ব্যাট হাতে মাহফিজুল-আকবর, বল হাতে নাঈমের উজ্জ্বলতা
জাতীয় ক্রিকেট লিগের প্রথম রাউন্ডের শেষ দিনটা শেষ হলো প্রত্যাশিতভাবেই—তিন ম্যাচের তিনটিই ড্র। তবে ফলের খাতায় জয়-পরাজয় না থাকলেও শেষ দিনে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের কমতি ছিল না। সিলেটে ময়মনসিংহকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখলেন মাহফিজুল ইসলাম রবিনের সেঞ্চুরি, রংপুরে পরাজয়ের মুখ থেকে দলকে টেনে তুললেন অধিনায়ক আকবর আলী, আর সিলেটের অফস্পিনার নাঈম আহমেদ পাঁচ উইকেট নিয়ে শেষ পর্যন্ত জয়ের দরজা খোলার চেষ্টা করেছিলেন। চট্টগ্রামে সাব্বির রহমানের ফিফটিও রাজশাহীকে নিরাপদে নিয়ে যায়।
তিন ম্যাচের ফল আলাদা না হলেও প্রতিটির গল্প ছিল ভিন্ন। কোথাও ব্যাটসম্যানের ধৈর্য ড্র নিশ্চিত করেছে, কোথাও অধিনায়কের প্রতিরোধ ম্যাচের গতিপথ বদলেছে, আবার কোথাও বোলারের দুর্দান্ত স্পেল শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট হয়ে ওঠেনি।
মাহফিজুলের সেঞ্চুরিতে বাঁচল ময়মনসিংহ
সিলেটে ময়মনসিংহের জন্য শেষ দিনের সবচেয়ে বড় স্বস্তির নাম মাহফিজুল ইসলাম রবিন। আগের দিন ৮৬ রানে অপরাজিত থাকা ওপেনার দিনের শুরুতেই তিন অঙ্ক ছুঁয়ে ফেলেন। তবে সেঞ্চুরির পর আর ইনিংস লম্বা করতে পারেননি। নাঈম আহমেদের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন তিনি। তার আগেই অবশ্য ময়মনসিংহের জন্য প্রয়োজনীয় কাজটি করে ফেলেছিলেন মাহফিজুল। প্রথম ইনিংসে ৭০ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে সেঞ্চুরি—দুই ইনিংস মিলিয়ে ম্যাচে তাঁর ব্যাটিং ছিল সবচেয়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সগুলোর একটি। শেষ পর্যন্ত ম্যাচসেরার পুরস্কারও ওঠে তাঁর হাতে। হফিজুলের বিদায়ের পর আরিফুল ইসলাম ৭২ এবং আব্দুল মজিদ ৮৭ রানের ইনিংস খেলেন। তাঁদের ব্যাটে ভর করে ৬ উইকেটে ৩২৭ রান তুলে নেয় ময়মনসিংহ। তখন ম্যাচের ফল নিয়ে অনিশ্চয়তা আর ছিল না। দুই দল সম্মত হয়ে ড্র মেনে নেয়।
তবে ময়মনসিংহের ব্যাটিংয়ের স্বস্তির মধ্যেই সিলেটের নাঈম আহমেদের পারফরম্যান্সও আলাদা করে নজর কাড়ে। ১১৯ রান দিয়ে পাঁচ উইকেট নিয়ে তিনি ম্যাচে সিলেটের জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু বড় লক্ষ্য এবং হাতে থাকা সময়ের সীমাবদ্ধতায় সেই বোলিং শেষ পর্যন্ত ম্যাচ জেতানোর মতো হয়ে ওঠেনি।
আকবরের ব্যাটে রংপুরের বাঁচা
রংপুর-ঢাকা ম্যাচের গল্পটা আরও নাটকীয়। চতুর্থ দিনের শুরুতে মাত্র ৬ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ব্যাটিংয়ে নামে রংপুর। ম্যাচের পরিস্থিতি এমন ছিল যে দ্রুত উইকেট পড়লে জয় ঢাকার দিকে চলে যেতে পারত।
সেই চাপের মুহূর্তে অধিনায়ক আকবর আলী দায়িত্ব নেন। গত মৌসুমে রংপুরকে শিরোপা জেতানো এই ব্যাটসম্যান এবারও দেখালেন কেন দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারদের একজন। ১৩২ বলে ৫ চার ও এক ছক্কায় ৬৪ রানের দৃঢ় ইনিংস খেলেন তিনি। তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল ঝুঁকি কমিয়ে সময়কে কাজে লাগানোর চেষ্টা—যেটি এই ম্যাচের পরিস্থিতিতে রংপুরের জন্য ছিল সবচেয়ে প্রয়োজনীয়।
