গভর্নরের মর্যাদা মন্ত্রীর সমান করার উদ্যোগ

আজাদ প্রতিবেদন
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নীতি কাঠামো গড়ে তুলতে বড় ধরনের আইনি সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর একটি খসড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

খসড়ায় গভর্নরের পদমর্যাদা পূর্ণ মন্ত্রীর সমান করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একইসঙ্গে পরিচালনা পর্ষদে সরকারি প্রতিনিধিত্ব কমিয়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ সদস্যের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব এড়াতে তিন সদস্যের সার্চ কমিটি গঠনের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, “কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন এখন সময়ের দাবি। গভর্নরের পদমর্যাদা মন্ত্রীর সমান হলে ব্যাংকের নীতিগত স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।”

খসড়ায় বলা হয়েছে, মর্যাদা বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব, নীতি-সমন্বয় ও আর্থিক স্থিতিশীলতা কার্যক্রমে অবস্থান আরও দৃঢ় হবে।

বর্তমানে বোর্ডে তিনজন সচিবসহ মোট নয়জন সদস্য থাকলেও প্রস্তাবিত কাঠামোয় সরকারি প্রতিনিধি একজন এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞ ছয়জন রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।

এছাড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিয়োগে সাবেক অর্থমন্ত্রী, উপদেষ্টা বা বিদায়ী গভর্নরকে নেতৃত্বে রেখে একটি সার্চ কমিটি কাজ করবে। অপসারণের সিদ্ধান্ত নেবে আপিল বিভাগের বিচারপতির নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি— যাতে নির্বাহী কর্তৃপক্ষের একক সিদ্ধান্তে অপসারণ করা না যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনও বাড়ছে। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব বেতন কাঠামো ও জনবল নীতি নির্ধারণে স্বাধীনতা পাবে। মূলধন বাড়িয়ে ৩ কোটি থেকে ১০০ কোটি টাকা করার প্রস্তাবও খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি সংসদের কাছে জবাবদিহি করবে এবং সংসদীয় কমিটি তার কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করতে পারবে।

সিপিডির ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এটি কার্যকর স্বায়ত্তশাসনের পথে বড় পদক্ষেপ হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে গভর্নরের স্বাধীন মানসিকতার ওপর।”
অন্যদিকে সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী সতর্ক করে বলেন, “মর্যাদা বৃদ্ধি নয়, কার্যকারিতাই মূল বিষয়। অতিরিক্ত স্বাধীনতা যেন স্বেচ্ছাচারিতায় না গড়ায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।”

অর্থ উপদেষ্টাকে পাঠানো চিঠিতে গভর্নর আহসান মনসুর উল্লেখ করেছেন, “অতীতে সংস্কারের উদ্যোগ রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এখনই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়, কারণ অন্তর্বর্তী সরকার কাঠামোগত সংস্কারে অঙ্গীকারবদ্ধ।”

তিনি আরও বলেন, এই অধ্যাদেশ কার্যকর হলে ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার পুনরাবৃত্তি রোধ হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে প্রস্তাবিত এই সংস্কার দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। গভর্নরের পদমর্যাদা মন্ত্রীর সমান করা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি নির্ধারণে আরও স্বাধীনতা ও আত্মবিশ্বাস পাবে, যা মুদ্রানীতি ও ব্যাংক খাত সংস্কারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একইসঙ্গে, সরকারি প্রতিনিধিত্ব কমানো ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্তি সিদ্ধান্ত গ্রহণে পেশাদারিত্ব বাড়াবে। তবে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এই স্বাধীনতা যদি সঠিক জবাবদিহি কাঠামোর বাইরে যায়, তবে তা কার্যকারিতার বদলে অনিয়মের নতুন আশ্রয়স্থলও হতে পারে। ফলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন এই সংস্কারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
 

বিষয়:

এলাকার খবর

সম্পর্কিত