রাঙামাটির সাজেকে সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের জেরে আবারও পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা এবং যান চলাচল বন্ধ থাকায় ভরা মৌসুমেও পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে জনপ্রিয় এই পর্যটনকেন্দ্র। এতে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি টাকার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি করেছেন পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। আগাম বুকিং বাতিল করে পর্যটকদের টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে কটেজ ও রিসোর্টমালিকদের।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সাজেক ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যান চলাচল স্বাভাবিক করার দাবিতে গতকাল শুক্রবার খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ করেছেন পর্যটন ব্যবসায়ী ও পরিবহন শ্রমিকেরা। অন্যদিকে সাজেকে অবরোধকারীদের ওপর হামলা, লাঠিপেটা এবং বাড়িঘর ও দোকান ভাঙচুরের প্রতিবাদে আজ শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে সকাল ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সড়ক ও নৌপথে আধাবেলা অবরোধের ডাক দিয়েছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ।
সাজেক কটেজ-রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সাজেকে প্রায় ১২০টি কটেজ ও রিসোর্ট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে তিন হাজারের বেশি পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা আছে। ভরা মৌসুমে অধিকাংশ কক্ষ আগাম বুকিং থাকে। পর্যটকদের যাতায়াত, রেস্তোরাঁ, খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহসহ বিভিন্ন ব্যবসাও পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শুধু রিসোর্টমালিকেরা নন, পরিবহন শ্রমিক ও স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জন বলেন, অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংকঋণ নিয়ে কটেজ ও রিসোর্ট গড়ে তুলেছেন। পর্যটন বন্ধ থাকায় তাঁদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে, অথচ ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে। এ খাতে বহু মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত থাকায় পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।
সাজেক হিলভিউ রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী ইন্দ্র চাকমা বলেন, ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁর রিসোর্টের সব কক্ষ আগাম বুকিং ছিল। অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে বুকিং বাতিল করে পর্যটকদের টাকা ফেরত দিতে হয়েছে। গত ১০ দিনে তাঁর চার লাখ টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সাজেক রুইলুই হলিডে রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী মিশু দে জানান, দুর্গাপূজার আগে থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁর রিসোর্টে শতভাগ কক্ষ বুকিং ছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবারের অবরোধ ও সংঘর্ষের পর শুক্রবার সকাল পর্যন্ত প্রায় ৬০ শতাংশ বুকিং বাতিল হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে অবশিষ্ট বুকিংও বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা বলেন, অনেক রিসোর্টের কক্ষ ২৫, ২৮ ও ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত বুকিং ছিল। অবরোধ ও সংঘর্ষের কারণে সেসব বুকিং বাতিল হচ্ছে। সেনাবাহিনীর সহায়তায় পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়ার পর সাজেক এখন পর্যটকশূন্য বলে জানান তিনি। এভাবে পর্যটকেরা আসতে না পারলে স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায় বড় ধস নামতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
অবরোধ ঘিরে সংঘর্ষ, সরিয়ে নেওয়া হয় তিন হাজার পর্যটক
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন গত ১১ অক্টোবর থেকে তিন দফা দাবিতে সাজেকের সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু করে। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে সাজেক থেকে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া, স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়িতে তল্লাশি বন্ধ এবং তাঁদের হুমকি দেওয়া থেকে বিরত থাকা।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর অবরোধ স্থগিত রাখা হলে প্রশাসন সাজেক ভ্রমণের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করে। এরপর পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হয় এবং বিভিন্ন রিসোর্টে আগাম বুকিং নেওয়া হয়। তবে দাবি পূরণ না হওয়ায় বৃহস্পতিবার থেকে আবারও অবরোধ শুরু হয়। শুক্রবার সকালেও সাজেক-বাঘাইহাট সড়কের ১০ ও ১৪ কিলোসহ বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ পালন করেন আন্দোলনকারীরা। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
বৃহস্পতিবার সাজেকে আটকে পড়া প্রায় তিন হাজার পর্যটককে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় খাগড়াছড়ির দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার গঙ্গারাম উজোবাজার এলাকায় অবরোধকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। পরে সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে পাল্টাপাল্টি গুলির ঘটনা ঘটে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সংঘর্ষে সেনাবাহিনীর পাঁচ সদস্য ও পুলিশের দুই সদস্য আহত হন। পুলিশের দাবি, গোলাগুলির ঘটনায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) জড়িত। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে সংগঠনটি।
অন্যদিকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব বিজয় কান্তি চাকমার অভিযোগ, বৃহস্পতিবারের ঘটনায় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে আটজন গুরুতর আহত। আহতদের চিকিৎসা নিতে কোথাও কোথাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাধা দিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংঘর্ষের পর গঙ্গারাম উজোবাজার এলাকার অনেক বাসিন্দা নিরাপত্তার আশঙ্কায় বাড়িঘর ছেড়ে চলে যান। শুক্রবারও এলাকার দোকানপাট বন্ধ ছিল এবং অনেকে বাড়িতে ফেরেননি। ফলে সেখানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।
সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন বলেন, অবরোধ অব্যাহত থাকায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে সাজেকের সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী ও পুলিশের অভিযান চলছে। বৃহস্পতিবারের ঘটনায় মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি
শুক্রবার বিকেলে খাগড়াছড়ি পৌরসভার শাপলা চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও পরিবহন শ্রমিকেরা। পার্বত্য যানবাহন সমিতির সভাপতি আইয়ূশ চাকমার সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তারা পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত সাজেক ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যান চলাচল স্বাভাবিক করার দাবি জানান। একই সঙ্গে পাহাড়ে চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা। দাবি পূরণে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা দিয়ে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেন বক্তারা।
এদিকে সাজেকে অবরোধকারীদের ওপর হামলা, লাঠিপেটা এবং বাড়িঘর ও দোকান ভাঙচুরের প্রতিবাদে আজ শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের কর্মসূচি দিয়েছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ। সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্মল চাকমার পাঠানো বিবৃতিতে এ কর্মসূচির কথা জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সাজেকবাসীর দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে এবং বৃহস্পতিবারের ঘটনার প্রতিবাদে এ কর্মসূচি পালন করা হবে। সংগঠনটির সভাপতি উষাতন চাকমা জানান, শনিবার ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অবরোধ চলবে। তবে অ্যাম্বুলেন্স ও রোগীবাহী গাড়ি, শববাহী যান, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন এবং সাংবাদিকদের বহনকারী গাড়ি অবরোধের আওতামুক্ত থাকবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অবরোধ ও সংঘর্ষের কারণে সাজেকের পর্যটন ব্যবসা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ নিরসন এবং সড়কে স্বাভাবিক চলাচল ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি বিরোধের স্থায়ী সমাধান না হলে পর্যটননির্ভর এলাকার ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।