আকবরের সঙ্গে চৌধুরী মোহাম্মদ রিজওয়ান ২৭ এবং মেহেদী হাসান ১৩ রান করেন। শেষ পর্যন্ত রংপুরের দ্বিতীয় ইনিংস থামে ১৪৯ রানে। তাতে ঢাকার সামনে জয়ের জন্য লিড দাঁড়ায় ২০৫ রান।
ঢাকার হয়ে আরিফ আহমেদ আবারও কার্যকর ছিলেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৫ রানে ৩ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি প্রথম ইনিংসেও চার উইকেট পেয়েছিলেন তিনি। অর্থাৎ ম্যাচের দুই ইনিংসেই ঢাকার বোলিং আক্রমণে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু শেষ বিকেলে জয়ের জন্য নেমে সময়ই পেল না ঢাকা। মাত্র ৪.১ ওভার ব্যাট করে ৯ রান তোলার পর দুই দল ড্র মেনে নেয়। নাঈম শেখ ৭ ও আনিসুল ইসলাম ২ রানে অপরাজিত ছিলেন।
রংপুরের জন্য তাই ড্র-ও অনেকটা জয়ের সমান স্বস্তির। কারণ দিনের শুরুতে ৬ রানে ৩ উইকেট থেকে ম্যাচ বাঁচানোর যে সমীকরণ ছিল, আকবরের ইনিংস সেটিই বদলে দিয়েছে।
সাব্বিরের ফিফটিতে নিরাপদ রাজশাহী
চট্টগ্রামে রাজশাহীও শেষ দিনে মূলত ম্যাচ বাঁচানোর ক্রিকেট খেলেছে। চট্টগ্রামের বিপক্ষে দ্বিতীয় ইনিংসে ৮ উইকেট হারিয়ে ২২৪ রান তুলে নেয় তারা। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান সাব্বির রহমান রুম্মানের।
১১২ বলে দুই বাউন্ডারিতে ৫১ রান করেন সাব্বির। তাঁর ইনিংসটি ছিল বড় শটের চেয়ে উইকেটে টিকে থেকে ম্যাচকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়ার। তাঁকে সহায়তা করেন নাঈম আহমেদ ৪৭, প্রীতম কুমার ৩৭ এবং শাকির হোসেন ২৭ রান করে।
প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা মাহমুদুল হাসান জয় ম্যাচসেরার পুরস্কার পেলেও দ্বিতীয় ইনিংসে রাজশাহীর ব্যাটারদের সম্মিলিত প্রতিরোধই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ফল নির্ধারণ করেছে। ৮ উইকেটে ২২৪ রান করার পর দুই দল ড্র মেনে নেয়।
তিন ড্র, কিন্তু গল্প তিন রকম
প্রথম রাউন্ডের শেষ দিনে তিনটি ম্যাচেই জয়-পরাজয় হয়নি। কিন্তু তিন ম্যাচের দিকে তাকালে ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ম্যাচ বাঁচানোর ক্রিকেটের গুরুত্বও স্পষ্ট হয়।
সিলেটে মাহফিজুলের সেঞ্চুরি ময়মনসিংহকে নিরাপদ করেছে, যদিও নাঈম আহমেদের পাঁচ উইকেট সিলেটকে শেষ পর্যন্ত চাপ তৈরি করার সুযোগ দিয়েছিল। রংপুরে আকবরের ৬৪ রানের ইনিংস ছিল কার্যত পরাজয় ঠেকানোর দেয়াল। আর চট্টগ্রামে সাব্বিরসহ রাজশাহীর ব্যাটাররা সময় ও উইকেটকে কাজে লাগিয়ে ম্যাচকে ড্রয়ের দিকে নিয়ে গেছেন।
প্রথম রাউন্ডের শেষ দিনে তাই জয় না থাকলেও ব্যাট-বলের ব্যক্তিগত লড়াই ছিল যথেষ্ট। মাহফিজুলের সেঞ্চুরি, আকবরের দায়িত্বশীল ফিফটি এবং নাঈমের ফাইফার—তিনটি পারফরম্যান্সই দেখিয়ে দিয়েছে, ফলাফল ড্র হলেও ম্যাচের ভেতরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোটেই নিষ্প্রভ ছিল না।