অর্থায়নের কাঠামোয় পরিবর্তনের আলোচনা এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আর্থিক সহায়তা ও অনুদান চেয়েছে সরকার
চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে যৌথ ও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে চায় বাংলাদেশ। উন্নয়ন প্রকল্পে শুধু ঋণ নিয়ে অর্থায়নের পরিবর্তে বিনিয়োগকারী ও বাংলাদেশের যৌথ অংশীদারত্বের ভিত্তিতে নতুন অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা চলছে। বুধবার (১৪ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শেষে এ কথা জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে অর্থায়নের কাