লিওনেল মেসির বিদায়কে ঘিরে ফুটবল দুনিয়ায় আবেগের ঢেউ। রোনালদিনিও, নেইমার, লুইস সুয়ারেস থেকে শুরু করে বর্তমান ও সাবেক অসংখ্য তারকা আর্জেন্টাইন মহাতারকাকে জানিয়েছেন শ্রদ্ধা ও শুভকামনা। তবু যেন কোথাও একটা অপেক্ষা ছিল—এই মানুষটির কাছ থেকে কী বার্তা আসে, সেটিই দেখার ছিল। তিনি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যার নাম মেসির সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে একই নিঃশ্বাসে, সেই পর্তুগিজ মহাতারকাও এবার বিদায়বেলায় ‘আলিঙ্গন’ জানালেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে।
বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২১ বছরের পথচলার ইতি টেনেছেন মেসি। বিদায়ী ম্যাচটিও রাঙিয়েছেন গোল ও অ্যাসিস্টে। মাঠে তাঁর পারফরম্যান্সের সঙ্গে ছিল আবেগঘন বিদায় আয়োজন। সতীর্থ, সমর্থক ও সতীর্থ-সাবেকদের ভালোবাসায় ভেসেছেন ৩৯ বছর বয়সী এই ফুটবলার।
আর্জেন্টিনার দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জেতানো এবং পরের বছর বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি এনে দেওয়া মেসি হয়ে উঠেছেন দেশটির ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় নায়ক। ২৮ বছরের শিরোপাখরা কাটিয়ে কোপা আমেরিকা জয় এবং ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে তিনি আর্জেন্টাইন ফুটবলের সোনালি অধ্যায়কে নতুন করে লিখেছেন। তাই তাঁর বিদায় শুধু একটি ম্যাচের সমাপ্তি নয়, একটি যুগেরও সমাপ্তির প্রতীক।
এমন আবেগঘন মুহূর্তেই রোনালদোর কাছ থেকে এলো বিশেষ বার্তা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেসির বিদায়ী পোস্টে মন্তব্য করে পর্তুগিজ তারকা লিখেছেন, ‘লিও, এতগুলো বছর ধরে নিজের দেশের হয়ে লড়েছ এবং এমন এক ইতিহাস তৈরি করেছ, যা চিরকাল রয়ে যাবে। আর্জেন্টিনার হয়ে তুমি যা অর্জন করেছ, তার জন্য আমার পূর্ণ শ্রদ্ধা। তোমার জন্য আলিঙ্গন।’
মেসির বিদায়ের আগে অবশ্য রোনালদো নিজেই ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে। পর্তুগাল জাতীয় দলের কোচ জর্জে জেজুসের সঙ্গে টানাপোড়েনের জেরে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা। মেসির বিদায়ী ম্যাচের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ এক বার্তায় নিজের অবস্থানও তুলে ধরেছেন পর্তুগিজ তারকা।
ব্যক্তিগত সংকটের সেই সময়েও মেসির বিদায় তাঁকে স্পর্শ করেছে। শুধু এবারই নয়, কিছুদিন আগে মেসির বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর পরও রোনালদো সহমর্মিতা জানিয়েছিলেন। দুই মহাতারকার দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে এমন মানবিক মুহূর্তগুলোও ফুটবলপ্রেমীদের কাছে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।
গত দুই দশকে মেসি-রোনালদোর নাম যেন ফুটবলেরই সমার্থক হয়ে উঠেছিল। একজন আর্জেন্টিনার, অন্যজন পর্তুগালের। একজন বাঁ পায়ের জাদুতে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙেছেন, অন্যজন গতি, শক্তি ও গোল করার অসাধারণ দক্ষতায় নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। ক্লাব ফুটবলে তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে থাকবে।
বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে লড়াইয়ের সেই দিনগুলোতে ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতাও ছিল তীব্র। ব্যালন ডি’অর, গোল, রেকর্ড কিংবা চ্যাম্পিয়নস লিগ—প্রায় প্রতিটি বড় মঞ্চেই তাঁদের তুলনা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত ও দলীয় সাফল্যের নানা পরিসরে মেসি এগিয়ে গেছেন। বিশেষ করে জাতীয় দলের হয়ে কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ জয় তাঁকে এনে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা।
রোনালদোও অবশ্য পর্তুগালের হয়ে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়সহ নিজের উত্তরাধিকার গড়ে নিয়েছেন। তাই তাঁদের দ্বৈরথ শেষ পর্যন্ত শুধু কে সেরা—এই প্রশ্নে আটকে থাকেনি; বরং দুই ভিন্ন ফুটবল-দর্শনের দুই মহাতারকার যুগল উপস্থিতিই গত দুই দশকের ফুটবলকে দিয়েছে অতুলনীয় রোমাঞ্চ।
মেসির আন্তর্জাতিক বিদায় সেই যুগের একটি বড় অধ্যায়ের পর্দা নামিয়েছে। আর সেই বিদায়বেলায় রোনালদোর কয়েকটি শব্দ যেন দুই কিংবদন্তির দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপরে উঠে এক মানবিক স্বীকৃতি হয়ে থাকল—‘তোমার জন্য আলিঙ্গন।’