বিরোধী ও স্বতন্ত্র এমপিদের এলাকার ইউনিয়ন বাদ পড়ায় নির্বাচন প্রভাবিত করার অভিযোগ
ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের আগে ২০৩টি সংসদীয় আসনের ইউনিয়ন পরিষদগুলোর জন্য বিশেষ বরাদ্দ দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় দেওয়া এ বরাদ্দের পরিমাণ ৫১ কোটি ১৮ লাখ টাকা। বরাদ্দের অর্থ স্থানীয় সংসদ সদস্যদের অভিপ্রায় অনুযায়ী প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ব্যয় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগামী বছরের ৩০ জুনের মধ্যে এ অর্থ খরচ করতে হবে।
বরাদ্দের তালিকা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জয়ী হওয়া বেশ কয়েকটি আসনের ইউনিয়ন পরিষদ এ বরাদ্দ পায়নি। তবে বিরোধী জোট ছেড়ে যাওয়া খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্যের সিলেট-৫ আসনের ইউনিয়নগুলো বরাদ্দ পেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইউপি নির্বাচনের আগে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের পছন্দের প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিয়ে নির্বাচন প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে।
বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে সরকারি দলের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করতেই এ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বরাদ্দের ধরন ও উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নটি বিবেচনা করা হবে।
ইউনিয়ন পরিষদ উন্নয়ন সহায়তার অংশ হিসেবে ২০০৬ সাল থেকে সরাসরি ও শর্তহীন থোক বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এর ২৫ শতাংশ সব ইউনিয়ন পরিষদকে সমহারে দেওয়া হয়। বাকি অর্থ বরাদ্দ করা হয় ইউনিয়ন পরিষদের কাজের দক্ষতার ভিত্তিতে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে ইউনিয়ন পরিষদ উন্নয়ন সহায়তা খাতে এক হাজার ৮২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ অনুদান উপখাতে রাখা হয়েছে ২৭৯ কোটি টাকা। এ অর্থ থেকে গত ১৩ অক্টোবর ২০৩টি সংসদীয় আসনের তিন হাজার ১৫৯টি ইউনিয়ন পরিষদের জন্য ৫১ কোটি ১৮ লাখ টাকা মঞ্জুর করা হয়।
এর আগে গত ১২ আগস্ট সারা দেশের চার হাজার ৫৮৮টি ইউনিয়ন পরিষদের জন্য ১৮০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ওই বরাদ্দে সংসদ সদস্যদের অভিপ্রায় অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ ছিল না। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের জিও অনুযায়ী প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য তিন থেকে ছয় লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ১৩ অক্টোবরের বরাদ্দ আদেশে বলা হয়েছে, স্থানীয় সংসদ সদস্যের অভিপ্রায় অনুযায়ী প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য দেড় লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ফলে একটি সংসদীয় আসনের অধীন একাধিক ইউনিয়নের জন্য বরাদ্দের অর্থ মিলিয়ে সংসদ সদস্যদের পছন্দের প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বরাদ্দ মঞ্জুরির চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, আগামী বছরের ৩০ জুনের মধ্যে অর্থ ব্যয় করতে না পারলে তা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হবে।
এমন সময় এ বরাদ্দ দেওয়া হলো, যখন আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। গত ১২ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ পাঁচ ধাপে নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করেন। সে অনুযায়ী, আগামী ২১ জানুয়ারি নির্বাচন শুরু হয়ে ২৭ মে পঞ্চম ধাপের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার কথা। তবে এখনো নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হয়নি।
নির্বাচনের সময়ের সঙ্গে বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ের সময়সীমা মিলে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, এ অর্থ দিয়ে ভোটের আগে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ নিয়ে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করা হবে কি না।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “বিষয়টিকে যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, এটা নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্যই করা হয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে শুধু সরকারি দলের এমপিদের এভাবে বরাদ্দ দেওয়া অগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমূলক।” তিনি আরও বলেন, “আগেও আমরা দেখেছি, সরকারি দলের এমপিদের এভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেই অর্থ ব্যবহারে দুর্নীতি হয়েছে; অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। সরকারি দল এবারও ক্ষমতার অপব্যবহার করে এটা করেছে।”
