ওয়ানডে ক্রিকেটে অবিশ্বাস্য এক জয়ের সাক্ষী হলো রাওয়ালপিন্ডি। হ্যারি ব্রুকের রেকর্ডগড়া ২০২ রানের ইনিংসে ইংল্যান্ডের তোলা ৪২৯ রানের পাহাড়সম লক্ষ্যও আটকে রাখতে পারেনি শ্রীলঙ্কাকে। পাভান রত্ননায়েকের সেঞ্চুরি, আভিস্কা ফার্নান্দো ও দাসুন শানাকার বড় ইনিংস এবং জানিথ লিয়ানাগের ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে ২ উইকেট হাতে রেখেই ৪৩০ রানের লক্ষ্য পেরিয়ে যায় লঙ্কানরা। ওয়ানডে ক্রিকেটে রান তাড়া করে জয়ের ক্ষেত্রে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাওয়ালপিন্ডিতে ত্রিদেশীয় সিরিজের ম্যাচে শেষ ওভারে জয়ের জন্য শ্রীলঙ্কার প্রয়োজন ছিল ৮ রান। প্রথম বলে এক রান নেন জানিথ লিয়ানাগে। পরের দুই বলে দুনিথ ভেল্লালাগে ও ইশান মালিঙ্গাকে বোল্ড করে ম্যাচে ফেরার আশা জাগান ইংলিশ পেসার জশ টাং। হ্যাটট্রিকের সুযোগ তৈরি হলেও তৃতীয় বলে এক রান নিয়ে সমীকরণ দুই বলে ৬ রানে নামিয়ে আনেন আসিথা ফার্নান্দো।
এরপর আর কোনো নাটকীয়তার সুযোগ দেননি লিয়ানাগে। টাংয়ের পরের বলটি সীমানাছাড়া করে শ্রীলঙ্কাকে অবিশ্বাস্য জয় এনে দেন তিনি। মাত্র ২৭ বলে ৬১ রানে অপরাজিত থেকে দলের জয়ের নায়ক বনে যান এই ব্যাটার। একদিকে শ্রীলঙ্কার রেকর্ড গড়া জয়, অন্যদিকে ব্রুকের দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরির কীর্তি—এক ম্যাচে দুই দলের দুই রকম ইতিহাস লেখা হলো।
৪৩০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই বিপাকে পড়ে শ্রীলঙ্কা। দলীয় ২৪ রানের মধ্যে ফিরে যান কামিন্দু মেন্ডিস ও অধিনায়ক কুশল মেন্ডিস। কামিন্দুকে বোল্ড করেন জশ টাং। কুশল কোনো বল খেলার আগেই রানআউট হন। এমন সূচনায় ইংল্যান্ডের সামনে সহজ জয়ের সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছিল।
কিন্তু আভিস্কা ফার্নান্দো ও পাভান রত্ননায়েকের ব্যাটে পাল্টে যায় ম্যাচের চিত্র। তৃতীয় উইকেটে দুজন গড়েন ১৬৬ রানের জুটি। সেঞ্চুরির খুব কাছে গিয়েও তিন রানের জন্য শতক থেকে বঞ্চিত হন আভিস্কা। ১৯০ রানে ওভারটনের বলে ক্যাচ দিয়ে ফেরার আগে তিনি দলের জয়ের ভিত গড়ে দেন। এরপর পাভানের সঙ্গে যোগ দেন দাসুন শানাকা। তাঁদের জুটিতে আসে আরও ১৩৩ রান। দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে সেঞ্চুরি তুলে নেন পাভান। ১৩০ রান করে স্যাম কারানের বলে আউট হলে ৩২৩ রানে চতুর্থ উইকেট হারায় শ্রীলঙ্কা। তাঁর ইনিংসটি বড় লক্ষ্য তাড়ায় দলের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনে।
শানাকাও খেলছিলেন দারুণ ছন্দে। তবে তিনিও সেঞ্চুরি থেকে তিন রান দূরে থাকতে আউট হন। ৯৭ রান করে তাঁর বিদায়ে ৩৬৩ রানে পঞ্চম উইকেট হারায় শ্রীলঙ্কা। পরে সাহান আরাচ্চিগে ১৩ রান করে আউট হলে ৪০৬ রানে ষষ্ঠ উইকেটের পতন ঘটে। তখনো জয়ের জন্য শ্রীলঙ্কাকে শেষ পর্যন্ত লড়তে হয়েছে।
শেষ ওভারের রোমাঞ্চে দুই উইকেট হারিয়েও লিয়ানাগের দৃঢ়তায় জয় তুলে নেয় দলটি। ইংল্যান্ডের হয়ে জশ টাং তিনটি এবং স্যাম কারান দুটি উইকেট নেন। জেমি ওভারটন ও লিয়াম ডসন একটি করে উইকেট পান।
এর আগে টস জিতে ইংল্যান্ডকে ব্যাটিংয়ে পাঠান শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক কুশল মেন্ডিস। শুরুতে টম ব্যান্টন ও বেন ডাকেট ৭৪ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়েন। ব্যান্টন ৫০ রান করে জানিথ লিয়ানাগের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। এরপর ডাকেটকে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলেন দুনিথ ভেল্লালাগে। ২৯ রান করা ডাকেটের বিদায়ে ৮৫ রানে দ্বিতীয় উইকেট হারায় ইংল্যান্ড।
এরপর জো রুটকে নিয়ে ইনিংস সামলান হ্যারি ব্রুক। তৃতীয় উইকেটে তাঁদের ১৫৯ রানের জুটিতে ইংল্যান্ড বড় সংগ্রহের ভিত পায়। রুট ৬৬ বলে ৬৯ রান করে আসিথা ফার্নান্দোর বলে আউট হন। তখন দলীয় সংগ্রহ ২৪৪ রান।
রুট ফেরার পর আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠেন ব্রুক। মাত্র ৭৫ বলে শতক, ৯৭ বলে দেড় শ এবং ১১৪ বলে ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তিনি। ২১টি চার ও ১০টি ছক্কায় সাজানো তাঁর ২০২ রানের ইনিংসটি ওয়ানডেতে দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়ে। ইনিংসের শেষ বলে আউট হওয়ার আগে তিনি শ্রীলঙ্কার বোলারদের ওপর কার্যত একক আধিপত্য বিস্তার করেন। অন্য প্রান্তে উইল জ্যাকসও চালান ঝড়। মাত্র ৩০ বলে ৬৬ রান করে অপরাজিত থাকেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল আটটি চার ও তিনটি ছক্কা। নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৪ উইকেটে ৪২৯ রান তোলে ইংল্যান্ড। শ্রীলঙ্কার হয়ে ভেল্লালাগে দুটি এবং আসিথা ফার্নান্দো ও জানিথ লিয়ানাগে একটি করে উইকেট নেন।
ব্রুকের বিধ্বংসী ইনিংসের পর ইংল্যান্ডের জয় প্রায় নিশ্চিত মনে হলেও শ্রীলঙ্কার ব্যাটাররা শেষ পর্যন্ত হিসাব পাল্টে দেন। ৪৩০ রান তাড়া করে এই জয় শুধু ম্যাচের ফল নয়, ওয়ানডে ক্রিকেটে বড় লক্ষ্য তাড়ার ইতিহাসেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।