কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর জানিয়েছে, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র ছিল না। গত জুনে পরিদর্শনের পর প্রতিষ্ঠানটিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ উল্লেখ করে সতর্কতামূলক নোটিশও দেওয়া হয়েছিল। তবে এরপরও রিসোর্টটির কার্যক্রম চলছিল।
শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার তিনতলা কাঠের রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার চেষ্টায় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস। বেলা সোয়া দুইটা পর্যন্ত রিসোর্টটি থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
শনিবার ফায়ার সার্ভিসের সংবাদ সম্মেলনে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ বলেন, গত জুনে পরিদর্শনের পর রিসোর্টটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। প্রয়োজনীয় সনদ না থাকা এবং সতর্ক করার পরও কার্যক্রম চালু রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে রিসোর্টটি চালাচ্ছিল না।’
দুর্গাপূজা উপলক্ষে অগ্নিনিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রিসোর্টটির অগ্নিকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এসব কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটির নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ, যেখানে খাবার তৈরি করা হতো। দোতলা ও তিনতলায় ছিল পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা। ফায়ার সার্ভিসের তদারকির আওতায় প্রয়োজনীয় সনদও ছিল না প্রতিষ্ঠানটির।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, শনিবার সকালে আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম শুরু করেন। নিকটতম ফায়ার স্টেশন থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্ব ছিল প্রায় ২২ কিলোমিটার। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আগুন পুরোপুরি নেভানো হয়। তবে উদ্ধার অভিযান চলাকালে আরও মরদেহ থাকার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ
অনুমোদনহীন রিসোর্ট নিয়ে উদ্বেগ
কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় কাঠ ও অন্যান্য দাহ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি রিসোর্টগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে নোটিশ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে নিরাপত্তাবিষয়ক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
শুষ্ক মৌসুমে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়তে পারে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান সুলতানুল আফরীন। তবে টুপটুপ রিসোর্টে আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, তা তদন্তের আগে বলা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি। তাঁর কথায়, অনুমানের ভিত্তিতে আগুনের কারণ নির্ধারণ করা সঠিক হবে না; পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের পরই বিষয়টি জানা যাবে। ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান চালু থাকা এবং এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ফায়ার সার্ভিসের করণীয় পর্যালোচনা করা হবে বলেও জানান মহাপরিচালক। বিদ্যমান আইন ও নজরদারির সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন তিনি। পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অগ্নিনির্বাপণের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরু রাস্তা ও ভবনগুলোর মধ্যে পর্যাপ্ত দূরত্ব না থাকায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও সরঞ্জাম নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়। নতুন ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের ক্ষেত্রে বিধিবিধান ও বিল্ডিং কোড মেনে চলার ওপর জোর দেন তিনি। পুরোনো স্থাপনায় একসঙ্গে সব নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা কঠিন হলেও নতুন নির্মাণে নিয়ম মানার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে বলে জানান।
অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা বাড়াতে বিকল্প ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক। ঘনবসতিপূর্ণ ও সরু রাস্তার এলাকায় দ্রুত পৌঁছানোর জন্য বিশেষ তিন চাকার যান ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি মোটরসাইকেলে হোস পাইপ নিয়ে গিয়ে আশপাশের ভবনের পানির রিজার্ভারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে আগুন নেভানো যায় কি না, তা নিয়েও ভাবা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
সমুদ্রের পাশে হওয়ায় বাতাসে দ্রুত ছড়ায় আগুন, নেভানোর কিছুই ছিল না রিসোর্টে
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চট্টগ্রাম বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, আজ সকাল ৭টা ২৩ মিনিটে কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসে আগুনের খবর দেওয়া হয়। সকাল আটটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ৮টা ১৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। চারজন ব্যক্তি মারা গেছেন তিনতলার দুটি শৌচাগারে। তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সমুদ্রের তীব্র বাতাসে কাঠের রিসোর্টে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের স্থাপনায় বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা দরকার। কিন্তু রিসোর্টটিতে এগুলোর কিছুই ছিল না। ফায়ার লাইসেন্সও ছিল না। মাত্র সাত-আট মাস আগে রিসোর্টটি তৈরি হয়েছিল। জায়গাটির মালিকানা নিয়েও দ্বন্দ্ব ছিল বলে জানান তিনি।
দোতলা থেকে লাফিয়ে বাঁচলেন আশিকুল
পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ছুটি কাটাতে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন মো. আশিকুল ইসলাম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা, স্ত্রীর ছোট বোন লায়লা জাহান নাবিলাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। রিসোর্টে আগুন লাগার পর দোতলা থেকে লাফিয়ে প্রাণে বাঁচেন আশিকুল। তবে তাঁর স্ত্রীসহ একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। আশিকুলের ছোট ভাই নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমার ভাই বেঁচে আছে। সে দুইতলা থেকে লাফ দিয়েছে। আমার ভাবিসহ ভাবির পরিবারের ছয়জন মারা গেছে।’ ভাইয়ের কাছে যাওয়ার জন্য তিনি কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথাও জানান।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল নিহত ছয়জনের পরিচয় নিশ্চিত করেন। তাঁরা হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ। নিহত বাকি চারজনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ ছয়জন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁরা হলেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র কর্মকর্তা দোলন আচার্য ঘটনাস্থল থেকে সাতটি লাশ পাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানিয়েছে, ওই রিসোর্টে মোট ১৭ পর্যটক ছিলেন। নিহত ব্যক্তিরা পর্যটক বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তাদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেন, ‘অনেকে নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঠিক কতজন পর্যটক মারা গেছেন, তা জানতে একটু সময় লাগবে।’