ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের ধাপ ও ভোটের সম্ভাব্য দিনক্ষণ চূড়ান্ত করতে আজ সোমবার বৈঠকে বসছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সকাল সাড়ে ১০টায় নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে এ বৈঠক হওয়ার কথা। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয় বলে উদ্বেগ জানিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। বাহিনীকে প্রস্তুতির জন্য সময় দিয়ে তফসিল ঘোষণার সুপারিশ করেছে কমিটি।
ইসি সূত্র জানায়, কমিশনের বৈঠকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা হবে। সভায় চার নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ, জাতীয় পরিচয়পত্র ছাপার যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ও বকেয়া বিল, নতুন চুক্তি এবং জাতীয় নির্বাচন পদক নীতিমালা-২০২৫-এর খসড়াও আলোচ্যসূচিতে রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ গত বৃহস্পতিবার জানান, সোমবারের কমিশন সভায় ইউপি নির্বাচন কয় ধাপে হবে এবং কোন ধাপে কখন ভোট হবে, তা চূড়ান্ত করে জানানো হবে। তাঁর ভাষ্য, কমিশন কেন্দ্রীয়ভাবে তফসিল ঘোষণা করবে না; মাঠপর্যায়ে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা তফসিল ঘোষণা করবেন। কমিশন নির্বাচনের ধাপ ও সময়সীমা নির্ধারণ করে দেবে।
দেশে মোট ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ৪ হাজার ২৭২টিতে নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে এর আগে জানিয়েছিল ইসি। কমিশনের প্রাথমিক পরিকল্পনায় সাত ধাপে ভোট নেওয়ার কথা ছিল। সে অনুযায়ী, প্রথম ধাপের সম্ভাব্য তারিখ ছিল ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপ ২০২৭ সালের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপ ২৭ মে।
তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা ও অন্যান্য কর্মসূচির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভোট না করার পরামর্শ আসে সরকারের পক্ষ থেকে। পরে আন্তমন্ত্রণালয় আলোচনায় আগামী বছরের ৬ জুনের মধ্যে ইউপি নির্বাচন শেষ করার বিষয়ে ঐকমত্য হয়। নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার এর আগে জানিয়েছিলেন, জানুয়ারিতে ইউপি নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে আগের প্রস্তাবিত তারিখগুলো চূড়ান্ত সূচি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। আজকের বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
এর মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নিরাপত্তা প্রস্তুতির প্রশ্ন সামনে এসেছে। গত রোববার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। কমিটির সভাপতি এ কে এম সেলিম রেজা হাবিব বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় বেশি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের নির্বাচন পরিচালনার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে প্রস্তুতি প্রয়োজন, তা এখনো পুরোপুরি নেই বলে তিনি মনে করেন।
কমিটির সভাপতি জানান, সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তবে নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রস্তুতির জন্য সময় দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তাঁর আশা, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে আগামী বছরের প্রথম দিকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় নির্বাচনে সংঘাতের ঝুঁকি বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত স্বার্থ, স্থানীয় প্রভাব বিস্তার এবং কর্মী-সমর্থকদের সক্রিয় উপস্থিতির কথা তুলে ধরেন তিনি। ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে একাধিক প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং প্রতিটি কেন্দ্রে প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতির কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাড়তি প্রস্তুতি প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন চলমান প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়। কমিটির সদস্যরা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে নেওয়া অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের সুপারিশ করেন। জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় ও বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কিছু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের কাজ করার কথা জানানো হয়।
এ ছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা অভিযান তদারক ও জনসচেতনতা বাড়ানো, গ্রামীণ সড়কের গুণগত মান নিশ্চিত করতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে তিন বছরের ওয়ারেন্টির বিপরীতে জামানত নেওয়া, উপজেলা পর্যায়ে অনলাইনভিত্তিক হাজিরা চালু এবং আর্সেনিকপ্রবণ এলাকায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন না হওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদের পাশাপাশি সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন নিয়েও আলোচনা চলছে। ইসি জানিয়েছে, ইউপি নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণের পর স্থানীয় সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আয়োজনের বিষয়েও পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।