‘ভোটচুরি’ ও ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে দিনভর বিক্ষোভ করেছে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। মঙ্গলবার সংসদ ভবন থেকে নির্বাচন সদনের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার পথে পুলিশ বাধা দিলে আকাশবাণী ভবনের কাছে অবস্থান নেন বিরোধী দলের সাংসদেরা। প্রায় আট ঘণ্টা অবস্থানের পর রাতে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ কয়েকজন বিরোধী নেতাকে আটক করে পুলিশ। পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
এদিকে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবি এবার রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ‘ইন্ডিয়া’। বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতারা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চেয়ে আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে।
মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে সংসদের মকরদ্বার থেকে নির্বাচন সদনের উদ্দেশে মিছিল শুরু করেন বিরোধী সাংসদেরা। রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে, তৃণমূল কংগ্রেসের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, মহুয়া মৈত্র, ডেরেক ও’ব্রায়েন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব, সুপ্রিয়া সুলেসহ বিভিন্ন দলের নেতারা এতে অংশ নেন।
নির্বাচন সদনের কাছাকাছি নীতি আয়োগের দপ্তরের সামনে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে মিছিল আটকে দেয়। এরপর সেখানেই অবস্থানে বসেন বিরোধী সাংসদেরা। পরে রাহুল গান্ধী আকাশবাণী ভবনের চত্বর দিয়ে নির্বাচন সদনের দিকে এগোনোর চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁকেও আটকে দেয়। একপর্যায়ে প্রিয়াঙ্কাসহ অন্য নেতারাও সেখানে অবস্থান নেন।
দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন, বিরোধী দলের প্রায় ৩০০ সাংসদ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর প্রশ্ন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচন কমিশনের দপ্তরের এত কাছে অবস্থান করেও কেন কমিশনের সঙ্গে দেখা করতে পারছেন না।
বিরোধী নেতাদের অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলছে। তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্য হলো মৃত, দ্বৈত বা অযোগ্য ভোটারের নাম বাদ দিয়ে তালিকা হালনাগাদ করা।
মঙ্গলবারের কর্মসূচিকে ঘিরে কমিশনের সঙ্গে বিরোধীদের যোগাযোগ নিয়েও দুই পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য দেখা যায়। নির্বাচন কমিশনের দাবি, বিকেল ৪টা পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল বা অনুমোদিত প্রতিনিধি আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশনের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চাননি। পরে দিল্লি পুলিশ কমিশনকে জানায়, রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে একটি দল কমিশনের সঙ্গে দেখা করতে এবং স্মারকলিপি দিতে চায়।
কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আগে থেকে নির্ধারিত পদ্ধতি রয়েছে। বিরোধী পক্ষ বড়সংখ্যক সাংসদকে নিয়ে সংসদ ভবনের অ্যানেক্সে বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছিল। কমিশন জানায়, তারা সংসদ ভবনে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে পাঠিয়ে স্মারকলিপি গ্রহণের বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছিল।
অন্যদিকে, বিরোধী নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন, কয়েক শ সাংসদ একসঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলে কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তারা তাঁদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করছেন না কেন। কংগ্রেস সভাপতি খড়্গে অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন সরকারের প্রভাবাধীন হয়ে পড়েছে। তৃণমূল নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। এসব অভিযোগ অবশ্য বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক বক্তব্য; নির্বাচন কমিশন অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এদিকে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিতর্কের মধ্যে সোমবার সুপ্রিম কোর্টে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ আসে। ভোটার নিবন্ধনের ফর্ম-৬-এ পরিবর্তন নিয়ে শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ জানায়, পরিবর্তিত ফর্ম-৬ অনুমোদনের দাবি আদালত করেনি। পরিবর্তনটি কার অনুমোদনে করা হয়েছিল, সে বিষয়ে কমিশনের কাছে তথ্য চেয়েছে আদালত। একই সঙ্গে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যও জানতে চাওয়া হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটেই মঙ্গলবারের আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ‘ইন্ডিয়া’। বিরোধী জোটের নেতারা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তাঁদের অভিযোগ তুলে ধরতে চান। রাষ্ট্রপতির কাছে সাক্ষাতের সময় চেয়ে রাহুল গান্ধী, খড়্গেসহ বিরোধী নেতারা আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে।
মঙ্গলবারের আন্দোলন শেষ হয়নি পুলিশি আটকের মধ্য দিয়ে। রাতে প্রায় আট ঘণ্টার অবস্থানের পর রাহুল ও প্রিয়াঙ্কাসহ কয়েকজন নেতাকে পুলিশ আটক করে। তাঁদের পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার পর পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। রাহুল ও প্রিয়াঙ্কার আটকের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও গুরুত্ব পেয়েছে।
এদিকে বুধবারও নির্বাচন সদনমুখী বিক্ষোভ ও ঘেরাও কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে ‘ইন্ডিয়া’। শুধু দিল্লি নয়, দেশের বিভিন্ন রাজ্যেও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ কর্মসূচি চালানোর কথা জানিয়েছে বিরোধী দলগুলো। ফলে জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত ও ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে আইনি বিতর্কও আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।