অর্থনীতি

১৩৫ টাকার ডিজেলে শুল্ক-কর ৩৬ টাকা: রাজস্ব বাড়াতে মূল্যস্ফীতির আগুনে ঘি

আজাদ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১০
 ছবি:

প্রতি লিটার ডিজেলের খুচরা মূল্য ১৩৫ টাকা। এর মধ্যে ৩৫ টাকা ৮২ পয়সাই যাচ্ছে সরকারের শুল্ক ও কর হিসেবে। অর্থাৎ একজন ভোক্তা এক লিটার ডিজেল কিনলে প্রায় ২৭ শতাংশ অর্থই পরোক্ষভাবে সরকারের রাজস্বে যুক্ত হচ্ছে। আগের কর কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করলে প্রতি লিটারে সরকারের আদায় বেড়েছে প্রায় ১৯ টাকা ৬ পয়সা।

জ্বালানি তেলের ওপর এই বাড়তি করের বোঝা এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা এবং ব্যবসায়িক ব্যয়ের চাপ অর্থনীতিকে ইতোমধ্যে চাপে ফেলেছে। ফলে সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর এই কৌশল শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তা, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জ্বালানি তেলের কর কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসে ২০২৫ সালের জুনে। এর আগে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্দিষ্ট ‘ট্যারিফ ভ্যালু’ ধরে শুল্ক-কর আদায় করা হতো। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়া-কমার সঙ্গে এই করের পরিমাণ সরাসরি পরিবর্তিত হতো না। ওই ব্যবস্থায় প্রতি লিটার জ্বালানিতে সর্বোচ্চ মোট শুল্ক-কর ছিল ১৬ টাকা ৭৬ পয়সা।

বর্তমানে আমদানিকৃত জ্বালানির প্রকৃত ‘ইনভয়েস ভ্যালু’র ওপর নির্ধারিত হারে কর আরোপ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৬ শতাংশ আমদানি শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ২ শতাংশ আগাম কর এবং ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যত বাড়ে, সরকারের লিটারপ্রতি কর আদায়ের পরিমাণও তত বাড়ে।

বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, ১৩৫ টাকা দামের এক লিটার ডিজেলে সরকারের শুল্ক ও কর দাঁড়াচ্ছে ৩৫ টাকা ৮২ পয়সা। আগের ট্যারিফ ভ্যালু পদ্ধতিতে একই পরিমাণ কর ছিল ১৬ টাকা ৭৬ পয়সা। অর্থাৎ বর্তমান কাঠামোয় প্রতি লিটার ডিজেলে সরকারের রাজস্ব আদায় বেড়েছে ১৯ টাকা ৬ পয়সা।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জ্বালানি ব্যবহারকারী অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতে। ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, সেচের খরচ বাড়ে, কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যয় বাড়ে। শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এর চাপ গিয়ে পড়ে পণ্য ও সেবার দামে।

এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানির দাম শুধু একটি পণ্যের দাম নয়; এর সঙ্গে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তর যুক্ত। ফলে জ্বালানির ওপর বাড়তি করের চাপ মূল্যস্ফীতির ওপরও নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, একদিকে সরকারের রাজস্ব বাড়াতে হবে এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জমে থাকা লোকসান সামাল দিতে হবে। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানির দাম বাড়লে তা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগে ফেলছে।

সরকার জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক-করের পুরো চাপ সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে কি না, তা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, ভর্তুকি প্রয়োজন হলে তা সর্বজনীন না করে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কৃষকদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক করা যেতে পারে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম সরকারের বর্তমান কৌশলের সমালোচনা করে বলেন, বিশ্ববাজারে অস্থিতিশীলতার সময় অনেক দেশ অর্থনীতিকে সুরক্ষা দিতে জ্বালানির ওপর কর কমায়। কিন্তু বাংলাদেশে সরকার সংকটকে কাজে লাগিয়ে রাজস্ব বাড়িয়েছে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে মোট কর আদায়ও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

শুধু ভোক্তা নয়, বাড়তি করের চাপে পড়েছে জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিপিসিও। ইনভয়েস ভ্যালুভিত্তিক বর্তমান কাঠামোয় ১৩৫ টাকা দামের এক লিটার ডিজেল থেকে ৩৫ টাকা ৮২ পয়সা শুল্ক-কর হিসেবে চলে যাচ্ছে। ফলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় মেটাতে বিপিসির হাতে নিজস্ব অর্থের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিপিসি ইনভয়েস ভ্যালুভিত্তিক শুল্ক-কর কমানোর অথবা আগের ট্যারিফ ভ্যালু পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার সুপারিশ করে।

এর আগে ২১ সেপ্টেম্বর সরকার প্রধান পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম গড়ে ১৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এতে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে তেলের দাম বাড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে পাশের দেশে পাচার রোধ ও বিপিসির লোকসান কমানোর কথা বলা হয়।

তবে এর পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি দামও বড় কারণ। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ২০২৬ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসি ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকার পুঞ্জীভূত লোকসানের মুখে পড়ে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টাকার অবমূল্যায়ন। ২০২১ সালে এক মার্কিন ডলারের বিনিময় হার যেখানে প্রায় ৮৬ টাকা ছিল, ২০২৬ সালে তা বেড়ে ১২৩ টাকা ৫০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। এতে ডিজেলের ল্যান্ডিং কস্টে প্রতি লিটারে প্রায় ৫৫ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি আমদানির বিল পরিশোধের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে বিপিসি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের তহবিল থেকেও ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছে। সংস্থাটির শুল্ক-কাঠামো পরিবর্তনের প্রস্তাবের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল জ্বালানি বিক্রি থেকে বিপিসির নিজস্ব আয় বাড়ানো, যাতে আমদানি ব্যয়ের চাপ সামাল দেওয়া যায়।