বরাদ্দ অনুমোদনের নথি অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব (ইউনিয়ন শাখা) আতিকুল ইসলামের স্বাক্ষরে গত ১৩ অক্টোবর আদেশটি জারি করা হয়। বৃহস্পতিবার তাঁর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন) ড. মনিরুল ইসলাম বলেন, “এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। যেদিন বরাদ্দ হয়েছে, সেদিন আমি দায়িত্বে ছিলাম না।”
আতিকুল ইসলামের স্বাক্ষর করা বরাদ্দপত্রে স্থানীয় সরকার বিভাগের চিফ অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসারকে অর্থ ছাড়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদেশের শিরোনামে বলা হয়েছে, “চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ইউনিয়ন পরিষদ উন্নয়ন সহায়তা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ হতে মাননীয় মন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড়করণ।” তবে এ বিষয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “বিষয়টি যদি সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অংশ হিসেবে নির্বাচিত কিছুসংখ্যক মানুষের জন্য বরাদ্দ হয়, তাহলে সেটি হবে সরকারি উন্নয়নমূলক কাজ। সেটিতে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার হবে না বলে নির্বাচন কমিশন মনে করে।” তবে তিনি বলেন, “এটি যদি বিশেষ উদ্দেশ্যে একটি ইউনিয়নের সব মানুষের জন্য বরাদ্দ হয়, তাহলে সেটাতে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকে বলে মনে করা হয়। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন অবশ্যই যথাযথ পদক্ষেপ নেবে এবং এই বরাদ্দ বন্ধ রাখতে বলবে।” বিষয়টি তদন্ত করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
বরাদ্দের তালিকায় বিভিন্ন এলাকার রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বৈষম্যের অভিযোগও সামনে এসেছে। ময়মনসিংহ জেলার ১১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে আটটিতে বিএনপি জয়ী হয়েছে। ময়মনসিংহ-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং ময়মনসিংহ-২ ও ময়মনসিংহ-৬ আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থীরা জয়ী হন। বরাদ্দের তালিকায় এই তিন আসনের ইউনিয়নগুলো বাদ পড়েছে।
ময়মনসিংহ-৬ আসনের সংসদ সদস্য কামরুল হাসান মিলন বলেন, “বরাদ্দের টাকা জনগণের ট্যাক্সের পয়সা। কিন্তু সরকার যেভাবে শুধু দলীয় এমপিদের বরাদ্দ দিয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে বিএনপির টাকা।”
রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও কুড়িগ্রামের ১৯টি আসনের মধ্যে একটি ছাড়া বাকি আসনগুলোতে জামায়াত ও এনসিপির প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিএনপি শুধু গাইবান্ধা-৪ আসনে জয়ী হয়েছে। ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকনের এ আসনের ইউনিয়নগুলো বিশেষ বরাদ্দ পেয়েছে।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের তিনটি উপজেলার ২২টি ইউনিয়নের জন্যও ৩৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে নথিতে দেখা গেছে। আসনটি শূন্য হওয়ার কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এ তথ্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
কুমিল্লা জেলার ১১টি আসনের আটটিতে বিএনপি জয়ী হয়েছে। বাকি আসনগুলোর একটিতে জামায়াত, একটিতে এনসিপি এবং একটিতে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রয়েছেন। বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহেরের কুমিল্লা-১১ আসন এবং এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহর কুমিল্লা-৪ আসনের ইউনিয়নগুলো বিশেষ বরাদ্দ পায়নি।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “শুরু থেকেই এই বৈষম্য করা হচ্ছে। সরকারি দলের এমপিরা বরাদ্দ পাচ্ছেন। যেসব আসনের জনগণ বিএনপিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাদের ওপর সরকার প্রতিশোধ নিচ্ছে বরাদ্দ না দিয়ে। এর চেয়ে ঘৃণ্য কাজ আর কী হতে পারে!”
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমান সংসদে বিএনপি জোটের আসন ২১৪টি এবং জামায়াত জোট, ইসলামী আন্দোলন ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের আসন ৮৫টি। বিএনপি জোটের ২১৪টি আসনের মধ্যে ১২টি শহরাঞ্চলের সিটি করপোরেশন এলাকা নিয়ে গঠিত, যেখানে ইউনিয়ন পরিষদ নেই। বাকি ২০২টি আসনে ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। এর বাইরে খেলাফত মজলিসের সিলেট-৫ আসনও বরাদ্দ পেয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “এগুলো অনৈতিক কাজ। সংবিধান ও আদালতের রায় অনুযায়ী, স্থানীয় উন্নয়নে এমপিদের ভূমিকা থাকার কথা নয়। কিন্তু যখন শুধু সরকারি দলের এমপিদের বরাদ্দ দেওয়া হয় তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য, তখন তা আরও বৈষম্যমূলক হয়ে ওঠে। এর ফল মঙ্গলজনক হবে না।”