রামপুরার অভিযান ছিল ‘রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ’: ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ

ইমরান হোসাইন
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি করার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনালের এ মন্তব্য এসেছে।
চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সময় রাজধানীর রামপুরা-বনশ্রী এলাকায় নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর হামলাকে ‘রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত ব্যাপক ও পরিকল্পিত আক্রমণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি করার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনালের এ মন্তব্য এসেছে

গত ২৮ জুন ওই রায়ে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ওসি মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া এসআই তারিকুল ইসলামকে যাবজ্জীবন এবং এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় রায়ে। বুধবার প্রকাশিত ১৪৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছে, রামপুরা-বনশ্রীর ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, ‘এটি ছিল দেশজুড়ে আন্দোলন দমনে পরিচালিত বৃহত্তর অভিযানের অংশ, যেখানে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নির্দেশের ধারাবাহিকতায় প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়।”

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, “রামপুরা-বনশ্রীর ঘটনাগুলো ছিল রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সদস্যদের সমন্বয়ে বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি ব্যাপক ও সুসংগঠিত আক্রমণের অংশ।”

এ মামলার প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরাসরি নির্দেশনায় এবং তখনকার ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের আদেশে আসামিরা নিজেদের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকার বাইরে গিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ চালান।

ওই বছরের ১৯ জুলাই দুপুর আনুমানিক ২টা থেকে আড়াইটার দিকে বনশ্রী এইচ ব্লকে জামে মসজিদের সামনের গলিতে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। তখন মো. নাদিম (৩৮) নামে এক ব্যক্তি পেটে দুটি গুলি লাগে এবং ঘটনাস্থলেই মারা যান।

দ্বিতীয় অভিযোগে কার্নিশে ঝুলে থাকা ১৮ বছরের তরুণ আমির হোসেনকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি ও গুরুতর জখম করার ঘটনা বর্ণনা দেওয়া হয়।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকালে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলি ও ধাওয়া খেয়ে বনশ্রী জামে মসজিদের পাশে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্মাণাধীন ভবনে আশ্রয় নেন আমির হোসেন। আত্মরক্ষায় তিনি ওই ভবনের তৃতীয় তলার ছাদ ঢালাইয়ের পাইপ ধরে ঝুলে ছিলেন। সেখানে এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার ও এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া উপস্থিত হয়ে তাকে নিচে লাফ দিতে বলেন। ওই তরুণ লাফ না দেওয়ায় পর পর ছয়টি গুলি করা হয়। এতে তিনি গুরুতর জখম হন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাবিব, রাশেদুল ও মশিউর

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাবিব, রাশেদুল ও মশিউর

মামলার তৃতীয় অভিযোগে মায়া ইসলাম (৬০) নামে এক বৃদ্ধাকে গুলি করে হত্যা এবং তার ছয় বছরের নাতি বাসিত খান মুসাকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকালে বনশ্রী জি ব্লকে রামপুরা থানার সামনের একটি বাসার নিচতলায় গেইটের ভেতরে দাদি-নাতি অবস্থান করছিলেন। আসামিরা যখন ক্রমাগত গুলি চালাচ্ছিল, তখন পুলিশের একটি বুলেট শিশু মুসার মাথা ভেদ করে বেরিয়ে যায় এবং তা সরাসরি তার দাদি মায়া ইসলামের পেটে বিদ্ধ হয়। আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মায়া ইসলাম মারা যান।

রায়ের পর্যবেক্ষণ ট্রাইব্যুনাল বলেছে, নাদিম, মায়া ইসলাম, শিশু বাসিত খান মুসা ও আমির হোসেনের ঘটনাগুলো ‘সেই বৃহত্তর হামলার’ অংশ হিসেবেই সংঘটিত হয়।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১ জুলাই শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন ধীরে ধীরে দেশব্যাপী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য এবং পরদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের পর আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হামলার পর আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

