ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন

‘৭১-এর ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি এখন অপ্রাসঙ্গিক’

আজাদ ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০৯
 ছবি:

আব্দুর রাজ্জাকের বইয়ে জামায়াতের ভেতরে ক্ষমা চাওয়ার একাধিক উদ্যোগ ও বিরোধিতার বিবরণ; এটিএম আজহারুলের দাবি, জনগণ জামায়াতকে ক্ষমা করেছে

১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার জন্য দলটির পক্ষ থেকে নতুন করে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি এখন অপ্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতের নায়েবে আমির ও রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম। তাঁর দাবি, জনগণ জামায়াতকে ক্ষমা করেছে বলেই দলটি এককভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে নির্বাচিত হয়েছে।

প্রয়াত জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের ‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ বইয়ে অবশ্য ভিন্ন একটি অভ্যন্তরীণ ইতিহাস উঠে এসেছে। শুক্রবার ঢাকায় উন্মোচিত স্মৃতিচারণমূলক বইটিতে আব্দুর রাজ্জাক লিখেছেন, ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে দলের ভেতরে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁর বর্ণনায়, বিভিন্ন সময়ে দলের প্রভাবশালী নেতাদের বিরোধিতার কারণে এসব উদ্যোগ থেমে যায়।

ডয়চে ভেলের সঙ্গে কথা বলার সময় আব্দুর রাজ্জাকের বইয়ে তাঁর নিজের বিষয়ে লেখা অংশ সম্পর্কে এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, তিনি বইটির বক্তব্য বিস্তারিত জানেন না। তবে ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে জামায়াত অতীতে দুঃখ প্রকাশ করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

আজহারুল ইসলামের ভাষ্য, ১৯৯২ সালে কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর তৎকালীন জামায়াত আমির গোলাম আযম বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে এক অনুষ্ঠানে ১৯৭১ সালের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, গোলাম আযম বলেছিলেন, সে সময় তাঁরা ছোট ছিলেন এবং তাঁর ওপর যে দায়িত্ব ছিল, তিনি তা পালন করেছেন। পাশাপাশি জামায়াতের আচরণ, কথাবার্তা বা কর্মকাণ্ডে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা করে দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছিলেন।

আজহারুল ইসলাম বলেন, “এরপরেও তো জামায়াত কয়েকবার দুঃখ প্রকাশ করেছে। জামায়াত এ ব্যাপারে ক্ষমা চাইবে না—এরকম বলে আমি বলিনি। আমরা বলেছি, যদি আমরা ব্যক্তিগতভাবে কিছু করে থাকি, সেটা তার ব্যাপার। জামায়াত এই কাজের সঙ্গে জড়িত না।”

বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, যারা জামায়াত ক্ষমা চায়নি বলে বক্তব্য দিচ্ছেন, তাঁরা বিষয়টি রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাঁর দাবি, “ক্ষমা তো জনগণ করে দিয়েছে। তা না হলে আজকে দুইটা আসন থেকে ৬৮টা আসন একক দল হিসেবে জামায়াত পেত না।” তাঁর মতে, নতুন করে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি এখন অপ্রাসঙ্গিক।

তবে আব্দুর রাজ্জাকের বইয়ে জামায়াতের ভেতরে এ বিষয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলা বিতর্কের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। বই অনুযায়ী, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লা একপর্যায়ে বিষয়টির নিষ্পত্তি করে ১৯৭১ সালের অধ্যায়ের সমাপ্তি টানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ২০১০ সালের জুনে দলের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল গ্রেপ্তার হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পাওয়া এটিএম আজহারুল ইসলাম ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগে আপত্তি তোলেন বলে বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

বইয়ে আজহারুল ইসলামের একটি বক্তব্যও উদ্ধৃত করেছেন আব্দুর রাজ্জাক। সেখানে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের বিষয়টি নিয়ে কোনো উদ্যোগ না নিয়েও যদি জামায়াতের দুই নেতার গাড়িতে জাতীয় পতাকা ওড়ানো সম্ভব হয়, তাহলে এ নিয়ে আর উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। আব্দুর রাজ্জাক তাঁর বইয়ে ওই অবস্থানের সমালোচনা করে লিখেছেন, গুরুতর ও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে এটি যথাযথ পন্থা ছিল না।

আব্দুর রাজ্জাক ২০০৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালে তিনি দল ছাড়েন। ২০২৫ সালের মে মাসে তিনি মারা যান।

বইয়ে তিনি লিখেছেন, ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগ প্রথমবার সামনে আসে ১৯৯৪ সালে। ওই বছর সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর তৎকালীন জামায়াত আমির গোলাম আযম বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ফিরে পান। তাঁর একটি জনসমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার আগে ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। সে সময় ভাষণের প্রস্তুতিতে সহায়তার জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল বলে বইয়ে উল্লেখ রয়েছে।

২০০১ সালের অক্টোবরে চারদলীয় জোটের নির্বাচনী বিজয়ের পর বিষয়টি আবারও সামনে আসে। আব্দুর রাজ্জাক এটিকে ক্ষমতাসীন অবস্থান থেকে ১৯৭১ সালের প্রশ্ন মোকাবিলার সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন বলে বইয়ে লিখেছেন। ওই বছরের বিজয় দিবসের আগে তিনি দলের ভেতরে উদ্যোগ নেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন অধ্যাপকের সহায়তায় একটি বিবৃতির খসড়া তৈরির চেষ্টা করেন।

পরে বিষয়টি জামায়াতের নেতৃত্বের অনুমোদনের জন্য তোলা হয়। প্রাথমিক বৈঠকে তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী সভাপতিত্ব করেন। সেখানে আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা ও এটিএম আজহারুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন বলে বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে মুজাহিদের নেতৃত্বে একটি উপকমিটিও গঠন করা হয়।

