শেখ হাসিনার কথিত ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে, ‘পাল্টা আগুন’ ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের নির্দেশের দাবি

আজাদ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
চব্বিশের আন্দোলনের সময় সেতু ভবন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ভবনে আগুন দেওয়া হয়। ফাইল ছবি ছবি:
চব্বিশের আন্দোলনের সময় সেতু ভবন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ভবনে আগুন দেওয়া হয়। ফাইল ছবি ছবি:

 

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের ও হাছান মাহমুদের কথিত অডিও ফোনালাপ উপস্থাপন করেছে প্রসিকিউশন; আন্দোলন দমন, গ্রেপ্তার ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ নিয়েও কথোপকথনের দাবি

জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিভিন্ন নির্দেশ ও উসকানির অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে কয়েকটি কথিত অডিও ফোনালাপ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ উপস্থাপন করেছে প্রসিকিউশন। এসব কথোপকথনে ‘পাল্টা আগুন’, জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে হেলিকপ্টার ব্যবহারের কথা এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

সোমবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় প্রসিকিউশনের পক্ষে এসব অডিও উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। পরে কথোপকথনের একটি অনুলিপিও সাংবাদিকদের দেওয়া হয়।

প্রসিকিউশনের দেওয়া নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ ও ২১ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের কথোপকথন হয়।

পাল্টা আগুন’ দেওয়ার কথা

১৯ জুলাই দুপুরে শেখ হাসিনা ও হাছান মাহমুদের কথিত ফোনালাপে আন্দোলনকারীদের দেওয়া আগুনের জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে কথা হয় বলে প্রসিকিউশনের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ওই কথোপকথনে শেখ হাসিনার কণ্ঠ হিসেবে যে বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে, সেখানে আন্দোলনকারীদের বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়ার পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দলীয় নেতাদের নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে ‘প্রোটেকশনের’ ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলেও নথিতে দাবি করা হয়েছে।

এরপর ওবায়দুল কাদের কথোপকথনে যুক্ত হন। সেতু ভবনে আগুন দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে সেখানে নিরাপত্তা জোরদার এবং আন্দোলনকারীদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শনাক্ত করার কথা বলা হয় বলে প্রসিকিউশনের দাবি।

জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে হেলিকপ্টার ব্যবহারের প্রসঙ্গ

আরেকটি কথিত ফোনালাপে আন্দোলনকারীদের জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে র‍্যাব, বিজিবি ও হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখার কথা বলা হয়েছে বলে প্রসিকিউশন জানিয়েছে।

ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে কথোপকথনের সময় শেখ হাসিনা জমায়েত বেশি হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি হেলিকপ্টার ব্যবহারের কথা বলেন—এমন দাবি করা হয়েছে নথিতে।

এ সময় দলীয় কর্মীদের সংগঠিত করার কৌশল নিয়েও আলোচনা হয় বলে প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত কথোপকথনে উল্লেখ রয়েছে।

গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক নেতাদের প্রসঙ্গ

কথিত ফোনালাপে আন্দোলনের সময় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তারের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে প্রসিকিউশনের নথিতে দাবি করা হয়েছে। বিএনপির তৎকালীন নেতা রুহুল কবির রিজভীকে গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গও কথোপকথনে এসেছে বলে জানানো হয়।

এ ছাড়া ১৪ দলের নেতাদের ভূমিকা এবং আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে প্রসিকিউশন জানিয়েছে।

টনীতিকদের ব্রিফিং ও গণমাধ্যম প্রসঙ্গ

২১ জুলাইয়ের কথিত আরেক ফোনালাপে হাছান মাহমুদ বিদেশি কূটনীতিকদের ব্রিফিংয়ের বিষয়ে শেখ হাসিনাকে অবহিত করেন বলে প্রসিকিউশনের নথিতে বলা হয়েছে।

সেখানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের ব্রিফিংয়ের কথা উল্লেখ করা হয়। গণমাধ্যমকে ব্রিফিংয়ে না রাখার কারণ হিসেবেও কিছু বিষয় আলোচনা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

ইন্টারনেট সংযোগ নিয়েও কথোপকথনে উদ্বেগের বিষয়টি উঠে আসে বলে প্রসিকিউশন জানিয়েছে।

আন্দোলনের দায় কার ওপর চাপানো হবে, তা নিয়েও আলোচনা

প্রসিকিউশনের দাবি, কথিত ফোনালাপে জুলাইয়ের সহিংসতা ও অগ্নিকাণ্ডের দায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপানোর কৌশল নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

এ সময় কোটা সংস্কারসংক্রান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত, আদালতের ভূমিকা এবং আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরার বিষয়েও আলোচনা হয় বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রসিকিউশন আরও দাবি করেছে, আন্দোলনের সময় সরকারের পক্ষ থেকে একটি নির্দিষ্ট বয়ান প্রচারের চেষ্টা করা হয়েছিল এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার দায় তাদের ওপরই চাপানোর পরিকল্পনা ছিল।

‘ছাত্ররা নিজেরাই গুলি করে মারছে’—কথিত ফোনালাপে

উপস্থাপিত কথোপকথনের শেষদিকে আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর কারণ নিয়ে একটি বক্তব্যও তুলে ধরে প্রসিকিউশন। সেখানে শেখ হাসিনার কণ্ঠ হিসেবে যে বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই গুলি করে অন্য শিক্ষার্থীদের হত্যা করছে—এমন দাবি করার কথা বলা হয়েছে।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ, আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সমন্বিতভাবে নির্দেশ, উসকানি ও দমনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এসব কর্মকাণ্ডের ফলেই জুলাই-আগস্টে হত্যা ও ব্যাপক সহিংসতা ঘটে বলে তাদের দাবি।

বিচারপ্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে

এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৮ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালে জানানো হয়েছে। গত ৪ আগস্ট থেকে মামলাটিতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়েছে।

এর আগে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।

ওবায়দুল কাদের ছাড়া মামলার অন্য পলাতক আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগ সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।

তবে ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত অডিওগুলোর বক্তব্য ও এর ব্যাখ্যা প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত দাবি ও নথির ভিত্তিতে এসেছে। এসব বক্তব্যের সত্যতা ও প্রামাণিকতা শেষ পর্যন্ত বিচারিক প্রক্রিয়ায় কীভাবে মূল্যায়িত হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত