তথ্য দিলে পুরস্কার ৭০ লাখ রুপি; নয়াদিল্লির দাবি, লোকদেখানো নয়, পাকিস্তানকে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ
জইশ-ই-মোহাম্মদের প্রধান মাসুদ আজহারের সন্ধান দিতে তথ্য দিলে ৭০ লাখ পাকিস্তানি রুপি পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এফআইএ) এ পুরস্কার ঘোষণা করেছে বলে জানা গেছে। তবে ইসলামাবাদের এ উদ্যোগকে ‘নাটক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে ভারত। নয়াদিল্লির বক্তব্য, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় পাকিস্তানকে লোকদেখানো ঘোষণা নয়, বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল পাকিস্তানের এই ঘোষণার সমালোচনা করেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
রণধীর জয়সওয়াল বলেন, এ ধরনের ‘নাটক’ এবং মানুষকে বোকা বানানোর চেষ্টা পাকিস্তানের জন্য নতুন নয়। অতীতেও একই ধরনের কর্মকাণ্ড দেখা গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, কোনো রাষ্ট্র যখন সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে অভিযুক্ত হয়, তখন এ ধরনের ঘোষণার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। পাকিস্তানকে লোকদেখানো ঘোষণা না দিয়ে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন ভারতের এই মুখপাত্র।
মাসুদ আজহার ভারতের কাছে দীর্ঘদিনের আলোচিত এক নাম। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, দেশটিতে সংঘটিত একাধিক বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জইশ-ই-মোহাম্মদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এসব হামলার মধ্যে ২০০১ সালে ভারতের সংসদে হামলা, ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলা, ২০১৬ সালের পাঠানকোট বিমানঘাঁটিতে হামলা এবং ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলার কথা উল্লেখ করে আসছে নয়াদিল্লি।
ভারতের অভিযোগ, পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে মাসুদ আজহারকে আশ্রয় ও সুরক্ষা দিয়ে আসছে। তবে ইসলামাবাদ এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। পাকিস্তানের দাবি, মাসুদ আজহার দেশটিতে নেই; তিনি আফগানিস্তানে পালিয়ে গিয়ে সেখান থেকে জইশ-ই-মোহাম্মদের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
মাসুদ আজহারকে নিয়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের মধ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে মতবিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে মাসুদ আজহার আফগানিস্তানে অবস্থান করছেন বলে দাবি করা হলেও আফগানিস্তানের কর্মকর্তারা এ দাবি অস্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে মাসুদের অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এদিকে পাকিস্তানের এফআইএর ‘রেড বুক’-এ মাসুদ আজহারকে এখনো মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তার সন্ধানে পুরস্কার ঘোষণাকে তাই দেশটির সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানের অংশ হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
তবে ভারতের পক্ষ থেকে এ উদ্যোগকে যথেষ্ট মনে করা হচ্ছে না। নয়াদিল্লির বক্তব্য, জঙ্গি সংগঠন ও তাদের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান এবং কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমেই পাকিস্তানকে তার অবস্থান প্রমাণ করতে হবে।
এ ঘোষণার সময়ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজর কেড়েছে। সামনে ফাইন্যানশিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের (এফএটিএফ) পরবর্তী পর্যালোচনা রয়েছে। সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও অর্থপাচার প্রতিরোধে পাকিস্তানের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়েছে, সেই বিষয়গুলোও আন্তর্জাতিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
পাকিস্তান ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এফএটিএফের ‘গ্রে লিস্ট’-এ ছিল। অর্থপাচার প্রতিরোধে দুর্বলতা এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন বন্ধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে দেশটিকে ওই তালিকায় রাখা হয়েছিল। বিশেষ করে জইশ-ই-মোহাম্মদ ও লস্কর-ই-তইবার মতো সন্ত্রাসী সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার বিষয়টি নিয়ে পাকিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ ছিল।
মাসুদ আজহারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। ফলে তাকে খুঁজে বের করতে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে পুরস্কার ঘোষণার বিষয়টি দেশটির সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার ভাবমূর্তি—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে ভারত বলছে, শুধু পুরস্কার ঘোষণা করলেই হবে না; মাসুদ আজহারসহ সন্ত্রাসী সংগঠনের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে পাকিস্তান বাস্তবে কী ব্যবস্থা নেয়, সেটিই হবে মূল বিষয়।