বিদায়ের মুহূর্তও কখনো কখনো হয়ে ওঠে নতুন এক স্মৃতির শুরু। আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবার মাঠে নামার আগে লিওনেল মেসিও পেলেন তেমনই এক আবেগঘন স্বীকৃতি। বেনিনের বিপক্ষে বিদায়ী ম্যাচের কিছুক্ষণ আগে দেশটির ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রিভার প্লেট তাঁকে সম্মানসূচক সদস্যপদ দিয়েছে।
মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে রিভার প্লেটের প্রেসিডেন্ট স্তেফানো দি কার্লোর হাত থেকে বিশেষ সদস্যপদের কার্ড, স্মারক ও একটি জার্সি নেন মেসি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশ করে আর্জেন্টাইন অধিনায়ককে ধন্যবাদ জানায় ক্লাবটি।
কার্ডটিই অবশ্য এই আয়োজনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ। প্রচলিত সদস্য নম্বরের বদলে সেখানে লেখা হয়েছে ‘এআরজি ১৮১২২০২২’। এটি ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বরের স্মারক—কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে ফ্রান্সকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা যেদিন বিশ্বকাপ জিতেছিল। সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন মেসি। তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত ট্রফি জয়ের দিনটিকেই এবার রিভার প্লেট জায়গা দিল বিশেষ পরিচয়ে।
আর্জেন্টিনায় মেসির বিদায়কে ঘিরে আয়োজনও কম নয়। বুয়েনস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে দিয়েছে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি। রিভার প্লেটের স্বীকৃতিটি আলাদা হয়ে উঠেছে ক্লাবটির সঙ্গে মেসির পুরোনো সম্পর্কের কারণে।
২০০০ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে রিভার প্লেটে যোগ দেওয়ার খুব কাছাকাছি ছিলেন মেসি। শেষ পর্যন্ত চুক্তি হয়নি; তিনি পাড়ি জমান স্পেনে এবং যোগ দেন বার্সেলোনার একাডেমি লা মাসিয়ায়। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর বিশ্বজয়ী ফুটবলযাত্রা। তবে রিভার প্লেটের সঙ্গে সেই অপূর্ণ যোগাযোগ হারিয়ে যায়নি।
এর প্রমাণ মিলেছিল ২০১৫ সালের ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালে। ইয়োকোহামায় বার্সেলোনার বিপক্ষে খেলেছিল রিভার প্লেট। ৩–০ ব্যবধানে জেতা ম্যাচে একটি গোল করেছিলেন মেসি। কিন্তু সাবেক স্বদেশি ক্লাবের বিপক্ষে গোল করেও তা উদযাপন করেননি তিনি। প্রতিপক্ষ সমর্থকদের প্রতি সম্মান জানিয়ে ছিলেন নীরব।
রিভার প্লেটের ঘরের মাঠ মনুমেন্তালের সঙ্গেও মেসির রয়েছে সমৃদ্ধ স্মৃতি। জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ বাছাই ও প্রীতি ম্যাচসহ এখানে ২৮টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। কোনো ম্যাচেই হারেননি; গোল করেছেন ১৯টি। আর্জেন্টিনার হয়ে জেতা শিরোপাগুলোর আনন্দও এই মাঠে সমর্থকদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন তিনি।
এবার সেই মনুমেন্তালেই বিদায়ের আগে সম্মান পেলেন মেসি। যে ক্লাবের জার্সি কখনো পরা হয়নি, সেই ক্লাবই তাঁকে নিজেদের সম্মানসূচক সদস্য করে নিল। ফুটবলের হিসাব-নিকাশের বাইরে এ স্বীকৃতি তাই হয়ে উঠল সম্পর্কের এক সুন্দর প্রতীক।
মেসির আর্জেন্টিনা-অধ্যায়ও কম নাটকীয় নয়। দীর্ঘ অপেক্ষা, বড় ম্যাচে হতাশা, সমালোচনা—সব পেরিয়ে ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা, পরের বছর ফিনালিসিমা এবং ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জিতে পূর্ণতা দেন জাতীয় দলের ক্যারিয়ারকে। এরপর থেকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর প্রতিটি ম্যাচই হয়ে উঠেছে ইতিহাসের অংশ।
বিদায়ের আগে রিভার প্লেটের দেওয়া কার্ডে সেই ইতিহাসেরই একটি দিন বন্দী। ‘এআরজি ১৮১২২০২২’—চারটি সংখ্যা, অথচ তার ভেতরে একটি পুরো ফুটবল-গল্প। এক কিশোরের স্বপ্ন, এক মহাতারকার উত্থান এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ হাতে দেশের হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার গল্প।
মেসির জন্য হয়তো এটাই সবচেয়ে সুন্দর বিদায়—ট্রফি হাতে নয়, প্রিয় মানুষের ভালোবাসা সঙ্গে নিয়ে।