ভুয়া নোটিফিকেশন, ‘সিস্টেম আপডেট’ আর রিমোট অ্যাকসেসে খালি হচ্ছে ব্যাংক হিসাব। চট্টগ্রামে ভয়ংকর সাইবার প্রতারণার বিস্তার, কয়েক মাসে শতাধিক অভিযোগ
চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভয়ংকর এক সাইবার প্রতারণার ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। একটি ভুয়া নোটিফিকেশন, একটি ভুল ক্লিক কিংবা অপরিচিত কোনো অ্যাপ ইনস্টল— মুহূর্তের মধ্যেই মোবাইল ফোনের নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে সাইবার অপরাধীদের হাতে। এরপর ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ব্যাংকিং ও ই-ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
প্রতারক চক্রের কৌশল এতটাই নিখুঁত যে অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা বুঝতেই পারছেন না ঠিক কখন তাদের ফোন হ্যাক হয়েছে। কেউ ফোন আনলক করতে পারছেন না, কেউ আবার দেখছেন ফোনটি নিজে নিজেই কাজ করছে। অনেকের মোবাইলে “Installing System Update” লেখা ভেসে ওঠার পরই শুরু হচ্ছে বিপর্যয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সাইবার বিশেষজ্ঞ ও আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অত্যাধুনিক ম্যালওয়্যার, ফিশিং লিংক এবং রিমোট অ্যাকসেস প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র এই অপরাধ চালাচ্ছে। গত কয়েক মাসে শুধু চট্টগ্রাম-এই এ ধরনের প্রতারণার ঘটনায় শতাধিক অভিযোগ আদালত, পুলিশ ও বিভিন্ন তদন্ত সংস্থায় জমা পড়েছে।
যেভাবে কাজ করছে প্রতারক চক্র
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথমে ভুক্তভোগীর মোবাইলে একটি ভুয়া নোটিফিকেশন আসে। সেখানে লেখা থাকে— “আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ ডেবিট হয়েছে”, “জরুরি ভিত্তিতে ব্যালেন্স চেক করুন” অথবা “আপনার ব্যাংকিং সেবা বন্ধ হতে পারে”।
অনেকে আতঙ্কিত হয়ে নোটিফিকেশনটি ক্লিক করেন বা বন্ধ করে দেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ফোনের স্ক্রিনে দেখা যায়— “Installing System Update”। এরপরই মোবাইলের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেন ব্যবহারকারীরা।
সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময়েই ফোনে গোপনে ম্যালওয়্যার প্রবেশ করে। ম্যালওয়্যারটি স্ক্রিন রেকর্ডিং, এসএমএস পর্যবেক্ষণ, নোটিফিকেশন পড়া, এমনকি ব্যবহারকারীর আঙুলের স্পর্শ পর্যন্ত নজরদারি করতে পারে। ফলে ব্যবহারকারী যখন ব্যাংকিং অ্যাপে লগইন করেন, তখন পিন, পাসওয়ার্ড ও ওটিপি সরাসরি প্রতারকদের হাতে চলে যায়।
অনেক ক্ষেত্রে প্রতারকেরা AnyDesk, TeamViewer কিংবা একই ধরনের রিমোট কন্ট্রোল অ্যাপ ব্যবহার করে মোবাইলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এরপর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই টাকা স্থানান্তর করা হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা সহযোগীদের অ্যাকাউন্টে।
ব্যবসায়ীর অ্যাকাউন্ট থেকে উধাও সাড়ে ৭ লাখ টাকা
গত ৭ এপ্রিল সাতকানিয়ার ব্যবসায়ী মো. জামাল উদ্দীনের মোবাইলে একটি রহস্যজনক নোটিফিকেশন আসে। প্রথমে বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে সেটি বাতিল করেন তিনি। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তার ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপডেট হতে শুরু করে।
আপডেট শেষ হওয়ার পর তিনি লক্ষ্য করেন, ফোনের ওপর তার আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। পরে জানতে পারেন, তার জিমেইল ও গুগল পাসওয়ার্ড ম্যানেজারে সংরক্ষিত ব্যাংক হিসাবের তথ্য, পিন কোড ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ডেটা প্রতারকেরা হাতিয়ে নিয়েছে।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, United Commercial Bank (ইউসিবি)-এর লোহাগাড়া ও কেরানীহাট শাখায় থাকা তার হিসাব থেকে ধাপে ধাপে ৭ লাখ ৫২ হাজার ৪৫০ টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং ও আই-ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে একাধিক অপরিচিত অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তর করা হয়।
পাঁচ বছরের সঞ্চয় মুহূর্তেই শেষ
পটুয়াখালীর বাসিন্দা এবং চট্টগ্রাম ইপিজেড-এ কর্মরত আবুল কালাম চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি Dutch-Bangla Bank-এর “NexusPay” অ্যাপে লগইন করে দেখেন, তার দুই লাখ টাকা নেই।
পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সহায়তায় তিনি জানতে পারেন, কুষ্টিয়ার “লিয়া এন্টারপ্রাইজ” নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সিটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তার সঞ্চয়ের পুরো অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে। আবুল কালামের ভাষ্য, “আমি কোনো ওটিপি কাউকে দিইনি। কীভাবে টাকা গেল বুঝতেই পারিনি।”
