গণতান্ত্রিক পরিবেশে বাকস্বাধীনতা অবারিত হলেও তা যেন শালীনতার সীমা অতিক্রম করে গালাগালির সংস্কৃতিতে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করে ভিন্নমত যেন পারস্পরিক শত্রুতায় রূপ না নেয়, সে বিষয়েও দলমত–নির্বিশেষে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে এসেছে এবং মানুষ স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে। তবে এই স্বাধীনতার ব্যবহার এমন পর্যায়ে যাওয়া উচিত নয়, যাতে তা অশালীন ভাষা ও গালাগালির সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।
রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা বা মতের অমিলকে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষায় প্রকাশ করা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর। সরকারি ও বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক শক্তিকে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন, পারিবারিক পরিবেশে যে ধরনের শব্দ ব্যবহার করতে মানুষ সাধারণত স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না, জনপরিসর কিংবা জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সেসব শব্দ কেন ব্যবহার করা হবে। তাঁর এই বক্তব্যের সময় সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান।
সমাপনী বক্তব্যে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ ও পারস্পরিক বিরোধ নিয়েও সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, নিজেদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হলে এর সুযোগ নিতে পারে সেই শক্তি, যাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিভেদ ও বিরোধের কারণে বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী শক্তি যাতে আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ না পায়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শহীদদের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, রাষ্ট্র মেরামতের কাজ এগিয়ে নিতে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। পারস্পরিক মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্বার্থে সহযোগিতার পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জাতীয় সংসদকে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। জনগণের সমস্যা, প্রত্যাশা ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সংসদে কার্যকর আলোচনা এবং সেসব সমস্যা সমাধানে সংসদ সদস্যদের ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি। একই সঙ্গে অধিবেশনে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার জন্য সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ধন্যবাদ জানান।
সমাপনী বক্তব্যে দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি দেশের দুটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালের একটিতে দুর্ঘটনার কারণে সেটি অকার্যকর হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
জ্বালানি সংকট নিয়ে বিরোধী দলের লংমার্চের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গাড়িবহর নিয়ে লংমার্চ করলেই যদি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হতো, তাহলে সরকারই সবার আগে এমন কর্মসূচির আয়োজন করত। সংকট মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও জানান তিনি।
ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা কমাতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় উৎসের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অর্থনীতির পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগের সরকারের দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থ পাচার এবং ঋণের বোঝা বর্তমান সরকারকে উত্তরাধিকারসূত্রে নিতে হয়েছে। এসব কারণে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতে সরকারকে একদিকে উন্নয়ন ও জনসেবা অব্যাহত রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে পুরোনো ঋণের দায় পরিশোধ করতে হচ্ছে।
বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ গত পাঁচ মাসে ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ ডলার পরিশোধ করা হয়েছে বলে দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে বলেও সংসদে জানান তিনি।
গত ২৭ আগস্ট ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয়। প্রায় দুই সপ্তাহের কার্যক্রম শেষে বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতির আদেশ পড়ে শোনানোর মধ্য দিয়ে অধিবেশনটি শেষ হয়। সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা, সংসদকে কার্যকর করা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দায়িত্বশীলতা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেন।