চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে; কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক অব্যাহত থাকবে বলে জানাল ভারত
গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি। চুক্তিটির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকের নির্দিষ্ট তারিখ বা নবায়নের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি। শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, পানিসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য দুই দেশের যৌথ নদী কমিশন রয়েছে এবং কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক অব্যাহত থাকবে।
ব্রিফিংয়ে সাংবাদিক গৌতম লাহিড়ি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির বর্তমান পরিস্থিতি জানতে চান। তিনি বলেন, চুক্তিটির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। কিন্তু যৌথ নদী কমিশনের কোনো আলোচনা বা বৈঠকের দিনক্ষণ এখনো জানা যায়নি। চুক্তি নবায়নের বিষয়টি অনুমোদনের পর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরের প্রয়োজন হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জবাবে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “পানিসংক্রান্ত বিষয়সমূহ নিয়ে আলোচনার জন্য আমাদের যৌথ নদী কমিশন রয়েছে। কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক অব্যাহত থাকবে।”
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি সই হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়া চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ৩০ বছর মেয়াদি এ চুক্তি অনুযায়ী প্রতিবছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ফারাক্কা ব্যারাজে গঙ্গার পানির প্রবাহের ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টন করা হয়।
চুক্তিতে ৪০ বছরের গড় প্রবাহের ভিত্তিতে পানির হিসাব নির্ধারণের পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি দেওয়ার বিধান রয়েছে। চুক্তির আওতায় সংকটপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশকে ৩৫ হাজার কিউসেক পর্যন্ত পানি সরবরাহের নিশ্চয়তার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি এ চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। ফলে চুক্তি নবায়ন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে ভারতের অভ্যন্তরেও চুক্তিটি নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। বিহারের ক্ষমতাসীন জনতা দল (ইউনাইটেড)—জেডিইউয়ের রাজ্যসভার সংসদ সদস্য সঞ্জয় ঝা গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন না করার দাবি তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, চুক্তির কারণে বিহারের স্বার্থ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যের পানিসম্পদমন্ত্রী বিজয় কুমারও দাবি করেছেন, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিতে বিহারের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য, চুক্তি নবায়নের সময় রাজ্যটির উদ্বেগ বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বিজয় কুমারের দাবি, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর চুক্তি নবায়নের সময় বিহারের উদ্বেগ বিবেচনায় নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
অন্যদিকে ঢাকা চুক্তিটি নবায়নের বিষয়ে আশাবাদী। গত ৯ জুলাই এক ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ভারত গঙ্গা চুক্তির গুরুত্ব এবং গঙ্গার পানির গুরুত্ব বুঝতে পারে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই ভারত সিদ্ধান্ত নেবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
গঙ্গা চুক্তির পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে করা বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করছে সরকার। পর্যালোচনার ফল ‘অনতিবিলম্বে’ পাওয়া যাবে বলেও তিনি জানান।
শুক্রবারের ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান জানতে চান এএনআইয়ের সাংবাদিক আয়ুষী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ জানিয়েছে যে আগের সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে সই হওয়া শতাধিক চুক্তি ও সমঝোতা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ভারত কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা পেয়েছে কি না এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু চুক্তি নিয়ে ঢাকা কোনো উদ্বেগ জানিয়েছে কি না—তা জানতে চান তিনি।
জবাবে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারতও সংবাদমাধ্যমে এ ধরনের খবর দেখেছে। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে ভারতকে কিছু জানানো হয়নি।
তিনি বলেন, “আমরাও সংবাদমাধ্যমে এ ধরনের কিছু খবর দেখেছি। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকার তরফে আমাদেরকে কিছুই জানানো হয়নি।”
ভারতের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান জয়সওয়াল।
ফলে গঙ্গা চুক্তির নবায়ন নিয়ে এখন পর্যন্ত দুই দেশের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হলো—আলোচনা অব্যাহত থাকবে এবং কারিগরি পর্যায়ে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক চলবে। তবে চুক্তি নবায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা নতুন চুক্তির সময়সূচি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ডিসেম্বরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে আলোচনার অগ্রগতি এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজ্যগুলোর উদ্বেগ কীভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।