বিএসইসির সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবে উদ্যোগ; বেক্সিমকো ফার্মার নতুন পর্ষদে বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের চার প্রতিনিধি রাখার প্রস্তাব
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসসহ বেক্সিমকো গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের পর্ষদ থেকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে কোম্পানিটি। তবে তাঁর পদত্যাগ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং চূড়ান্ত সমঝোতা ও নিয়ন্ত্রকীয় প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই বিষয়টি কার্যকর হবে।
১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক নিয়ন্ত্রক-ঘোষণায় বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস বলেছে, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে সালমান এফ রহমানের পদত্যাগ চূড়ান্ত হয়েছে—এমন খবর প্রকাশের পর বিষয়টি পরিষ্কার করতে তারা এ ঘোষণা দিয়েছে। কোম্পানির ভাষ্য, বিএসইসির সঙ্গে চলমান দুইটি রিট মামলার সমঝোতার আলোচনার অংশ হিসেবেই সম্ভাব্য পর্ষদ পুনর্গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রেও কোম্পানির মনোনীত উপদেষ্টার যথাযথ যাচাই-বাছাই এবং লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেটের (এআইএম) বিধি মেনে চলতে হবে।
এর আগে ৩ সেপ্টেম্বরের এক চিঠিতে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস বিএসইসিকে জানিয়েছিল, প্রতিকূল পরিস্থিতি ও ব্যবসায়িক জটিলতার কারণে সালমান এফ রহমান কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। একই কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি (বেক্সিমকো), শাইনপুকুর সিরামিকস এবং বেক্সিমকো সিকিউরিটিজ লিমিটেডের পর্ষদ থেকেও তাঁর সরে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এ পরিবর্তনের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্ষদ পুনর্গঠনের পথ সহজ হবে।
বেক্সিমকো ফার্মার প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন পর্ষদে বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের মনোনীত চারজন পরিচালক, স্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইএফআইসি ব্যাংকের একজন পরিচালক, স্পনসরদের প্রতিনিধিত্বকারী তিনজন পরিচালক, করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড অনুযায়ী দুজন স্বতন্ত্র পরিচালক এবং একজন নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এসব নিয়োগ সংশ্লিষ্ট আইন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং অন্যান্য নীতিমালা পূরণের ওপর নির্ভর করবে।
বেক্সিমকো ফার্মা লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের এআইএমে তালিকাভুক্ত। ফলে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে এআইএমের নিয়মও মানতে হবে। কোম্পানি জানিয়েছে, নতুন পরিচালকদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় সাধারণত চার থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এরপর পর্ষদ পুনর্গঠন সম্পন্ন করতে আরও ছয় থেকে আট সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
সালমান এফ রহমান ১৯৭৬ সালে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস প্রতিষ্ঠায় যুক্ত ছিলেন এবং দীর্ঘদিন কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যান। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
বেক্সিমকো ফার্মার পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগের পেছনে কয়েকটি আইনি ও করপোরেট জটিলতা রয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিএসইসি কোম্পানিটির পর্ষদে নয়জন অতিরিক্ত স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের উদ্যোগ নেয়। বেক্সিমকো ফার্মা ওই নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিএসইসির দেওয়া পর্ষদ সভা আয়োজনের নির্দেশও আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছে কোম্পানিটি। এই দুই রিট এখনো হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন।
বিএসইসির নির্দেশনা ও পর্ষদ-সংক্রান্ত বিরোধের কারণে কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশেও জটিলতা তৈরি হয়েছিল। ২০২৫ সালের আর্থিক বছরের নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদনসহ কয়েকটি আর্থিক প্রতিবেদন সময়মতো প্রকাশ করা যায়নি। এর জেরে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের এআইএমে তালিকাভুক্ত বেক্সিমকো ফার্মার বৈশ্বিক ডিপোজিটরি রসিদ (জিডিআর) লেনদেনও স্থগিত হয়। এআইএমের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সিকিউরিটিজ টানা ছয় মাস লেনদেন বন্ধ থাকলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তালিকাভুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিএসইসি বেক্সিমকো ফার্মাকে পর্ষদ সভা করে আর্থিক প্রতিবেদন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। ওই নির্দেশও আদালতে চ্যালেঞ্জ করে কোম্পানিটি। আদালত বিষয়টি আগের রিটের সঙ্গে শুনানির জন্য নির্ধারণ করে। মার্চে কোম্পানিটি জানিয়েছিল, সংশ্লিষ্ট দুই রিটের শুনানি হাইকোর্টের অবকাশের পর শুরু হওয়ার কথা।
এদিকে বিএসইসির মুখপাত্র মো. আবুল কালাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছেন, বেক্সিমকো ফার্মার কাছ থেকে পর্ষদ পুনর্গঠনসংক্রান্ত চিঠি তারা পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য কোম্পানি তার স্মারক, সংঘবিধি ও কোম্পানি আইন অনুযায়ী পর্ষদ পুনর্গঠন করতে পারে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএসইসি দেখবে, কোম্পানিটি করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড মেনে চলছে কি না। এর মধ্যে স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার বিধানও রয়েছে।
বেক্সিমকো ফার্মার ১৫ সেপ্টেম্বরের ঘোষণায় অবশ্য একটি বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছে—সালমান এফ রহমানের পদত্যাগ কিংবা প্রস্তাবিত নতুন পরিচালকদের নিয়োগ এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। বিএসইসি ও কোম্পানির মধ্যে সমঝোতা, প্রযোজ্য অনুমোদন এবং এআইএমের বিধি অনুযায়ী যাচাই-বাছাই শেষ হওয়ার পরই এসব পরিবর্তন কার্যকর হতে পারে।
সালমান এফ রহমানের বিষয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার আগের সিদ্ধান্তও রয়েছে। ২০২৫ সালে বিএসইসি তাঁকে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করে। ‘আইএফআইসি আমার বন্ড’ নামে পরিচিত বন্ডে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং তাঁকে ১০০ কোটি টাকা জরিমানাও করা হয়েছিল। বিএসইসির আদেশে তাঁকে পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কোনো পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে বেক্সিমকো ফার্মার ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত পর্ষদ পুনর্গঠন শুধু একজন পরিচালকের সরে যাওয়ার বিষয় নয়; এর সঙ্গে বিএসইসির নিয়োগ করা স্বতন্ত্র পরিচালক, কোম্পানির করা দুটি রিট, আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং লন্ডনের এআইএমে কোম্পানিটির তালিকাভুক্তির ধারাবাহিকতা—সবগুলো বিষয়ই যুক্ত রয়েছে। ফলে প্রস্তাবিত পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে কোম্পানিটির পরিচালনা কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে সেটি নির্ভর করছে বিএসইসি ও কোম্পানির চূড়ান্ত সমঝোতা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রকীয় প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার ওপর।