ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বজবজের ২৪ বছর বয়সী এক যুবকের হার্নিয়ার অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে তাঁর দেহে জরায়ু ও ডিম্বনালির সন্ধান পেয়েছেন চিকিৎসকেরা। অস্ত্রোপচারের সময় অপ্রত্যাশিত এই শারীরিক গঠন ধরা পড়ার পর যুবকের প্রকৃত জৈবিক বৈশিষ্ট্য ও প্রজনন অঙ্গের গঠন সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ক্রোমোজোম পরীক্ষা করার কথা ভাবছেন চিকিৎসকেরা।
গত সোমবার হার্নিয়ার চিকিৎসার জন্য ডায়মন্ড হারবার এলাকার একটি নার্সিংহোমে ভর্তি হন ওই যুবক। পরদিন তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকেরা দেখতে পান, তাঁর দেহে জরায়ু ও ডিম্বনালি রয়েছে। বিষয়টি তাঁদের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এইচ জামান। তিনি বলেন, রোগীকে পুরুষ হিসেবেই ভর্তি করা হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর দেহে জরায়ু ও ডিম্বনালি দেখতে পান চিকিৎসকেরা। এমন পরিস্থিতির জন্য তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন না।
চিকিৎসকদের মতে, এ ধরনের শারীরিক গঠন যৌনবিকাশের ভিন্নতা বা ‘ডিফারেন্সেস অব সেক্স ডেভেলপমেন্ট’ (ডিএসডি) নামের বিভিন্ন অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে শুধু অভ্যন্তরীণ প্রজনন অঙ্গ দেখে কারও ক্রোমোজোমগত বৈশিষ্ট্য বা সামগ্রিক যৌনবিকাশ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন জরুরি।
কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের চিকিৎসক সৌভিক চট্টোপাধ্যায় জানান, হরমোনের কার্যকারিতা, ভ্রূণাবস্থায় যৌনবিকাশের প্রক্রিয়া এবং অভ্যন্তরীণ ও বহির্গত যৌনাঙ্গের গঠনের মধ্যে পার্থক্যের কারণে এমন অবস্থা দেখা দিতে পারে। বাহ্যিকভাবে পুরুষালি বৈশিষ্ট্য থাকলেই কারও ক্রোমোজোমগত বৈশিষ্ট্য বা প্রজনন অঙ্গের গঠন প্রচলিত ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাবে, এমন নয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের অবস্থার একটি সম্ভাব্য কারণ হলো ‘পারসিস্টেন্ট ম্যুলেরিয়ান ডাক্ট সিনড্রোম’ (পিএমডিএস)। ভ্রূণের বিকাশের সময় সাধারণত পুরুষ প্রজননব্যবস্থা গঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অণ্ডকোষ থেকে অ্যান্টি-মুলেরিয়ান হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোনের প্রভাবে ভ্রূণের ম্যুলেরিয়ান নালি বিলুপ্ত হয়। প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিকভাবে না ঘটলে ওই নালি থেকে জরায়ু ও ডিম্বনালির মতো অভ্যন্তরীণ প্রজনন অঙ্গ থেকে যেতে পারে।
চিত্তরঞ্জন সেবা সদনের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ আশিস মুখোপাধ্যায় বলেন, ওই যুবকের ক্ষেত্রে ঠিক কী ঘটেছে, তা জানতে ক্রোমোজোম বিশ্লেষণসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে হবে। পরীক্ষার ফল ও অন্যান্য শারীরিক বৈশিষ্ট্য মূল্যায়ন করেই সম্ভাব্য অবস্থাটি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।
চিকিৎসকদের বক্তব্য, যৌনবিকাশের ভিন্নতা-সম্পর্কিত কিছু অবস্থা অত্যন্ত বিরল এবং অনেক সময় অন্য কোনো সমস্যার চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের সময় তা প্রথম ধরা পড়ে। তবে এই যুবকের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন অবস্থা রয়েছে, তা পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
এ ধরনের রোগীর চিকিৎসায় শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি মানসিক ও সামাজিক দিকও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন চিকিৎসকেরা। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে প্রায় ১৮ বছর আগে একই ধরনের একটি ঘটনা দেখেছিলেন বলে জানিয়েছেন বর্তমানে এনআরএস মেডিক্যাল কলেজের সার্জারি বিভাগের প্রধান উৎপল দে। তাঁর ভাষ্য, হার্নিয়ার অস্ত্রোপচারের সময় এক রোগীর দেহেও ডিম্বনালি পাওয়া গিয়েছিল।
উৎপল দে বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রথমে রোগীর সঙ্গে আলোচনা ও কাউন্সেলিং করা প্রয়োজন। রোগী নিজের পরিচয় সম্পর্কে কীভাবে ভাবেন, তাঁর পছন্দ ও মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে চিকিৎসার পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা উচিত।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এ ধরনের ঘটনা বুঝতে ক্রোমোজোম, হরমোন, অভ্যন্তরীণ প্রজনন অঙ্গ এবং বহির্গত যৌনাঙ্গের গঠন—সব দিকই বিবেচনায় নিতে হয়। তাই বজবজের ওই যুবকের ক্ষেত্রেও পরীক্ষার ফল পাওয়ার পরই তাঁর শারীরিক অবস্থার বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।