‘সিস্টেম আপডেট’ দেখিয়ে হাতিয়ে নেয় টাকা
সাতকানিয়ার গাড়িচালক তায়েফ হাসান বিন মাসুদও একই ধরনের প্রতারণার শিকার হন। গত ১ এপ্রিল তার Islami Bank Bangladesh PLC-এর ‘সেলফিন’ অ্যাপ ব্যবহার করে ১ লাখ ৬০ হাজার ৪৬ টাকা তুলে নেয় প্রতারকেরা।
তার ব্যবহৃত OPPO ফোনে হঠাৎ একটি পপআপ মেসেজ আসে। এরপর স্ক্রিনে “Installing System Update” লেখা দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে ফোনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন তিনি।
পরে ব্যাংকে গিয়ে জানতে পারেন, ‘মো. কাওসার আলী’ ও ‘শফিকুল টেলিকম’ নামের দুটি অপরিচিত অ্যাকাউন্টে তার টাকা স্থানান্তর হয়েছে। তায়েফ বলেন, “মোবাইল একেবারে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। পরে জানতে পারি, অ্যাকাউন্ট থেকে সব টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।”
ভুক্তভোগীদের বড় অভিযোগ: মামলা নিতে চায় না থানা
সাইবার প্রতারণার শিকার অনেক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, থানায় গেলে পুলিশ অনেক সময় নিয়মিত মামলা (এফআইআর) নিতে চায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুধু সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নেওয়া হলেও পরবর্তীতে তদন্তে অগ্রগতি দেখা যায় না।
থানাসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অধিকাংশ থানায় সাইবার অপরাধ তদন্তে দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। এছাড়া এসব মামলার তদন্ত দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীদের আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে আদালতের নির্দেশে মামলাগুলো ডিবি, সিআইডি, পিবিআই বা কাউন্টার টেররিজম ইউনিট তদন্ত করে।
আসাদুজ্জামান খাঁন বলেন, “থানায় নিয়মিত মামলা হলে আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হয়। কিন্তু আদালতের নালিশি মামলায় সেই সুযোগ কম থাকে। ফলে প্রতারক চক্র অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।”
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এর কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সভাপতি মুহাম্মদ সানাউল্লাহ চৌধুরী বলেন, “অপরিচিত নম্বর থেকে আসা কোনো লিংকে ক্লিক করা উচিত নয়। এসব লিংকের মাধ্যমে ম্যালওয়্যার ফোনে প্রবেশ করে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে অনেক ব্যবহারকারী গুগল পাসওয়ার্ড ম্যানেজার বা ব্রাউজারে ব্যাংকিং তথ্য সংরক্ষণ করেন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ফোনে ম্যালওয়্যার ঢুকলে এসব তথ্য খুব সহজেই প্রতারকদের হাতে চলে যায়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—
ব্যাংকিং অ্যাপ ছাড়া অন্য কোনো অ্যাপকে “Notification Access” না দেওয়া, ফোনে “Google Play Protect” চালু রাখা, শুধুমাত্র বিশ্বস্ত উৎস থেকে অ্যাপ ইনস্টল করা, ব্যাংকিং অ্যাপে বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ব্যবহার করা, গুগল বা ব্রাউজারে ব্যাংকিং তথ্য সংরক্ষণ না করা, টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখা, সন্দেহজনক কল বা মেসেজ এড়িয়ে চলা।
পুলিশের বক্তব্য
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার জালিয়াতি। কিন্তু সাধারণ মানুষের ডিজিটাল নিরাপত্তা সচেতনতার অভাবের সুযোগ নিচ্ছে প্রতারকেরা। সিএমপির উপ-কমিশনার মোহাম্মদ বদিউজ্জামান বলেন, “বর্তমানে সাইবার অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ভুক্তভোগীদের দ্রুত সহায়তা দিতে সিএমপির উদ্যোগে একটি ‘Cyber Support Center’ চালুর কাজ চলছে।” অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেল বলেন, “অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের অসচেতনতার সুযোগ নিচ্ছে প্রতারকেরা। ফোনে অপ্রয়োজনীয় পারমিশন চালু রাখা এবং অপরিচিত অ্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে তারা মোবাইলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছে।”
অন্যদিকে মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “যেকোনো অপরাধের ঘটনায় মামলা রেকর্ড করার বিষয়ে পুলিশের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।”
সচেতনতা ছাড়া মুক্তি নেই
সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল ব্যাংকিং যত সহজ হচ্ছে, প্রতারণার কৌশলও তত আধুনিক হচ্ছে। প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া এ ধরনের অপরাধ পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। একটি ভুল ক্লিক, একটি ভুয়া নোটিফিকেশন কিংবা একটি অচেনা অ্যাপ— মুহূর্তেই কেড়ে নিতে পারে বহু বছরের সঞ্চয়।