মায়ের আইফোন নিয়ে বের হওয়ার পর নিখোঁজ, পরদিন জঙ্গলে মিলল ১৩ বছরের শিক্ষার্থীর মরদেহ; মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আলামত পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই পুলিশের একাধিক দল তাকে উদ্ধারে কাজ শুরু করে। তদন্তে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্লু পাওয়া গেছে। পুলিশ সুপার বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধু আইফোন ছিল, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল, তা দ্রুত উদ্ঘাটন করা হবে। হত্যাকাণ্ডে যতজনই জড়িত থাকুক, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।’ সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কয়েকজন পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই তাদের নাম প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
পুলিশ জানায়, অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং হত্যাকাণ্ডের ধরন সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, তুহিন নামে এক যুবকের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শুক্রবার বিকেল থেকে ওই যুবক অপ্রতিমের সঙ্গে ছিল বলে জানা গেছে। তিনি বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই যুবকের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা হয়নি।
এর আগে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) জুমার নামাজের পর মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিম। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি সে। শনিবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার দক্ষিণ মোড়ের দক্ষিণ পাশে একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
অপ্রতিম বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। সে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান।
পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সদর দক্ষিণ থানাধীন ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বের হয় অপ্রতিম। এরপর সে আর বাড়িতে ফেরেনি। বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও সন্ধান না পেয়ে ওইদিন সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার।
নিখোঁজের পর থেকেই অপ্রতিমকে উদ্ধারে স্বজনদের পাশাপাশি পুলিশের একাধিক দল কাজ শুরু করে। তার সর্বশেষ অবস্থান শনাক্তের পাশাপাশি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়।
শনিবার সকালে কোটবাড়ি এলাকার একটি জঙ্গলে অপ্রতিমের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় কয়েকজন। মরদেহের প্রথম প্রত্যক্ষদর্শী আবদুল কাদের জিলানী বলেন, তাঁরা বাঁশ কাটার জন্য ওই এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে একটি স্থানে কাউকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখার কথা তাঁর ছেলে জানালে কাছে গিয়ে তাঁরা মরদেহ দেখতে পান।
আবদুল কাদের জিলানী বলেন, ‘ভালোভাবে খেয়াল করে দেখি, ওর মাথায় জখম আছে। ভয় পেয়ে যাই। একটু পর মামুন নামে একজনের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি বলেন, ম্যাডামের ছেলে নিখোঁজ। আমরা ঘটনা খুলে বলতেই তিনি ঘটনাস্থলে যান। গিয়ে দেখেন অপ্রতিমের মরদেহ পড়ে আছে।’
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আবদুল হাকিম বলেন, ঘটনার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমরা ছেলেটিকে আর জীবিত পেলাম না। তার সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটিও পাওয়া যায়নি।’
এদিকে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। তিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেন।
পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোনটি উদ্ধার, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যসহ বিভিন্ন আলামত যাচাই করা হচ্ছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে।