বাতিল আইনের দায়মুক্তি বহাল, পুরোনো পথেই বাংলাদেশ

রঞ্জন কুমার দে
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

মাত্র এক বছর আগেও শেখ হাসিনা সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সব চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি তুলেছিল বিএনপি। তারা বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী পাঁচ কোম্পানির নাম প্রকাশ করে অভিযোগ করেছিল—দেড় দশকে এই খাতকে দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা ও আত্মঘাতী ক্যাপাসিটি চার্জের কাঠামোয় পরিণত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—ক্ষমতায় গেলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সব চুক্তি ‘রিভিউ’ করা হবে। নির্বাচনি ইশতেহারেও বলা হয়েছিল, “গত দেড় দশকে সীমাহীন দুর্নীতি, অস্বচ্ছ ক্রয় প্রক্রিয়া, ব্যয়বহুল স্বল্পমেয়াদি চুক্তি, আত্মঘাতী ক্যাপাসিটি চার্জ ও অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতার ফলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ব্যয়বহুল, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অদক্ষ কাঠামোয় পরিণত হয়েছে।”

নির্মম পরিহাস হলো, ওই বিএনপিই আজ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায়। জনগণের পক্ষে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার রাজনৈতিক শক্তিও তাদের হাতে রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তারা ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের দেখানো পথেই হাঁটছে। প্রশ্ন তৈরি হয়—যে লঙ্কায় যায়, তাকেই কি রাবণ হতে হবে?

এই প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছে বহুল আলোচিত ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’, যাকে দীর্ঘদিন ধরেই মানুষ ‘দায়মুক্তি আইন’ নামে চেনে। ২০১০ সালে শেখ হাসিনার সরকার আইনটি প্রণয়ন করে। পরে কয়েক দফা এর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কার্যকর রাখা হয়। এই আইনের মাধ্যমে সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতা পায়। একই সঙ্গে এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে চ্যালেঞ্জ করার পথও কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ওপর থেকে জনস্বার্থভিত্তিক জবাবদিহির কাঠামো সরিয়ে দেওয়া হয়।

তখন বলা হয়েছিল, জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলার জন্য এই বিশেষ আইন দরকার। কিন্তু বাস্তবে ‘জরুরি ব্যবস্থা’ই পরে স্থায়ী অর্থনৈতিক কাঠামোয় পরিণত হয়। এই আইনের আওতায় শতাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়। দ্রুত ভাড়াভিত্তিক কুইক রেন্টাল, রেন্টাল এবং দীর্ঘমেয়াদি আইপিপি প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাত ধীরে ধীরে একটি বিশাল ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কে রূপ নেয়। একই আইনের আওতায় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, এলএনজি আমদানি, পাইপলাইন ও গ্যাস অবকাঠামোর প্রকল্পও অনুমোদন পায়।

এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ ছিল ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সরকারকে পরিশোধ করতেই হবে। আজ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। অথচ প্রকৃত উৎপাদন অনেক সময় ১৩ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক সক্ষমতা অলস পড়ে থাকে। কিন্তু সেই অলস সক্ষমতার জন্যও জনগণের করের টাকা থেকে বিল পরিশোধ করা হয়।

এই দায় কত বড়, তার ধারণা পাওয়া যায় সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে। শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে ৩৫ হাজার ১৮৭ কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে। আগের অর্থবছরে ছিল প্রায় ২৭ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ। গত এক দশকে ক্যাপাসিটি চার্জের পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। একই সঙ্গে গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড ভর্তুকি দিতে হয়েছে। অথচ বিস্ময়করভাবে, বিপুল ভর্তুকি ও সংকটের মধ্যেও বিতরণ কোম্পানিগুলো মুনাফা করে যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, সংকটের দায় কেন কেবল জনগণই বহন করবে?

এই অবস্থার মধ্যেই ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে অধ্যাদেশ জারি করে দায়মুক্তি আইন বাতিল করে। পরে ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদেও আইনটি চূড়ান্তভাবে রহিত করা হয়। কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় বিতর্ক। কারণ আইনটি বাতিল হলেও এর আওতায় সম্পাদিত সব চুক্তিকে বৈধ বলে গণ্য করা হয়েছে এবং চলমান কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আইন বাতিল হয়েছে, কিন্তু তার মাধ্যমে সৃষ্ট আর্থিক দায়, ব্যবসায়িক সুবিধা এবং বিতর্কিত চুক্তিগুলো বহাল রয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, বিতর্কিত বাতিল আইনের অধীনে সম্পাদিত চুক্তিগুলো কীভাবে অক্ষত থাকে? তাহলে কি কার্যত দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা ও লুটপাটের কাঠামোকেও বৈধতা দেওয়া হলো না? বিষয়টি যেন ঘুম ভাঙিয়ে আবার ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর মতো। আইন বাতিলের মাধ্যমে জনগণকে পরিবর্তনের বার্তা দেওয়া হলো, কিন্তু একই সঙ্গে ওই আইনের অধীনে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকেও বহাল রাখা হলো।

সরকারের যুক্তি, বিদ্যমান চুক্তি বাতিল করলে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদন বন্ধ করে দিতে পারে এবং এতে বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। বাস্তবতার দিক থেকে এই আশঙ্কা অমূলক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি কেবল ভয় ও চাপের কারণ দেখিয়ে অন্যায়কে বৈধতা দিতে পারে? যদি তা-ই হয়, তাহলে ভবিষ্যতে দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি কীভাবে গড়ে উঠবে?

আইনি ও নীতিগত এই দ্বিধার প্রতিফলন এখন সরাসরি জনজীবনের ব্যয়ভার নির্ধারণে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এদিকে সরকার ঘটা করে বাংলাদেশের ‘পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে প্রবেশ’ উদযাপন করছে। প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে মানুষের মধ্যেও নিরবিচ্ছিন্ন ও তুলনামূলক সস্তা বিদ্যুতের স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। মানুষ এখন বিদ্যুতের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন। ফলে যে প্রকল্পকে ঘিরে উল্লাস ছিল, ওই উল্লাসের মধ্যেই বিষাদের সুর ঢুকে পড়েছে।

মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে জ্বালানি তেলের দামও বড় আকারে বাড়ানো হয়েছে। ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে গ্যাসের দামও। এর প্রভাব ইতোমধ্যেই পরিবহন ভাড়া, কৃষি উৎপাদন ব্যয় এবং নিত্যপণ্যের দামে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আবার বিদ্যুতের দাম পাইকারি পর্যায়ে ১৭ শতাংশ থেকে ২১ শতাংশ ও গ্রাহক পর্যায়ে ১৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের সংকট আরও বৃদ্ধি পাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

সাধারণ মানুষ খুব সহজ হিসাব বোঝে। তারা দেখে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে বাসা ভাড়া বাড়ে, কারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, পরিবহন খরচ বাড়ে, কৃষিতে সেচ ব্যয় বাড়ে। বাজারে চাল, ডাল, তেল, সবজি সবকিছুর দাম বাড়ে। অর্থাৎ বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত শুধু পকেটে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পৌঁছে যায় মানুষের পেট পর্যন্ত, সেখান থেকে মগজে। সংসারের হিসাব, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, পুষ্টি—সবকিছুতে এর প্রভাব পড়ে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান রাজনৈতিক বুলি ছিল, ‘কম গণতন্ত্র বনাম বেশি উন্নয়ন’। কিন্তু ওই উন্নয়নের আবরণে যখন সীমাহীন দুর্নীতি, লুণ্ঠন, অস্বচ্ছ চুক্তি এবং জনগণের সম্পদ বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার চিত্র স্পষ্ট হয়েছে, তখন মানুষ রক্ত দিয়েই তার চরম জবাব দিয়েছে। ২০২৪-এর অভ্যুত্থান কেবল একটি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটায়নি, বরং একটি নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে; যেখানে উন্নয়ন মানে কেবল মেগা প্রকল্প নয়, বরং জবাবদিহি, ন্যায়বিচার এবং মানুষের জীবনে বাস্তব স্বস্তি নিশ্চিত করা।

ওই জন-আকাঙ্ক্ষার পথ ধরেই আজ বিএনপি ক্ষমতায়। কিন্তু তারা যদি আবারও পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অস্বচ্ছতা এবং ফ্যাসিবাদের ওই চেনা পথে হাঁটতে শুরু করে কিংবা মানুষের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের আর ফিরে আসার পথ থাকবে না। কারণ মানুষ এখন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন চায়। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে ক্ষমতা হয়তো কিছু সময় টিকে থাকা যায়, কিন্তু তার নৈতিক ও সামাজিক বৈধতা থাকে না। আর কেবল আইনি বৈধতা দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করলে, জনগণের আস্থা অর্জন করা যায় না।

সূত্র : বিডিনিউজ

এলাকার খবর

সম্পর্কিত