রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রপার্টিজের আবাসন প্রকল্পে মধ্যরাতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও গুলির ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারদের মধ্যে শাহরিয়ার মাহমুদকে মামলার প্রধান আসামি ও হামলার কথিত মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে শনাক্ত করেছে পুলিশ। তবে হামলার প্রকৃত কারণ নিয়ে তদন্ত এখনও চলছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, জমির দখল-বেদখলকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরেই সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটেছে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে দক্ষিণ মানিকদীর ওই আবাসন প্রকল্পে হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিও, নিউ গিনি প্রপার্টিজের অফিসসহ প্রকল্পের একাধিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রোববার দুপুরে ঘটনাস্থল ঘুরে বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুরের চিহ্ন, মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা কাচের টুকরা, গুলির খোসা, তছনছ আসবাব ও নির্মাণসামগ্রী দেখা গেছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, হামলাকারীরা কয়েকটি পিকআপে করে দলবদ্ধভাবে সেখানে প্রবেশ করে। তাদের অনেকে মুখে মাস্ক পরা ছিল। প্রথমে প্রকল্পের ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকে বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। কয়েকজন শ্রমিক ও নিরাপত্তাকর্মীকেও মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, তাঁদের কক্ষ থেকে টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতেও ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। স্টুডিওর কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যামেরা, লেন্স, লাইট, সফটবক্স ও সিসিটিভি সরঞ্জামসহ বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ভেঙে ফেলা হয়েছে আসবাব ও কনটেন্ট তৈরির সরঞ্জাম। সিসিটিভি ক্যামেরার তারও কেটে দেওয়া হয়েছে।
স্টুডিওর কর্মী ইলার ভাষ্য, হামলার সময় ভেতরে থাকা দুজন কর্মী প্রথমে পাশের নির্মাণকাজের শব্দ মনে করেছিলেন। পরে হামলাকারীদের উপস্থিতি টের পেয়ে তাঁরা ওয়াশরুমে আশ্রয় নেন। পরে তাঁদের মোবাইল ফোনও নিয়ে যাওয়া হয়। তবে হামলার কারণ সম্পর্কে তাঁরা কিছু জানেন না বলে জানান তিনি।
প্রকল্পের এক নির্মাণশ্রমিক নয়ন বলেন, হামলাকারীদের কয়েকজনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, রামদা, লাঠি ও চাপাতি ছিল। তাঁর দাবি, শ্রমিকদের কক্ষ থেকে বের করে কয়েকজনকে মারধর করা হয়। পরে তাঁদের টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া হয়। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এখনও হয়নি।
নিউ গিনি প্রপার্টিজের মালিক মো. নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া অভিযোগ করেছেন, জমি দখল ও চাঁদা দাবির উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ একটি চক্র হামলা চালিয়েছে। তাঁর দাবি, গত এক মাসে বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছে এক কোটি, ৫০ লাখ ও দুই কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হয়েছে। তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। চাঁদাবাজির সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও করেন তিনি। এসব অভিযোগের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
জমি নিয়ে বিরোধের কথাও স্বীকার করেছেন নাজিম উদ্দিন। তাঁর দাবি, সাবেক এক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ওই কর্মকর্তার কাছ থেকে ১০ কাঠা জমি কেনার পর পাশের আরও জমি উন্নয়ন করা হলেও পরবর্তী সময়ে ওই জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। তবে ওই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশের বক্তব্য অবশ্য চাঁদাবাজির অভিযোগের সঙ্গে এখনো একমত নয়। ডিএমপির কর্মকর্তারা বলেছেন, একটি পক্ষ তাদের জমিতে যেতে পারছিল না। ওই পক্ষের লোকজন দলবদ্ধভাবে সেখানে যাওয়ার পর দুই পক্ষের বিরোধের মধ্যে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওসহ প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মো. মাহিদুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে তাঁদের কাছে মনে হয়েছে, হাউজিং ব্যবসা ও জমির দখল-বেদখলকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরেই লোকজন দলবদ্ধ হয়ে সেখানে যেতে পারে। তবে বিবাদমান পক্ষ কারা এবং হামলার সুনির্দিষ্ট কারণ কী, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বলা সম্ভব নয়। সালমান মুক্তাদিরের কাছে চাঁদা দাবির কোনো তথ্যও পুলিশের কাছে নেই বলে তিনি জানান।
এ ঘটনায় নিউ গিনি প্রপার্টিজের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেছেন। মামলায় সাবেক মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ১৩ জনের নাম রয়েছে বলে পুলিশ ও মামলাসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে জানা গেছে। অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় এ পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে শাহরিয়ার মাহমুদকে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মো. মামুন, আসলাম ও মুন্নাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এবং ঘটনাস্থলের আলামত বিশ্লেষণ করে হামলার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সালমান মুক্তাদিরকে পুলিশ মামলার বাদী হিসেবে বিবেচনা করছে না। পুলিশের ভাষ্য, তিনি ওই প্রকল্পের ভাড়াটিয়া হিসেবে হামলার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মূল বিরোধের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় তাঁর স্টুডিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করছে পুলিশ।
ঘটনাটি নিয়ে মালিকপক্ষের চাঁদাবাজি ও জমি দখলের অভিযোগ এবং পুলিশের জমি-সংক্রান্ত বিরোধের প্রাথমিক ধারণার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। হামলার পেছনে কারা ছিল, তাদের উদ্দেশ্য কী এবং লুটপাটের সঙ্গে জমি বিরোধের সম্পর্ক কতটা—তদন্ত শেষ হলে এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শু