কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধবিহার ও বসতিতে সাম্প্রদায়িক হামলার ১৪ বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১২ সালের ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বরের ওই সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর বিচার এখনো শেষ হয়নি। আগুনে পুড়ে যাওয়া বৌদ্ধবিহার ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর অনেকগুলো সরকারি উদ্যোগে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। ফিরেছে উপাসনালয়ের অবকাঠামো, স্বাভাবিক হয়েছে অনেক দৈনন্দিন কার্যক্রম। কিন্তু হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা, সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা এবং ভুক্তভোগীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে উদ্বেগ কাটেনি।
দীর্ঘ ১৪ বছরেও বিচার শেষ না হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে হতাশা রয়েছে। মামলাগুলোর দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ হিসেবে সাক্ষীদের আদালতে অনুপস্থিতির কথা বলছে রাষ্ট্রপক্ষ। তবে সাক্ষীদের অনুপস্থিতির পেছনে কী কারণ রয়েছে, মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা কী এবং বিচার শেষ করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগসংবলিত একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর রামুতে উত্তেজনা তৈরি হয়। ছবিটি স্থানীয় বৌদ্ধ যুবক উত্তম কুমার বড়ুয়ার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত হয়েছে বলে প্রচার করা হয়েছিল। অভিযোগটি যাচাই না করেই গুজব ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ও বসতিতে হামলা চালানো হয়।
পরে ওই ছবির সত্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। ছবিটি সম্পাদনা করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো একটি যাচাইহীন তথ্য কীভাবে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সূত্রপাত ঘটাতে পারে, রামুর ঘটনা তার একটি দৃষ্টান্ত।
২৯ সেপ্টেম্বর রাতে রামুতে শুরু হওয়া সহিংসতা পরদিন উখিয়া ও টেকনাফেও ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন হিসাবে রামুতে ১২টি বৌদ্ধবিহার এবং উখিয়া ও টেকনাফে আরও সাতটি বৌদ্ধমন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। অসংখ্য বাড়িঘরে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ঐতিহ্য, উপাসনালয় ও বসতবাড়ি।
ঘটনার পর রামু, উখিয়া ও টেকনাফ থানায় পুলিশ এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে একাধিক মামলা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, মোট ১৯টি মামলা দায়ের হয়েছিল। এর মধ্যে একটি মামলা আপস-মীমাংসায় নিষ্পত্তি হওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাকি মামলাগুলোর বিচারিক অগ্রগতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য এসেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে চারটি মামলা প্রত্যাহার এবং ১৪টি মামলা বিচারাধীন থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট আদালতের নথি যাচাই ছাড়া মামলার বর্তমান সংখ্যা ও প্রতিটির অবস্থান চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
মামলাগুলোর দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ হিসেবে সাক্ষীদের অনুপস্থিতির কথা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় অনেক সাক্ষী আগের এলাকায় বসবাস করছেন না। কেউ অন্যত্র চলে গেছেন, আবার কেউ আদালতে উপস্থিত হতে অনীহা প্রকাশ করছেন। সাক্ষীদের হাজির করতে সমনসহ প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলেও তাঁদের অনুপস্থিতিতে সাক্ষ্যগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তবে সাক্ষীদের অনুপস্থিতির কারণ অনুসন্ধান করাও জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে মামলা চলা, বারবার আদালতে হাজির হওয়ার আর্থিক ও সামাজিক চাপ, সাক্ষীদের বর্তমান অবস্থান এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ—এসব বিষয় বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। কোনো সাক্ষী হুমকি বা চাপের মুখে রয়েছেন কি না, তা নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
