- নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধিত্বের দাবি; ‘অবহেলা দূর করা ন্যায়বিচার ও জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জোরালো করার আহ্বান জানিয়েছেন সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান। নিউইয়র্কে সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, আফ্রিকাকে আলোচনার টেবিলে থাকতে হবে, মেন্যুতে নয়।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সদরদপ্তরে সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য দেন খলিলুর রহমান। নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, পরিষদকে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, আরও প্রতিনিধিত্বশীল ও স্বচ্ছ করতে হবে। অনগ্রসর ও কম প্রতিনিধিত্ব পাওয়া অঞ্চলগুলোর ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
খলিলুর রহমান বলেন, আট দশক পরও সদস্যরাষ্ট্রের সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় অঞ্চল এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার আফ্রিকা নিরাপত্তা পরিষদে যথাযথ প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত। তাঁর ভাষায়, ‘আফ্রিকাকে আলোচনার টেবিলে থাকতে হবে, মেন্যুতে নয়।’
তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা পরিষদে নিজেদের ন্যায্য জায়গা পাওয়ার জন্য আফ্রিকাকে অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করতে বলা যায় না। আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি এখনই দূর করা ন্যায়বিচার ও ন্যায্যতার প্রশ্ন; একই সঙ্গে এটি জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময় নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া ও ফ্রান্সকে রাখা হয়। বর্তমানে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদে এই পাঁচ দেশ স্থায়ী সদস্য এবং তাদের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। বাকি ১০ সদস্য নির্দিষ্ট মেয়াদে নির্বাচিত হন। আফ্রিকার কোনো দেশ এখনো স্থায়ী সদস্যের মর্যাদা পায়নি।
জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে আফ্রিকার ৫৪টি দেশ রয়েছে। বর্তমানে আফ্রিকা থেকে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, লাইবেরিয়া ও সোমালিয়া নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। তবে স্থায়ী সদস্যের পাঁচটি আসনের কোনোটিতেই আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব নেই।
নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের দাবি দীর্ঘদিনের। আফ্রিকান ইউনিয়নও পরিষদে মহাদেশটির স্থায়ী ও অস্থায়ী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। আফ্রিকার পূর্ণ, স্থায়ী ও ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি ২৪ সেপ্টেম্বর আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশনের চেয়ারম্যান মাহমুদ আলী ইউসুফ এবং খলিলুর রহমানের বৈঠকেও পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
সাধারণ পরিষদের সভাপতি তাঁর বক্তব্যে নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের চলমান আন্তঃসরকারি আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার প্রতিও সমর্থন জানান। তাঁর মতে, পরিষদকে এমনভাবে সংস্কার করতে হবে, যাতে তা বর্তমান বিশ্বের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে আরও ভালোভাবে প্রতিফলিত করে।
খলিলুর রহমানের বক্তব্যে নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকারিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদ যখন কার্যকরভাবে কাজ করে, তখন জাতিসংঘও কার্যকর বলে মানুষের কাছে প্রতীয়মান হয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিষদ সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে পুরো জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমানের মেয়াদ শুরু হয়েছে চলতি সেপ্টেম্বর থেকে। তিনি ২ জুন ২০২৬ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এ অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য—‘আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ’।
আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বের প্রসঙ্গটি তাঁর বক্তব্যে জাতিসংঘ সংস্কারের বৃহত্তর প্রশ্নের অংশ হিসেবে এসেছে। খলিলুর রহমান বলেন, বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবর্তিত বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার স্থায়ী আসনের দাবি নিয়ে আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। তবে সাধারণ পরিষদের বর্তমান সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমানের উদ্বোধনী বক্তব্যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরায় চলমান নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার আলোচনায় আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব আবারও গুরুত্ব পেল।