বই অনুযায়ী, খসড়া তৈরির চার বছর পর ২০০৫ সালের অক্টোবরে বিষয়টি ওয়ার্কিং কমিটির সামনে উপস্থাপন করা হয়। সেখানে আব্দুর রাজ্জাক ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীকে সমর্থন করা রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে সঠিক ছিল কি না—এ প্রশ্ন তোলেন। তবে কণ্ঠভোটে তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে একাধিক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও ক্ষমা চাওয়ার পক্ষে ঐকমত্য তৈরি হয়নি।

আব্দুর রাজ্জাক লিখেছেন, নির্বাহী কমিটি ক্ষমা না চাওয়া এবং দল বিলুপ্ত না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর বইয়ে এসব উদ্যোগের ব্যর্থতার পেছনে দলের ভেতরের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপের কথাও বলা হয়েছে।

বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ও অবস্থান সঠিক ছিল না—এমন অবস্থান জামায়াত মেনে নিয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আব্দুর রাজ্জাকের প্রস্তাবিত একটি বিবৃতিতে জামায়াতের স্বাক্ষর থাকলে এ বিষয়ে অনেক প্রশ্নের সমাধান হতে পারত।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী ডয়চে ভেলেকে বলেন, আব্দুর রাজ্জাক জামায়াতকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে বইটি লেখেননি; বরং বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতিতে দলটির অংশগ্রহণের জন্য কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, তা তিনি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, বিতর্কিত ইতিহাসকে পেছনে ফেলতে হলে অতীতের অনেক বিষয় স্বীকার করে সামনে এগোতে হয়।

অন্যদিকে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, কোনো একক ব্যক্তির সিদ্ধান্তে জামায়াত পরিচালিত হয় না। সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে কোনো ব্যক্তির বিরোধিতার কারণে আব্দুর রাজ্জাকের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে—এভাবে বিষয়টি দেখার সুযোগ নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে জামায়াতের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, জামায়াত এখনো ১৯৭১ সালের ভূমিকার ক্ষেত্রে কোনো ভুল স্বীকার করেনি। তাঁর মতে, ভুল স্বীকার না করলে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নও আসে না। তবে তিনি এটিও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অতীতের ভুল স্বীকার না করার প্রবণতা রয়েছে।

ফলে আব্দুর রাজ্জাকের বইয়ে উঠে আসা দুই দশকের বেশি সময়ের অভ্যন্তরীণ বিতর্ক এবং বর্তমান জামায়াত নেতৃত্বের বক্তব্যে বিষয়টির দুটি ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। একদিকে বইয়ে ক্ষমা চাওয়ার একাধিক উদ্যোগ ও তা আটকে যাওয়ার বিবরণ রয়েছে; অন্যদিকে বর্তমান নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জামায়াত অতীতে দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে দলটিকে গ্রহণ করেছে। ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নটি তাই জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থানের একটি পুরোনো বিতর্ক হিসেবেই আবার সামনে এসেছে।

সূত্র: ডয়েচে ভেলে

অভিন্ন ও মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু হলে শ্রমবাজারে তরুণদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে: প্রধানমন্ত্রী

যেকোনো সময় আট দফা এক দফা হয়ে যেতে পারে : জামায়াত আমির

ককটেল বিস্ফোরণ-বাসে আগুনের পর রাজধানীতে ডিএমপির ২০০ চেকপোস্ট, নিরাপত্তা জোরদার

‘দেশের সব প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মনিটরিংয়ের আওতায় আসছে’

কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যায় কিছু ক্লু পাওয়া গেছে, একজন হেফাজতে: পুলিশ

‘৭১-এর ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি এখন অপ্রাসঙ্গিক’

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি

পটুয়াখালীতে দুই যুবতীর বিরুদ্ধে বাসর ঘর সাজিয়ে সমকামিতার অভিযোগ

আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব পারমাণবিক পরিবারে প্রবেশ করল বাংলাদেশ

১০

পাবনায় স্কুলশিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যা, প্রধান অভিযুক্তের বাড়িতে ভাঙচুর

১১

আওয়ামী লীগের চেয়েও খারাপ পরিণতি হবে বিএনপির: এটিএম আজহারুল

১২

ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনা আমলের ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা করবে বাংলাদেশ

১৩

কানাডার ইউরোপমুখী যাত্রা ‘বড় ভুল’

১৪

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমিন, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি

১৫

ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে ছেলেকে জিম্মি করে মাকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, আটক ১

ট্রেনের ১৭ হাজার টিকিটের জন্য ২ কোটি ৭৬ লাখ বার চেষ্টা

দিল্লিতে ভারী বৃষ্টিতে বিমান চলাচল বিঘ্ন, ব্যাপক দুর্ভোগ

মিরাজ-সৌম্যকে দলে টানতে চায় রংপুর

আওয়ামী লীগ নেত্রী গ্রেফতার

গাজায় একদিনে নিহত আরও ৭৯ ফিলিস্তিনি

বিএসএফের গুলিতে ২ বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ

মাদককারবারিদের নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ওসির

২ বহিরাগতের নিয়ন্ত্রণে সরকারি অফিস!

নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ ব্যতীত সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতির সুযোগ নেই: আলী রীয়াজ

১০

বনানীতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২

১১

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে স্থগিত যেসব চাকরির পরীক্ষা

১২

নন-ক্যাডারে ৪১৩৬ জনকে নিয়োগের সুপারিশ

১৩

৬৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএ’র গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

১৪

নারায়ণগঞ্জের আলোর বাতিঘর ‘সুধীজন পাঠাগার’

১৫

মাদ্রাসায় গ্রামীণ ফোন করপোরেট নম্বর ব্যবহার বাধ্যতামূলক

সম্পর্কিত