ঘটনার সময় যাঁরা হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তাঁদের অনেকের জীবনযাত্রা পরবর্তী বছরগুলোতে বদলে গেছে। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে সাক্ষীদের খুঁজে বের করা, আদালতে হাজির করা এবং তাঁদের সাক্ষ্য গ্রহণ নিশ্চিত করা তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বিচার শেষ না হওয়ার দায় শুধু সাক্ষীদের ওপর চাপানোও যথাযথ নয়। তদন্তের মান, অভিযোগপত্রে অভিযুক্তদের শনাক্তকরণ, সমন কার্যকর করা এবং সাক্ষীদের সুরক্ষার ব্যবস্থাও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধবিহার ও ধর্মীয় স্থাপনা পুনর্নির্মাণে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়। নতুন করে নির্মিত হয় উপাসনালয় ও বিভিন্ন স্থাপনা। রামুর বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত স্থাপনাগুলোর অনেকগুলো আগের তুলনায় আরও সজ্জিত রূপ পেয়েছে। কিন্তু স্থাপনা পুনর্নির্মাণ আর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিজ্ঞতা ও মানসিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা এক বিষয় নয়।
একটি ধর্মীয় স্থাপনা পুড়ে গেলে তার দেয়াল ও ছাদ নতুন করে তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু ঐতিহাসিক নিদর্শন, পুরোনো স্মৃতি ও দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাবোধের ক্ষতি সব সময় অর্থ দিয়ে পূরণ করা যায় না। এ কারণে রামুর ঘটনায় পুনর্গঠনের পাশাপাশি ন্যায়বিচার, ক্ষতিগ্রস্তদের অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।
রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সদস্যদের কাছে বিচার শুধু অপরাধীদের শাস্তির প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তার সঙ্গেও যুক্ত। এত বছর পরও বিচারিক নিষ্পত্তি না হওয়ায় তাঁদের আস্থা ও নিরাপত্তাবোধের ওপর কী প্রভাব পড়েছে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মামলাগুলো নিয়ে বিচারিক অগ্রগতির পাশাপাশি রাজনৈতিক বিতর্কও রয়েছে। কোনো কোনো পক্ষের অভিযোগ, ঘটনার পর তদন্ত ও মামলার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করেছে এবং প্রকৃত অভিযুক্তদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল। তবে এসব অভিযোগ আদালতের নথি, তদন্তের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন। যাচাই ছাড়া কোনো অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত থাকলে কোন আইনি ভিত্তিতে এবং কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে তা হয়েছে, সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার। কারণ, মামলা প্রত্যাহার, আপস-মীমাংসা এবং আদালতের রায়ে বিচারিক নিষ্পত্তি এক বিষয় নয়। একইভাবে, মামলা বিচারাধীন থাকলেই কোনো অভিযুক্তকে অপরাধী বলা যায় না। প্রকৃত অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আইনগত অধিকার রক্ষাও বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ।
রামুর ঘটনার পর বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা, গুজব প্রতিরোধ এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। কিন্তু কোনো সহিংসতার পর শুধু শান্ত থাকার আহ্বান যথেষ্ট নয়। ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো যাচাইহীন তথ্য যাতে আর কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতার কারণ না হয়, সে জন্য দ্রুত তথ্য যাচাই, নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ, স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা এবং আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও দৃশ্যমান জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
রামুর হামলার ১৪ বছর পরও মূল প্রশ্নটি রয়ে গেছে—ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো পুনর্নির্মাণের পর বিচারপ্রক্রিয়াকে কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে কবে? মামলাগুলোর হালনাগাদ অবস্থা, সাক্ষীদের অনুপস্থিতির প্রকৃত কারণ এবং বিচার শেষ করতে রাষ্ট্রপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে আস্থা বজায় রাখার স্বার্থে মামলাগুলোর দ্রুত ও আইনসম্মত নিষ্পত্তি জরুরি। ১৪ বছর পর স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা শুধু পুনর্নির্মিত বিহার দেখা নয়; তাঁরা জানতে চান, তাঁদের ওপর সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়া কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে এবং ন্যায়বিচারের অপেক্ষা আর কত দীর্ঘ হবে।