ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে টানা বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ, শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের আন্দোলন এবং পুলিশের ভূমিকা ঘিরে রোববারও উত্তপ্ত ছিল রাজধানী। এর মধ্যে বিক্ষোভ চলাকালে তিন নারী সাংবাদিকের সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের যৌন হয়রানির অভিযোগ নতুন করে পরিস্থিতি জটিল করেছে। অভিযোগগুলো তদন্তের জন্য ক্রাইম ব্রাঞ্চে পাঠিয়েছে দিল্লি পুলিশ।
রোববার যন্তর মন্তরমুখী দুটি কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল। একটি নাগরিক সমাজের উদ্যোগে, অন্যটি কংগ্রেসের যুব সংগঠন যুব কংগ্রেসের। কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয় এবং বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড বসানো হয়।
এর আগে শনিবার যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের সময় তিন নারী সাংবাদিক পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন। তাঁদের অভিযোগের মধ্যে দিল্লি পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসিপি) বিবেক ভগতের নামও এসেছে। অভিযোগকারীদের একজন জানান, বিক্ষোভস্থলে পুলিশের আটক অভিযান ধারণ করার সময় তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। পরে অভিযোগ জানাতে তাঁরা থানায় যান।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, ৩ অক্টোবরের বিক্ষোভের সময় তিন নারী সাংবাদিক পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন। তাঁদের অভিযোগ গ্রহণ করে ক্রাইম ব্রাঞ্চে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য ভিডিও যাচাই করে তদন্ত করা হচ্ছে।
এদিকে অভিযোগের পর পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবাদ শুরু করে। পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার সামনে অবস্থান নেয় ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও বামপন্থী কর্মীদের একটি অংশ। সিপিএম নেত্রী বৃন্দা কারাটসহ কয়েকজন অভিযোগের তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তবে পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগগুলো ইতিমধ্যে তদন্তের জন্য ক্রাইম ব্রাঞ্চে পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতেও বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। আম আদমি পার্টি, আইসা, এনএসইউআইসহ বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীরা কর্মসূচিতে অংশ নেন। কয়েকজনকে পুলিশ আটক করে। শুক্রবার ও শনিবারের কর্মসূচিতেও ব্যাপকসংখ্যক বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছিল।
জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে এসআইআর। *ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস*-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। এসব আপত্তির মধ্যে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া, নতুন ভোটার যুক্ত করা এবং নির্বাচন কমিশনের তথ্যভান্ডার ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় ছিল। তবে নির্বাচন কমিশনের সূত্রের বক্তব্য, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর কমিশনের সিদ্ধান্তগুলো সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছে।
বিতর্কের মধ্যে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে কেরালায় ২০০৬ সালের একটি পুরোনো মামলার তদন্তও নতুন করে শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সে সময় তিনি রাজ্যের জনপথ বিভাগের সচিব ছিলেন। কেরালা সরকারের নির্দেশে ভিজিল্যান্স অ্যান্ড অ্যান্টি-করাপশন ব্যুরো ওই সময়ের একটি সড়ক প্রকল্প-সংক্রান্ত অভিযোগ ও মালয়েশীয় প্রকৌশলী লি সি বিনের আত্মহত্যার ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয় তদন্ত করবে। এটি একটি অভিযোগভিত্তিক পুরোনো মামলা; তদন্তের ফল এখনো জানা যায়নি।
দিল্লির পাশাপাশি মুম্বাইয়েও জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বড় কর্মসূচি হয়েছে। শিবসেনা (ইউবিটি) নেতা উদ্ধব ঠাকরে ও মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনার রাজ ঠাকরে যৌথ মিছিলে অংশ নিয়ে এসআইআর বাতিলের দাবি জানান। তাঁদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশন অবশ্য এসআইআরকে ভোটার তালিকা পরিশুদ্ধ করার প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে এবং অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এদিকে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও বিস্তৃত করার ঘোষণা দিয়েছে সিজেপি। দলটি জানিয়েছে, দাবি পূরণ না হলে ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে আবারও কর্মসূচি পালন করা হবে। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি পুলিশি আচরণ ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নও এখন আন্দোলনের অন্যতম আলোচ্য হয়ে উঠেছে।