কক্সবাজারে ফুটবল ঘিরে দর্শকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়লেও সেই তুলনায় নেই পর্যাপ্ত অবকাঠামো। জেলার বড় ফুটবল ম্যাচগুলোতে ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি দর্শক মাঠে হাজির হওয়ায় তৈরি হচ্ছে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার ঝুঁকি। এমন পরিস্থিতিতে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে ২০ থেকে ৫০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি আধুনিক ফুটবল স্টেডিয়াম নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ক্রীড়ামোদী, সাবেক খেলোয়াড় ও ফুটবলপ্রেমীরা।
কক্সবাজারের প্রধান ক্রীড়া ভেন্যু বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা বর্তমানে আনুমানিক ৩ থেকে ৫ হাজার। অথচ বড় কোনো ফুটবল টুর্নামেন্টের ম্যাচ হলেই স্টেডিয়ামের গ্যালারি পূর্ণ হওয়ার পরও বিপুলসংখ্যক দর্শক মাঠে হাজির হন। জায়গা না পেয়ে অনেকে স্টেডিয়ামের বাইরে, সীমানার কাছাকাছি কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে খেলা দেখেন।
সম্প্রতি কক্সবাজার জেলা খেলোয়াড় সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত আন্তঃউপজেলা ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালে এর তীব্রতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত ৮ সেপ্টেম্বর রামু উপজেলা ও চকরিয়া উপজেলার মধ্যকার ফাইনাল ম্যাচকে ঘিরে সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শকেরা স্টেডিয়ামে আসতে শুরু করেন। ম্যাচ শুরুর আগেই গ্যালারি পূর্ণ হয়ে যায়। পরে স্টেডিয়াম এলাকায় কয়েক গুণ বেশি দর্শকের উপস্থিতিতে সৃষ্টি হয় ব্যাপক ভিড়।

আয়োজকদের হিসাব অনুযায়ী, স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা যেখানে প্রায় ৫ হাজার, সেখানে ফাইনাল ম্যাচ ঘিরে প্রায় ২৫ হাজার দর্শক উপস্থিত হন। গ্যালারিতে জায়গা না পেয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ মাঠের সীমানার কাছাকাছি ও স্টেডিয়ামের বাইরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন।
দর্শকের এই চাপ একপর্যায়ে শুধু ভিড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অতিরিক্ত দর্শকের সুযোগ নিয়ে টিকিটের অতিরিক্ত মূল্য আদায় ও কালোবাজারির অভিযোগও ওঠে। অনেক দর্শক টিকিটের জন্য ভোগান্তিতে পড়েন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন সংবাদকর্মীরা। পেশাদার সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহ ও সরাসরি খেলা কাভারের জন্য নির্ধারিত প্রেস গ্যালারিতেও ছিল অতিরিক্ত ভিড়। সাংবাদিকদের জন্য সংরক্ষিত জায়গায় রাজনৈতিক নেতা, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও সাধারণ দর্শকের অবস্থানের কারণে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন কর্মরত সংবাদকর্মীরা।
স্থানীয় ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, বড় ম্যাচে বিপুল দর্শক উপস্থিতির বিষয়টি নতুন নয়। আগের বিভিন্ন টুর্নামেন্টেও দর্শকের চাপ সামলাতে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু এসব অভিজ্ঞতার পরও বড় ম্যাচগুলোতে দর্শক নিয়ন্ত্রণ, টিকিট ব্যবস্থাপনা এবং প্রেস গ্যালারির নিরাপত্তায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এর আগে জেলা ক্রীড়া সংস্থার আয়োজনে অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচও অতিরিক্ত দর্শকের চাপ ও অব্যবস্থাপনার কারণে পণ্ড হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় ক্রীড়ামোদীদের মতে, সেই ঘটনার পরও স্থায়ীভাবে দর্শক ব্যবস্থাপনা ও স্টেডিয়াম অবকাঠামোর উন্নয়ন করা হয়নি।
ফুটবলপ্রেমীদের মতে, এসব ঘটনা একটি বিষয়ই স্পষ্ট করে—কক্সবাজারে ফুটবলের দর্শক আছে, কিন্তু দর্শক ধারণ করার মতো আধুনিক অবকাঠামো নেই।
কক্সবাজারে ফুটবলের জনপ্রিয়তা শুধু স্থানীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে নিয়মিত ফুটবল দল ও খেলোয়াড়েরা প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। বড় ম্যাচে দর্শকের বিপুল উপস্থিতি স্থানীয় ফুটবলের প্রতি মানুষের আগ্রহেরও প্রমাণ দিচ্ছে।
সাবেক খেলোয়াড় ও ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক মানের একটি আধুনিক ফুটবল স্টেডিয়াম নির্মাণ করা গেলে জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় খেলোয়াড়দের নিয়মিত উচ্চমানের প্রতিযোগিতায় খেলার সুযোগ বাড়বে এবং ফুটবল অবকাঠামোর উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
তাদের মতে, কক্সবাজারের ভৌগোলিক অবস্থান ও পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে স্টেডিয়ামকে শুধু খেলাধুলার ভেন্যু হিসেবে নয়, ক্রীড়া পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলা সম্ভব। বড় ফুটবল ম্যাচ, আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট কিংবা অন্যান্য ক্রীড়া আয়োজন হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দর্শক ও পর্যটকেরা কক্সবাজারে আসবেন। এতে স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহনসহ পর্যটননির্ভর ব্যবসাগুলোও উপকৃত হতে পারে।
স্থানীয় ফুটবলপ্রেমীদের ভাষ্য, একটি বড় স্টেডিয়াম নির্মাণের দাবি কেবল দর্শকের বসার জায়গা বাড়ানোর দাবি নয়; এটি কক্সবাজারের ক্রীড়া সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর দাবি। বর্তমান স্টেডিয়ামের সীমিত ধারণক্ষমতার কারণে বড় ম্যাচ আয়োজনের সময় যে ঝুঁকি তৈরি হয়, আধুনিক স্টেডিয়াম হলে তা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
কক্সবাজারের ক্রীড়া উন্নয়ন এবং ফুটবলপ্রেমীদের ব্যাপক আগ্রহ বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত আধুনিক ও বড় ধারণক্ষমতার ফুটবল স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জেলার ক্রীড়ামোদীরা। এ জন্য বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে), যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ চান তাঁরা।
তাঁদের প্রত্যাশা, পর্যটন নগরী কক্সবাজারে ফুটবলের যে দর্শকজোয়ার তৈরি হয়েছে, তা যেন আর অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতায় আটকে না থাকে। বরং এই বিপুল দর্শক আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে কক্সবাজারকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল ও ক্রীড়া পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।