প্রতিমন্ত্রীর দাবি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেই অর্ধেক বা এক-তৃতীয়াংশ বেতনে বেসরকারি স্কুলে ভালো শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে; নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশিক্ষণব্যবস্থা নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তুলনায় অর্ধেক বা এক-তৃতীয়াংশ বেতন পেয়েও অনেক বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ভালো শিক্ষা দিচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তাঁর ভাষায়, শিক্ষকদের বেতন কোনো ‘ইস্যু নয়’; শিক্ষার মানোন্নয়নে আরও অনেক বিষয় নিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
শনিবার ঢাকার লেকশোর হোটেলে ‘সরকার কতখানি এগোলো? প্রাথমিক শিক্ষার ওপর আলোকপাত’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে তিনি এ কথা বলেন। ‘এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ’ এ সংলাপের আয়োজন করে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “শিক্ষকদের বেতন কোনো ‘ইস্যু নয়’। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা মাত্র সাত মাসের। এখানে যারা আছেন, তাঁদের বেশির ভাগের অভিজ্ঞতা ৭, ১৭, ২৭ বছরের। তাই আমি আপনাদের সঙ্গে নিশ্চয়ই তর্ক করব না, আপনাদের কাছ থেকে শিখতেই এসেছি। তবে সাত মাসে আমি পরিসংখ্যানের জায়গা থেকে প্রাসঙ্গিক সংখ্যাগুলো দেখে ফেলেছি।”
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বেতন তুলনামূলক কম হলেও শিক্ষার মান নিয়ে ভিন্ন চিত্র দেখেছেন বলে দাবি করেন তিনি। ববি হাজ্জাজ বলেন, “সংখ্যাগুলো দেখার পর আমি দেখেছি যে, আমার জিপিএসে (সরকারি প্রাথমিক স্কুলে) আমরা যে শিক্ষার মান দিচ্ছি, তার ঠিক পাশেই অর্ধেক বা এক-তৃতীয়াংশ বেতনের শিক্ষকরা বেসরকারি স্কুলে যে শিক্ষা দিচ্ছেন, সেখানে আরও ভালো শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।”
এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ওই শ্রেণির শিক্ষার্থীরা শিখনের যেসব উদ্দেশ্য রয়েছে, সেগুলো আরও ভালোভাবে অর্জন করতে পারছে। এ কারণে শিক্ষকদের বেতনকে শিক্ষার মানের প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখছেন না তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, “তাই বেতন সমস্যা নয়। আমি বেতন নিয়ে আর আলোচনা করছি না। বেতন নিয়ে আলোচনা মহাপরিচালক সাহেব করবেন। কিন্তু বেতন সমস্যা নয়, আরও অনেক কিছু নিয়ে আলোচনা আছে।”
বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পেতে ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রি এবং নিয়োগ পরীক্ষা পাস করতে হয়। সরকারি বেতন কাঠামোয় এ পদ ১৩তম গ্রেডের। নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী এ গ্রেডে মূল বেতন ২৪ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে। এতদিন এ পদের মূল বেতন ছিল ১১ হাজার টাকা। অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে চাকরির শুরুতে মোট বেতন ২০ হাজার টাকার নিচে থাকত।
তবে কর্মস্থলভেদে শিক্ষকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপও রয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকায় কর্মরত শিক্ষকদের একটি বড় অংশকে যাতায়াতে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হয়। আবার ঢাকা ও জেলা শহরের মতো এলাকায় কর্মরতদের বেতনের বড় অংশ বাসাভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয়ে চলে যায়।
শিক্ষকদের পদোন্নতি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা সীমাবদ্ধতা ও জটিলতার কথা আলোচনায় এসেছে। শনিবারের সংলাপেও নিয়োগ, ক্যারিয়ার কাঠামো, পদোন্নতি, মূল্যায়ন ও প্রশিক্ষণব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে তাঁদের ক্যারিয়ার, পদোন্নতি, মূল্যায়ন ও প্রশিক্ষণ—সবকিছু নতুন বাস্তবতার আলোকে সাজানোর কাজ চলছে। তিনি বলেন, “টিচার নিয়োগ থেকে শুরু করে তার ক্যারিয়ার পদোন্নতি কী হতে পারে, মূল্যায়ন কীভাবে হবে, প্রশিক্ষণ কীভাবে হবে—সবকিছু নতুন বাস্তব আঙ্গিকে সাজানোর কাজ চলছে। এটা ফাইনাল হওয়ার পরেই আপনাদের সবার সঙ্গে শেয়ার করা হবে।”
প্রাথমিক পর্যায়ের সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ধীরে ধীরে মনিটরিংয়ের আওতায় আনার উদ্যোগের কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ মনিটরিংয়ের আওতায় কওমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলও থাকবে।
সংলাপে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ বলেন, শুধু শিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ বাড়ালেই হবে না; সেই শিক্ষা অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে কতটা ভূমিকা রাখছে, সেটিও দেখতে হবে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক জেন্ডার সমতা সূচকে বাংলাদেশ শিক্ষাক্ষেত্রে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে পিছিয়ে রয়েছে। মেয়েদের স্কুলে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাফল্য অর্জন করেছে উল্লেখ করে নাজনীন আহমেদ বলেন, এখন বড় প্রশ্ন হলো, স্কুলে অর্জিত শিক্ষা তাঁদের কর্মজীবনে কতটা কাজে লাগছে।
সংলাপে প্রাথমিক শিক্ষার মান, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন, নিয়োগ ও পদোন্নতি, প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি এবং শিক্ষাকে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সঙ্গে যুক্ত করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
**ট্যাগ:** প্রাথমিক শিক্ষা, ববি হাজ্জাজ, প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেসরকারি স্কুল, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক পদোন্নতি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, সিপিডি, নাজনীন আহমেদ, শিক্ষার মান