শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণে ভারতের আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে: ভারতীয় সংবাদমাধ্যম

আজাদ ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ঢাকা যে অনুরোধ জানিয়েছে, সেটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বা কূটনৈতিকভাবে নয়, ভারতের আদালতের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হবে বলে জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম *দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস*। ভারতীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, বাংলাদেশের অভিযোগগুলো ভারতের আইন অনুযায়ীও অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় কি না, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় সেটি গুরুত্বপূর্ণভাবে যাচাই করা হবে।

ভারতীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দিল্লির রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের চেয়ে আইনি প্রক্রিয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আদালতের সামনে মূল প্রশ্ন হবে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে অপরাধগুলোর অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো ভারতের আইনেও অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত কি না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভারতের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা *দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস*কে বলেছেন, আদালতের প্রক্রিয়ায় প্রমাণ করতে হবে যে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যেসব অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো ভারতের আইনেও অপরাধ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার হয়েছে এবং তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে তাঁর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সম্প্রতি বলেছেন, বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত দিল্লির পক্ষ থেকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

ভারতীয় কর্মকর্তাদের দাবি, বাংলাদেশের পাঠানো প্রত্যর্পণ অনুরোধের সঙ্গে ২০১৩ সালের ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি নথিপত্র রয়েছে। ফলে বিষয়টি এখন দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি ভারতের প্রচলিত আইনি কাঠামোর মধ্যেও বিবেচিত হচ্ছে।

২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তিতে আদালত ঘোষিত সাজা কার্যকর করার জন্য অভিযুক্ত বা দোষী ব্যক্তিকে ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের বিচারিক কর্তৃপক্ষের ভূমিকার কথাও উল্লেখ রয়েছে।

তবে চুক্তিতে রাজনৈতিক প্রকৃতির অপরাধকে প্রত্যর্পণের আওতার বাইরে রাখার বিধান রয়েছে। যদিও হত্যা, নরহত্যা, হামলা, আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার এবং হত্যায় প্ররোচনার মতো কয়েকটি গুরুতর অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মামলাগুলো কোন ধরনের অপরাধের আওতায় পড়ে, আদালতের বিবেচনায় সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় ভারতের ১৯৬২ সালের প্রত্যর্পণ আইনও প্রাসঙ্গিক। এই আইনের অধীনে প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রয়োজন হলে মন্ত্রণালয় একজন তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করতে পারে। সেই ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগের পক্ষে প্রাথমিক প্রমাণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করবেন।

আইনি প্রক্রিয়ায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রাথমিক ভিত্তি পাওয়া গেলে প্রত্যর্পণের সুপারিশ করা হতে পারে। বিপরীতে অভিযোগের পক্ষে প্রাথমিক প্রমাণ না থাকলে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগও রয়েছে।

এর ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি এখন শুধু ঢাকা-দিল্লির রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করছে না; বরং ভারতের আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়াও এতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়, অভিযোগগুলোর প্রকৃতি এবং দুই দেশের প্রত্যর্পণ চুক্তির বিধান—সবকিছু মিলিয়েই বিষয়টি পর্যালোচনা হওয়ার কথা।

এদিকে *দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস* আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্যদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, দিল্লিতে অবস্থান করেও শেখ হাসিনা দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং কখনো কখনো তাঁদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করছেন। তবে তাঁর এই রাজনৈতিক যোগাযোগ প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, সে বিষয়ে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগও চলছে। আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা মনে করছেন, ভারতে আদালতীয় প্রক্রিয়া শুরু হলে সেটিকে বিভিন্ন আইনি যুক্তিতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ থাকতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং যে সরকারের সময়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচার ও সাজা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হতে পারে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেশি। শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকর করা হবে কি না, তা এখন দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর প্রশ্ন। ঢাকার জন্য এটি শুধু একটি আইনি বিষয় নয়; জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্নের সঙ্গেও এটি সরাসরি যুক্ত।

সব মিলিয়ে, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের মূল বার্তা হলো—শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দিল্লি এককভাবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি ও ভারতের আইনি প্রক্রিয়াকে সামনে রাখছে। ফলে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ হবে কি না, তা নির্ধারণে ভারতের আদালতের পর্যবেক্ষণ ও আইনি সিদ্ধান্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত