ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ‘অবৈধভাবে’ বসবাসের অভিযোগে অন্তত ১৫০ বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করে দেশে ফেরত পাঠানোর দাবি করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট। সোমবার আটক করার পর ভারতীয় বিমান বাহিনীর বিশেষ বিমানে তাঁদের পশ্চিমবঙ্গের বাগডোগরা বিমানবন্দরে নেওয়া হয়। পরে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
কাশ্মীর থেকে বাংলাদেশিদের বড় পরিসরে ফেরত পাঠানোর এটিই প্রথম প্রকাশ্যে নথিভুক্ত ঘটনা বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁদের ঠিক কোন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে, সে বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের সরকারি নথি অনুযায়ী জম্মু ও কাশ্মীরে বর্তমানে ৫০৪ জন বাংলাদেশি নাগরিকের অবস্থানের তথ্য রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৪৬ জন জম্মুতে এবং ৪৫৮ জন কাশ্মীর উপত্যকায় রয়েছেন। ফেরত পাঠানো ১৫০ জন ওই তালিকার অন্তর্ভুক্ত বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
কাশ্মীর পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের নিবন্ধনের সময় তাঁদের আধার কার্ড জমা দিতে বলা হয়েছিল। যাচাইয়ের সময় কারও আধার কার্ডের তথ্যের সঙ্গে অসঙ্গতি পাওয়া গেলে বিষয়টি বাংলাদেশে পাঠিয়ে জাতীয়তা যাচাই করা হয়। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভারতের ফরেনার্স অ্যাক্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে ওই কর্মকর্তা দাবি করেন।
ওই পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, আটক ব্যক্তিদের প্রথমে ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে পশ্চিমবঙ্গে নেওয়া হয়। এরপর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাঁদের পাহারা দিয়ে সীমান্ত পার করে দেয়। তবে মালদা নাকি বাগডোগরা—কোন রুট ব্যবহার করে তাঁদের বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে, তা তিনি নিশ্চিত করেননি।
বাগডোগরা পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমার গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর এলাকা। অন্যদিকে মালদা বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী সীমান্তের কাছাকাছি। ফলে কোন সীমান্ত দিয়ে কথিত ফেরত পাঠানোর ঘটনা ঘটেছে, সেটি নিশ্চিত হওয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে জম্মু ও কাশ্মীর সীমান্তে সম্ভাব্য ‘পুশইন’ ঠেকাতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি)। পঞ্চগড়ের ১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ মো. কায়েস বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁরা বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর খবর পেয়েছেন। পুশইন যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে সীমান্তে আগে থেকেই সতর্কতা রয়েছে। খবর পাওয়ার পর সতর্কতা আরও বাড়ানো হয়েছে।
তিনি জানান, সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি টহলও বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা নিয়ে বিজিবি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে।
দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, জম্মু ও কাশ্মীরে জনমিতিক পরিবর্তন ঠেকানোর বিষয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটির পরিদর্শনের কয়েক মাসের মধ্যে এই ফেরত পাঠানোর ঘটনা ঘটেছে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি প্রকাশ প্রভাকর নাভালকারের নেতৃত্বাধীন ওই কমিটি জম্মু ও কাশ্মীরে বাংলাদেশি নাগরিকদের উপস্থিতি নিয়েও তথ্য সংগ্রহ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই কমিটির নথিতে জম্মু ও কাশ্মীরে ৫০৪ জন বাংলাদেশি নাগরিকের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে ৪৬ জন জম্মুতে এবং ৪৫৮ জন কাশ্মীরে অবস্থান করছিলেন।
এদিকে জম্মু ও কাশ্মীর প্রশাসন আরও একটি দলকে ৭ অক্টোবর ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে ওই দলের সদস্যসংখ্যা, তাঁদের জাতীয়তা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কিংবা বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সম্ভাব্য সীমান্ত সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
কাশ্মীর থেকে ফেরত পাঠানোর দাবিটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ভারতজুড়ে অবৈধ অভিবাসন ও বিদেশি নাগরিকদের শনাক্তকরণ নিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে প্রশাসনিক তৎপরতা চলছে। বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে কাউকে শনাক্ত করে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে জাতীয়তা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সম্মতি বা সীমান্ত কর্তৃপক্ষের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে কাশ্মীর থেকে কথিত ১৫০ জনকে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও সীমান্তের সুনির্দিষ্ট তথ্যও নজরে থাকবে।
বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ইতিমধ্যে সম্ভাব্য পুশইন ঠেকাতে নজরদারি ও টহল বাড়ানোর কথা জানিয়েছে। ফলে পরবর্তী সময়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আরও কোনো দলকে ফেরত পাঠানো হলে তা কোন প্রক্রিয়ায় এবং কোন সীমান্ত দিয়ে হচ্ছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।