রায়ে বলা হয়েছে, ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। তাতে সাধারণ মানুষও যুক্ত হন। এরপর আন্দোলন দমনে শুধু পুলিশ নয়, র‍্যাব, বিজিবি, আনসার, গোয়েন্দা সংস্থা এবং আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরাও সমন্বিতভাবে অংশ নেয় বলে অভিযোগ করা হয় এ মামলায়।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আন্দোলন দমনে গুলিবর্ষণই একমাত্র পদ্ধতি ছিল না। ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রাখা, মৃতদেহ গুমের অভিযোগ, আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার পথে বাধা, অ্যাম্বুলেন্স চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি, চিকিৎসাসেবা ব্যাহত করা, মৃতদেহ দাফনে বাধা এবং চিকিৎসকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন —এসব ঘটনাও ‘বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত একই পদ্ধতিগত হামলার অংশ’ ছিল।

ট্রাইব্যুনাল বলেছে, “উপস্থাপিত টেলিফোন আলাপ, নথি এবং অন্যান্য প্রমাণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র, ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসভবনে অনুষ্ঠিত একটি কোর কমিটির বৈঠকে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই বৈঠকে তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সিদ্ধান্তের পর হাবিবুর রহমান ওয়্যারলেস বার্তায় অধস্তন পুলিশ সদস্যদের আন্দোলন দমনে ‘সর্বোচ্চ মাত্রার বলপ্রয়োগের’ নির্দেশ দেন।”

আত্মপক্ষ সমর্থনে হাবিবুর রহমান দাবি করেছিলেন, তিনি হাঁটু গেড়ে বসে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে ট্রাইব্যুনাল বলেছে, একই নির্দেশনায় ‘সর্বোচ্চ মাত্রার বলপ্রয়োগের’ কথাও ছিল।

আদালত আরও বলেছে, আন্দোলনকারীদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল—এমন কোনো দাবি আসামিপক্ষও উপস্থাপন করেনি। ফলে আত্মরক্ষার প্রয়োজন দেখিয়ে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের কোনো আইনগত ভিত্তি ছিল না।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারেরই ‘নির্দেশক’। আর যুদ্ধক্ষেত্রের মত পরিস্থিতিতে হাঁটু গেড়ে বসে ‘সর্বোচ্চ শক্তি’ প্রয়োগের দাবিও বাস্তবসম্মত নয়।

ট্রাইব্যুনাল বলেছে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে গৃহীত সিদ্ধান্ত ও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন একত্রে বিবেচনায় নিলে একটি ‘পূর্বপরিকল্পিত ও সমন্বিত’ অভিযানের চিত্রই তুলে ধরে।

রায়ে বলা হয়, ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর রাজধানীর রামপুরা-বনশ্রী এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। বনশ্রী মসজিদের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন নাদিম।

একই দিন ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় এডিসি রাশেদুল ইসলাম, ওসি মশিউর রহমান, এসআই তারিকুল ইসলাম ও এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারসহ পুলিশ সদস্যরা এলোপাতাড়ি গুলি চালান।

এ সময় একটি চাইনিজ রাইফেলের গুলি রামপুরা থানার পাশের একটি গলির বাড়ির গেটের ভেতরে থাকা শিশু বাসিত খান মুসার মাথায় বিদ্ধ হয় এবং অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে তার দাদি মায়া ইসলামের পেটে গিয়ে লাগে।

মায়া ইসলাম পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। শিশু মুসা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিএমএইচ ঢাকা ও সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নেওয়ার পর বর্তমানে সিএমএইচ ঢাকায় চিকিৎসাধীন। পুলিশের ধাওয়া থেকে বাঁচতে একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশের রড আঁকড়ে ধরে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হন আমির হোসেন।

ট্রাইব্যুনাল বলেছে, উপস্থাপিত সাক্ষ্য, ভিডিওচিত্র, আলামত ও নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায় , ঘটনাগুলো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন গুলিবর্ষণের ফল ছিল না, বরং ‘আন্দোলন দমনে পরিচালিত সমন্বিত অভিযানের অংশ’ হিসেবেই সংঘটিত হয়।

রায়ের আইনি বিশ্লেষণে ট্রাইব্যুনাল বলেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণের জন্য দুটি শর্ত পূরণ করতে হয়। বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত আক্রমণটি রাষ্ট্রীয় বা সাংগঠনিক নীতির অংশ হতে হবে, এবং তা ব্যাপক (ওয়াইডস্প্রেড) অথবা পরিকল্পিত (সিস্টেম্যাটিক) হতে হবে।

উপস্থাপিত সাক্ষ্য, নথি, ভিডিওচিত্র ও অন্যান্য আলামত পর্যালোচনার পর ট্রাইব্যুনাল মনে করেছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান দমনে পরিচালিত অভিযান এসব আইনি উপাদান পূরণ করেছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ৩ ও ৪ ধারা এবং রোম সংবিধির ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় বা সাংগঠনিক নীতির অংশ হিসেবে পরিচালিত এই ধরনের ব্যাপক ও পরিকল্পিত আক্রমণ মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞা পূরণ করে বলে ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত দিয়েছে।

রোম সংবিধির ৭ অনুচ্ছেদ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ও সাবেক যুগোস্লাভিয়া বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের (আইসিটিওয়াই) বিভিন্ন সিদ্ধান্তও এ রায়ে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

ডিএমপি কমিশনার হিসেবে হাবিবুর রহমানের ভূমিকা মূল্যায়ন করতে গিয়ে ট্রাইব্যুনাল ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ নীতি প্রয়োগ করেছে।

ট্রাইব্যুনাল বলেছে, তিনি অধস্তন পুলিশ সদস্যদের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগের অবস্থানে ছিলেন এবং ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কেও অবগত ছিলেন।

“অপরাধ প্রতিরোধ, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ কিংবা দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তিনি অভিযানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন এবং অধস্তন সদস্যদের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেন। ফলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে তিনি আইনগত দায় থেকে অব্যাহতি পেতে পারেন না।”

অভিযানের পর হাবিবুর রহমান রামপুরা থানায় গিয়ে তৎকালীন ওসি মশিউর রহমানকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেন। এই ঘটনা অধস্তন সদস্যদের কর্মকাণ্ডের প্রতি তার ‘সমর্থনেরই প্রতিফলন’ বলে ট্রাইব্যুনাল মনে করছে।

বাসিত খান মুসা
বাসিত খান মুসা


খিলগাঁও জোনের তৎকালীন এডিসি রাশেদুল ইসলাম সম্পর্কে ট্রাইব্যুনাল বলেছে, তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে অভিযান তদারকি করেন। পরে ঘটনাটি নিয়ে ভাইরাল হওয়া ভিডিও পর্যালোচনার সময়ও তার উপস্থিতির বিষয়টি সাক্ষ্য ও নথিতে উঠে এসেছে।

আদালতের বলেছে, ঘটনাস্থলে তার উপস্থিতি এবং দায়িত্ব পালনের বিষয়টি ‘নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণে’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

রায়ে বলা হয়, রামপুরা থানার তৎকালীন ওসি মশিউর রহমান কেবল অভিযানের নেতৃত্বই দেননি, তিনি নিজেও গুলিবর্ষণে অংশ নেন।

আদালতের বিচারে, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ তার ‘সক্রিয় অংশগ্রহণের’ তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আমির হোসেনকে লক্ষ্য করে গুলির ঘটনায় ট্রাইব্যুনাল বলেছে, তিনি নির্মাণাধীন ভবনে আশ্রয় নেওয়ার পর এসআই তারিকুল ইসলাম ও এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার তাকে লক্ষ্য করে একাধিকবার গুলি করেন। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে তা মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

ট্রাইব্যুনাল বলেছে, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, ভিডিওচিত্র, পুলিশের নথি, ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং অন্যান্য আলামত পরস্পরকে ‘সমর্থন’ করে।

এসব প্রমাণ একত্রে মূল্যায়ন করলে আমির হোসেনকে গুলি করার ঘটনায় তারিকুল ইসলাম ও চঞ্চল চন্দ্র সরকারের সম্পৃক্ততা ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়’ বলে আদালত মনে করেছে।

রায়ে বলা হয়েছে, সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নিয়ে আরেকটি ভিডিও উপস্থাপন করে। সেখানে চঞ্চল চন্দ্র সরকার নিজেই স্বীকার করেন, তিনি ও এসআই তারিকুল ইসলাম নির্মাণাধীন ভবনের রড আঁকড়ে থাকা আমির হোসেনকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলেন।

অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এই ভিডিও পরীক্ষা করে মত দেয়, চঞ্চল চন্দ্র সরকারের এই স্বীকারোক্তি প্রকৃত এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়নি।

আদালত এই ফরেনসিক মতামতকে অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে গ্রহণ করেছে।

