আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের শেয়ারবাজারের চেহারা বদলে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা না ঘটলে এ সময়ের মধ্যেই পুঁজিবাজারে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে বলে জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে অর্থায়নের বড় উৎস হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
রোববার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও আন্তর্জাতিক সিকিউরিটিজ কমিশনগুলোর সংগঠন আইওএসসিওর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের আর্থিক কাঠামো, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং বেসরকারি খাতে অর্থায়নের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে অর্থের ব্যয় কমাতে হবে। তা না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ব্যবসা ও শিল্প প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না।
উন্নয়ন অর্থায়নে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতারও সমালোচনা করেন তিনি। আমির খসরু বলেন, আইএমএফের কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে, কারণ সংস্থাটির কিছু শর্ত বাংলাদেশের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, ‘আইএমএফের প্রোগ্রাম ক্যানসেল করে দিয়েছি। তাদের কন্ডিশন আমাদের কাছে অ্যাকসেপ্টেবল না। আমি মার্কেট থেকে আমার টাকা রেইজ করতে চাই। ২০৩৪ সালের মধ্যে আমরা ট্রিলিয়ন ডলারের ইকোনমিতে যেতে চাই। আমরা আইএমএফের ওপর ডিপেন্ড করতে পারি না।’
দেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বছরে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, উন্নয়ন সহযোগীরা সম্মিলিতভাবে ১০ বিলিয়ন ডলার দিলেও তা দেশের প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। ফলে দেশের নিজস্ব বাজার ও আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
এ জন্য পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে অর্থায়নের প্রধান বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। আমির খসরু বলেন, ‘ক্যাপিটাল মার্কেট ইজ দ্য আন্সার, বন্ড মার্কেট ইজ দ্য আন্সার।’
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি সংযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান অর্থমন্ত্রী। নিউইয়র্ক ও হংকংয়ের মতো বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্রের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে ডলার বন্ড, পাণ্ডা বন্ড, সামুরাই বন্ড, স্থানীয় মুদ্রার বন্ড এবং বাংলাদেশকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ইকুইটি ফান্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরির কথা বলেন তিনি।
সরকারি ও বেসরকারি—দুই খাতের প্রতিষ্ঠানকেই সিকিউরিটাইজেশনসহ নতুন আর্থিক পণ্যের মাধ্যমে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানান আমির খসরু। বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে সরকারের করদাতার অর্থ সরাসরি ব্যবহার না করে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বা প্রতিষ্ঠানকে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা তৈরির ওপরও জোর দেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, কোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগে সরকার কেন করদাতার টাকা দিয়ে অর্থায়ন করবে। ব্যবসা করলে বাজার থেকে অর্থ নিতে হবে। অর্থের ব্যয় কমাতে না পারলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।
পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থা প্রসঙ্গে আমির খসরু বলেন, অতীতে বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় আমানত ব্যবস্থা গড়ে উঠলেও সমন্বিত নীতিসহায়তার অভাবে পুঁজিবাজার প্রত্যাশিতভাবে বিকশিত হয়নি। তাঁর ভাষায়, ‘হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ’ না থাকার কারণে পুঁজিবাজার প্রকৃত অর্থে গতি পায়নি।
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বাজারকে ঘুরে দাঁড় করানোর উদ্যোগকে ‘রেসকিউ অপারেশন’ ও ‘স্যালভেজ অপারেশন’ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এ প্রক্রিয়ায় কিছু সিদ্ধান্ত কঠিন ও বেদনাদায়ক হতে পারে বলেও সতর্ক করেন অর্থমন্ত্রী।
পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বীমা খাত, স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকার, আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে একটি সমন্বিত ইকোসিস্টেমের মধ্যে আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনার অপেক্ষায় না থেকে বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের মধ্যে স্বনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী। আর্থিক প্রতিবেদন ও হিসাবের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে বলেও দাবি করেন আমির খসরু। সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিটে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বাজার তুলনামূলক ছোট হলেও ১৬টি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো সাড়া পেয়েছেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিতভাবে প্রায় ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশের বাজার নিয়ে তাদের আগ্রহ তাঁকে আশাবাদী করেছে।
তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে বাজারে স্বচ্ছতা, সুশাসন, জবাবদিহি ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর প্রত্যাশা, সংস্কার কার্যক্রম সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের পুঁজিবাজারে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।