়ে, সবকিছুর জন্য ‘স্তর বেঁধে’ যথাযথ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে ঢাকা মহানগর পুলিশের বম ডিসপোজাল ইউনিটও ঘটনাস্থল ঘুরে এসেছে। সেখানে কোনো ধরনের বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি ছিল কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটও সকালে হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে প্রবেশ করে বিভিন্ন আলামত ও নমুনা সংগ্রহ করে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তারা সেখানে কাজ করেন।
তদন্ত সংস্থাগুলোর কাজ শেষে পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ড সিলগালা করে দেওয়া হয়।
ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ কমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, “সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল নমুনা সংগ্রহ করছে। তদন্তের পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।”
অসহায় ছয় পরিবার
ঈদের আগের দিন সকালে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর পর সেখানে শোকের ছায়া নেমে আসে। সকালে হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড-২ এর সামনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে চলছে স্বজনদের আহাজারি।
মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা মাসুকা তার তিন দিন বয়সী মৃত নাতনিকে কোলে জড়িয়ে নির্বাক বসে ছিলেন। পাশেই অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন তার পুত্রবধূ মীম। মাসুকা বলেন, ভালো চিকিৎসার আশায় তারা মুন্সীগঞ্জ থেকে এই হাসপাতালে এসেছিলেন। অত বড় হাসপাতাল। ভালোমন্দ হইলে তারা দায়িত্ব নিয়া করবো, এই আশায় আইছিলাম। টাকার কথা চিন্তা করি নাই।” ভোরের বিভীষিকাময় মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে মাসুকা বলেন, “হঠাৎ করেই ওয়ার্ডের সব নবজাতক একসঙ্গে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। আমি ওরে (নাতনি) কোলে লইয়া দোয়া-দরুদ পইড়া ফুঁ দিলাম। তারপর একটু খাইয়া গেলাম ফজরে নামাজ পড়তে। নামাজরত অবস্থাতেই ছেলে ছুটে এসে ওর মৃত্যুর খবর দিল।” তিনি বলেন, ওই সময় শিশুটির শরীর লালচে বর্ণ ধারণ করেছিল।
ওই হাসপাতালে থাকা নাজমা বেগম তার যমজ সন্তানকে হারিয়েছেন। এছাড়া মীম, ফারিহা, জান্নাত ও ফাহিমা নামের চার মা হারিয়েছেন তাদের নবজাতক সন্তান।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যা বলছে
ছয় শিশুর মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পর সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসে ‘গভীর দুঃখ ও শোক’ প্রকাশ করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে হাসপাতালের সেবার মান, ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ নিয়ে অভিভাবকদের নানা অভিযোগের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেননি আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন।
অভিভাবকদের অভিযোগ, শিশুগুলো যখন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঠিকমত তদারকি করেনি, অভিভাবকদের ডাকতেও যায়নি।
এ বিষয়টি তুলে ধরে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলে ডা. নাহিদ বলেন, “উনারা তো অনেক কথাই বলছেন। এত দ্রুত ঘটনাটা ঘটেছে যে আমরা আসলে কোনো কিছু দেখার সুযোগই পাইনি। খুব দ্রুত লোকগুলো এবং নার্সরাসহ সবাই মিলে এই নিওনেটাল আইসিইউতে বাচ্চাদেরকে নিয়ে গিয়েছে, ভেন্টিলেটরে দিয়েছে, ডাক্তাররা চেষ্টা করেছে। বাচ্চাদের এত বেশি শ্বাসকষ্ট ছিল যে বাচ্চাদের বাঁচানো যায়নি।”
একজন সাংবাদিক এ সময় বলেন, “অভিভাবকদের অভিযোগ—এই ছয়টা বাচ্চাকে হত্যা করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণেই এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।” ডা. নাহিদ বলেন, “এই ধরনের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করছি এবং আমরা অত্যন্ত দুঃখিত এবং ব্যথিত। এর চেয়ে বড় ব্যথা, আমি একজন মা হিসেবে বলতে চাই, এর এর চেয়ে বড় ব্যথা বা পেইন আর কিছু হতে পারে না। যেই বাচ্চাগুলো মারা গেছে, তাদের বাবা-মার কষ্ট আমরা ফেরত দিতে পারব না। কিন্তু যেন এই ধরনের ঘটনা এখানে অন্য কোথাও যেন না হয়, এটা অবশ্যই আমাদের তদন্ত করতে হবে।”
আরেকজন সাংবাদিক বলেন, “শুধুমাত্র অবহেলার কারণেই? এটা আসলে কী কারণে হয়েছে?”
জবাবে আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক বলেন, “এটা আমাদের তদন্ত করে দেখতে হবে। কারণ, আমরা এখন পর্যন্ত তদন্ত করার কোনো সুযোগই পাইনি। আমাদের আইনি বিশেষজ্ঞ যারা আছেন এবং বিভিন্ন সেক্টর থেকে অনেকেই এসেছেন, ডিজি হেলথ থেকে এসেছেন, আমাদের ডিজি স্যার এসেছেন, প্রশাসনের অনেকেই এসেছেন, সবাই কিন্তু এটা তদন্ত করে বের করবে যে কী কারণে হল। একসাথে ছয়টা বাচ্চা মারা যাওয়ার ঘটনা, আদ-দ্বীন হসপিটালে বিগত সময়ে কখনোই এটা হয় নাই। এই হসপিটাল ১৯৯৭ সাল থেকে আমরা কাজ করছি এবং আমরা প্রচুর ডেলিভারি করে থাকি এবং এই ডেলিভারিও কোনো রকম কোনো সমস্যা ছাড়া হয়েছে।”
একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, “আমরা এসি লিকেজের কথা শুনেছি, আপনারা কি এটা...।”
জবাবে ডা. নাহিদ বলেন, “এসি আমরা সব সময়ই চেক করি। এসি লিকেজ ছিল কি না, এই বিষয়টাতো এখনও তদন্ত করে বের করতে হবে। আমাদেরকে সুযোগ দিতে হবে। ফরেনসিক টিম এসেছে, তারা এই বিষয়টা দেখছে।”
কোনো কোনো অভিভাবক তথ্য গোপনের অভিযোগ করছেন, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ডা. নাহিদ বলেন, “না না না, এখানে শুধু ছয়টা বাচ্চাই মারা গেছে। আমি কনফিডেন্টলি বলতে পারি এখানে শুধুমাত্র ছয়টা বাচ্চাই মারা গেছে। আর বাকি পাঁচটা শিশু ভালো আছে। ওই যে তারা এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন আছে।”
এক সাংবাদিক প্রশ্ন করতে গিয়ে বলেন, “সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল রাত ১২টা থেকে একটা শিশুর সাফোকেশনে মারা গেছে। কতটা সময়ে একটা শিশু ছটফট করলে সে মারা যায়? অবহেলার কোনো বিষয় আছে কি না একটু বলবেন?”
জবাবে আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক বলেন, “এই বিষয়ে আমি যেটা বলতে চাই, ৩টার পরে, রাত ৩টার পরে একটা বাচ্চার শ্বাসকষ্ট মনে হওয়ায় তাকে এনআইসিইউতে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং নিওনেটোলজিস্ট যারা আছেন, তারা দেখে বলেছেন যে না, বাচ্চার ভাইটাল সাইন সবকিছু ভালো আছে। তখন কিন্তু তাকে আবার ওয়ার্ডে নিয়ে আসছে। আসলে বাচ্চাগুলো অসুস্থ হয়েছে ৬টার দিক থেকে। ৬টার সময় একসাথে ছয়টা বাচ্চা, তখনই কিন্তু দু-তিন লোকজন এবং নার্সসহ সবাই মিলেই এনআইসিইউতেই নিয়ে গেছে।”
ভোরে শিশুগুলোর মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো ব্রিফ না করায় যে অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন করলে ডা. নাহিদ বলেন, “অভিযোগ করতে পারে, কিন্তু এখানে কোনো ধরনের… আমরা নিজেরাই তো জানি না, আমাদেরকে তো তদন্ত করে বের করতে হবে কেন হল।"
পরে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এক বিবৃতিতে বলা হয়, “এ ধরনের মর্মান্তিক ও দুঃখজনক দুর্ঘটনা কেন ঘটল সে বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সার্বিকভাবে সহযোগিতা করছেন।”
আদ-দ্বীন কর্তৃপক্ষও অভ্যন্তরীণভাবে এ ঘটনার তদন্ত করছে জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, “ঘটনায় কারও গাফিলতি কিংবা ত্রুটি চিহ্নিত হলে অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
সূত্র : বিডিনিউজ