তারিকুল ইসলামের আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তি মূল্যায়ন করতে গিয়ে ট্রাইব্যুনাল তার নিজের করা সাধারণ ডায়েরির (জিডি) তথ্যও বিবেচনায় নিয়েছে।

আদালত মনে করেছে, ওই জিডির তথ্য তার ঘটনাস্থলে উপস্থিতি এবং অভিযানে অংশগ্রহণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

অন্যদিকে খাগড়াছড়িতে গ্রেপ্তারের পর প্রসিকিউটর মো. জোহাকে দেওয়া স্বীকারোক্তির বিষয়ে এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার ট্রাইব্যুনালে পুনঃপরীক্ষার সময় দাবি করেন, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে তার কাছ থেকে ওই বক্তব্য নেওয়া হয়েছিল।

তবে ট্রাইব্যুনাল বলেছে, ভিডিওতে জোর প্রয়োগের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।

এছাড়া গ্রেপ্তারের পর ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়ার সময়, ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি জবানবন্দি দেওয়ার সময় কিংবা ২০২৬ সালের ১০ জুন পুনরায় জবানবন্দি দেওয়ার সময়েও তিনি এ ধরনের কোনো অভিযোগ তোলেননি।

ফলে পরবর্তী সময়ে উত্থাপিত ওই দাবি ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে ট্রাইব্যুনাল মনে করেছে।

তবে নাদিম ও মায়া ইসলাম হত্যা এবং শিশু বাসিত খান মুসাকে গুরুতর আহত করার অভিযোগে তারিকুল ইসলাম ও চঞ্চল চন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি’ বলে ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত দিয়েছে।

এ কারণে ওই দুই অভিযোগ থেকে তাদের অব্যাহতি দেওয়া হলেও, আমির হোসেনকে গুলি করে গুরুতর আহত করার অভিযোগে তাদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

অন্যদিকে হাবিবুর রহমান, রাশেদুল ইসলাম ও মশিউর রহমানের বিরুদ্ধে নাদিম ও মায়া ইসলামকে হত্যা এবং বাসিত খান মুসা ও আমির হোসেনকে গুরুতর আহত করার তিনটি অভিযোগই ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে’ বলে ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে।

সাজা নির্ধারণে ট্রাইব্যুনাল বলেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের ভয়াবহতা, অপরাধ সংঘটনের ধরন, আসামিদের দায়িত্ব ও ভূমিকা এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় হাবিবুর রহমান, রাশেদুল ইসলাম ও মশিউর রহমান সর্বোচ্চ দণ্ডের উপযুক্ত।

তবে তিনটি অভিযোগে পৃথক পৃথক দণ্ড না দিয়ে প্রত্যেকের ক্ষেত্রে একটি করে একক সাজা দেওয়াই সমীচীন বলে ট্রাইব্যুনাল মনে করেছে। এসআই তারিকুল ইসলাম ও এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল বলেছে, তারা অধস্তন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং তাদের বিরুদ্ধে কেবল আমির হোসেনকে গুলিবিদ্ধ করার অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া আমির হোসেন প্রাণে বেঁচে গেছেন এবং চঞ্চল চন্দ্র সরকার পলাতক না থেকে বিচারিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছেন এবং দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। সাজা নির্ধারণে এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

রায়ের শেষাংশে ট্রাইব্যুনাল হাবিবুর রহমান, রাশেদুল ইসলাম ও মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড, এসআই তারিকুল ইসলামকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে রায় কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ মামলায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা গত বছরের ৩১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। পরে ৭ আগস্ট প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করলে ১৮ সেপ্টেম্বর পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা ও আইসিটি তদন্ত সংস্থার সহকারী পরিচালক সৈয়দ আব্দুর রউফ ৩০ জনের সাক্ষ্য নিলেও প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালে ১৪ জন সাক্ষী উপস্থাপন করে। তাদের মধ্যে ছিলেন আহত আমির হোসেন, নিহত মায়া ইসলামের ছেলে ও গুলিবিদ্ধ শিশু মুসার বাবা মো. মোস্তাফিজুর রহমান, নিহত নাদিম মিজানের স্ত্রী তাবাসুম আক্তার নিহা, প্রত্যক্ষদর্শী ইয়াকুব এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ পুলিশের কয়েকজন সদস্য।

সূত্র: বিডিনিউজ

বিষয়:

এলাকার খবর

সম্পর্কিত