সারাদেশে বর্তমানে ৫০ থেকে ৮০ লাখের মতো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। এরমধ্যে শুধু ঢাকাতেই ৪৮ হাজারের বেশি অটোরিকশা রয়েছে। এসব অটোরিকশার ব্যাটারি অবৈধভাবে চার্জ করায় সরকার বছরে চার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। এ কারণে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে এগুলোকে ডিজিটাল নিবন্ধন, কিউআর কোড ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার আওতায় এনে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। নীতিমালার আওতায় প্রতিটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ডিজিটাল নিবন্ধন করা হবে। প্রতিটি যানকে দেওয়া হবে কিউআর কোড ও ট্র্যাকিং সুবিধা। এর ফলে একটি নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে একাধিক অটোরিকশা চালানোর সুযোগ বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আজ সোমবার জাতীয় সংসদে ৭১ বিধির আওতায় সরকারি দলের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে এসব তথ্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সময় সংসদে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অটোরিকশা ব্যবস্থাপনার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। এতে একদিকে এসব যানবাহনের কারণে সৃষ্ট সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে অটোরিকশার সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও গুরুত্ব পেয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে একটি নিবন্ধিত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যে আনা হবে। নিবন্ধনের মাধ্যমে কোন অটোরিকশা কোথায় চলছে, সেটির মালিক বা চালক কে এবং যানটির বৈধতা কী—এসব তথ্য নজরদারির আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে।
৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার
সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার রয়েছে। এসব যান দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে। তবে বৈধভাবে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার জন্য অনুমোদিত চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা মাত্র প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। বিপরীতে শুধু ঢাকাতেই প্রায় ৪৮ হাজার অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে সরকার প্রতিবছর প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) ও ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করছে।
অটোরিকশার ব্যাটারি ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে। নীতিমালায় পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দুর্ঘটনায়ও অটোরিকশার সম্পৃক্ততা
সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টিও সরকারের উদ্বেগের অন্যতম কারণ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে জানান, ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশের সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা জড়িত ছিল। সরকারের মতে, গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ তিন চাকার বৈদ্যুতিক যান দেশের গ্রামীণ ও নগর পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। কম খরচে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি চালক, গ্যারেজ শ্রমিক, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী এবং চার্জিং সেবাদাতাসহ বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
তবে একই সময়ে এসব যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার সড়ক ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর চাপ তৈরি করেছে। ফলে একদিকে যানগুলোকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা এবং অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট মানুষের কর্মসংস্থান ধরে রাখার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে চাইছে সরকার।
নম্বর প্লেট ও লাইসেন্সের দাবি
সরকারের এই উদ্যোগের বিষয়টি সংসদে তোলেন সরকারি দলের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু। তিনি বলেন, রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে ৫০টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ট্রাফিক ক্যামেরা চালু রয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে লালবাতি অমান্য, লেন পরিবর্তন ও অতিরিক্ত গতিসহ বিভিন্ন ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করা হচ্ছে। তবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় নম্বর প্লেট না থাকায় ক্যামেরায় কোনো অনিয়ম ধরা পড়লেও সংশ্লিষ্ট যান বা চালকের বিরুদ্ধে জরিমানা কিংবা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। রেহানা আক্তার রানু বলেন, কম ভাড়া ও সহজলভ্যতার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে অটোরিকশা জনপ্রিয়। তাই এগুলো পুরোপুরি বন্ধ না করে নম্বর প্লেট, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সের আওতায় এনে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
সম্পূরক প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তিনি অটোরিকশা নিষিদ্ধ করার কথা বলেননি। বরং পরিকল্পিতভাবে এগুলোকে নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন। প্রধান সড়কের পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ সড়কে অটোরিকশা চলাচলের ব্যবস্থা, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে চার্জিং অবকাঠামো তৈরি, বিআরটিএর মাধ্যমে নিবন্ধন এবং এলাকাভিত্তিক রিকশা চলাচলের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন তিনি।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধে ডিএমপি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। পাশাপাশি রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। ১৭টি সিগন্যালে স্থাপিত ৫০টি এআই ক্যামেরা থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়ায় তেজগাঁও ও রমনা ট্রাফিক বিভাগে আরও ২০০টি এআই ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে পুরো রাজধানীতে এ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হবে। এর ফলে নিবন্ধিত অটোরিকশায় কিউআর কোড ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু হলে সড়কে চলাচলকারী যান শনাক্ত করা এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আরও বাড়বে বলে সরকারের পরিকল্পনায় ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
কর্মসংস্থান বনাম নিয়ন্ত্রণ
সরকারের নতুন নীতিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অটোরিকশার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মানুষের কর্মসংস্থান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অটোরিকশা চালক ছাড়াও গ্যারেজ শ্রমিক, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী ও চার্জিং সেবাদাতাসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে অটোরিকশা বন্ধ করে দেওয়ার পরিবর্তে নিবন্ধন, চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স, নির্দিষ্ট রুট, বৈধ চার্জিং অবকাঠামো এবং পরিবেশবান্ধব ব্যাটারির ব্যবহার নিশ্চিত করে খাতটিকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সরকারের ভাষ্য, জাতীয় স্বার্থের পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা এবং এই খাতের সঙ্গে যুক্ত মানুষের কর্মসংস্থান—সব দিক বিবেচনায় নিয়ে নীতিমালাটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। অর্থাৎ, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধ নয়; বরং কে চালাবে, কোন গাড়ি চলবে, কোথায় চলবে এবং কীভাবে চার্জ হবে—পুরো ব্যবস্থাকে নিবন্ধন ও ডিজিটাল নজরদারির আওতায় আনার দিকেই এগোচ্ছে সরকার।