তবে বিপিসির সেই উদ্যোগ আপাতত গতি হারিয়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বর সরকার সংস্থাটিকে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সুদমুক্ত আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি এবং ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ এই অর্থে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বিপিসির তেল আমদানির দরপত্রের অর্থায়ন সামাল দেওয়া সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বিপিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাড়তি শুল্ক-করের কারণে জ্বালানি বিক্রির অর্থ থেকে বিপিসির অংশ কমে গেছে। আগের ট্যারিফ ভ্যালু পদ্ধতি কার্যকর থাকলে প্রতি লিটার ডিজেলে সরকারের শুল্ক-কর ১৬ টাকা ৭৬ পয়সায় সীমিত থাকত। বর্তমান কাঠামোর তুলনায় এতে প্রতি লিটারে বিপিসির হাতে আরও ১৯ টাকা ৬ পয়সা থাকত। সেই অর্থ দিয়ে সংস্থাটির লোকসান ও আমদানি ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতো।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, শুল্ক-কর সংস্কারের প্রস্তাব কমিটির ওয়ার্কিং পেপারে দেওয়া হয়েছিল। তবে জরুরি ঋণের সুবিধা পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আর বিস্তারিত আলোচনা এগোয়নি।

বিপিসি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য একটি জাতীয় ‘জ্বালানি স্থিতিশীলতা তহবিল’ গঠন, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প ও ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং জাতীয় জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা ৯০ দিনে উন্নীত করার প্রস্তাবও দিয়েছে।

সরকারের দেওয়া ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সহায়তা বিপিসির তাৎক্ষণিক নগদ সংকট সাময়িকভাবে সামাল দিলেও জ্বালানি খাতের মূল সমস্যা এতে কাটছে না। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজার, ডলারের বিনিময় হার ও আমদানি ব্যয়ের চাপ; অন্যদিকে বিপিসির লোকসান এবং সরকারের বাড়তি রাজস্বের প্রয়োজন—সব মিলিয়ে জ্বালানি খাত দাঁড়িয়েছে জটিল এক সমীকরণের সামনে।

এর সবচেয়ে বড় চাপটি শেষ পর্যন্ত পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। ডিজেলের বাড়তি দাম পরিবহন থেকে কৃষি, শিল্প থেকে বাজার—সবখানে ব্যয় বাড়াচ্ছে। আর সেই জ্বালানির দামের মধ্যেই যখন প্রায় ৩৬ টাকা সরকারের শুল্ক-কর হিসেবে যুক্ত হচ্ছে, তখন রাজস্ব আহরণ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সরকারের নীতিগত ভারসাম্য নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

১

তিন বছর পর মাঠে ফিরছে প্রথম বিভাগ হকি লিগ

২

বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত অনুমোদন পেল রূপপুরের প্রথম ইউনিট

৩

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যানের সাক্ষাৎ

৪

আমরা ভারতবিরোধী নই, আধিপত্যবিরোধী: আসিফ মাহমুদ

৫

চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে সারদার মতো পুলিশ একাডেমি করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

৬

ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে টিপসই, বিধবাকে বিয়ে করার অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে

৭

রংপুর সিটি করপোরেশনে ১,৮১২ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন, আনন্দ মিছিল

৮

পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে ভারতের সঙ্গে সংলাপ চায় বাংলাদেশ

৯

১৩৫ টাকার ডিজেলে শুল্ক-কর ৩৬ টাকা: রাজস্ব বাড়াতে মূল্যস্ফীতির আগুনে ঘি

১০

বিদায়বেলায় মেসিকে ‘আলিঙ্গন’ রোনালদোর

১১

বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় ঢাবির ২২ শিক্ষক-গবেষক

১২

মেসির মতো আবেগঘন বিদায় রোনালদো না পাওয়ায় খারাপ লাগছে লিনেকারের

১৩

‘বিশাল গরু পার্টি’ থিমে সিডনিতে আইইউটিয়ানদের জমজমাট পুনর্মিলনী

১৪

আসিয়ান বিপর্যয়ে বাংলাদেশের অবনতি, ব্রাজিলকে টপকে পাঁচে পর্তুগাল

১৫

৩৮ রানে অলআউট সিলেট, সেঞ্চুরি তাকরিরের

১

ট্রেনের ১৭ হাজার টিকিটের জন্য ২ কোটি ৭৬ লাখ বার চেষ্টা

২

দিল্লিতে ভারী বৃষ্টিতে বিমান চলাচল বিঘ্ন, ব্যাপক দুর্ভোগ

৩

মিরাজ-সৌম্যকে দলে টানতে চায় রংপুর

৪

আওয়ামী লীগ নেত্রী গ্রেফতার

৫

গাজায় একদিনে নিহত আরও ৭৯ ফিলিস্তিনি

৬

বিএসএফের গুলিতে ২ বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ

৭

মাদককারবারিদের নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ওসির

৮

২ বহিরাগতের নিয়ন্ত্রণে সরকারি অফিস!

৯

নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ ব্যতীত সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতির সুযোগ নেই: আলী রীয়াজ

১০

বনানীতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২

১১

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে স্থগিত যেসব চাকরির পরীক্ষা

১২

নন-ক্যাডারে ৪১৩৬ জনকে নিয়োগের সুপারিশ

১৩

৬৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএ’র গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

১৪

নারায়ণগঞ্জের আলোর বাতিঘর ‘সুধীজন পাঠাগার’

১৫

মাদ্রাসায় গ্রামীণ ফোন করপোরেট নম্বর ব্যবহার বাধ্যতামূলক

সম্পর্কিত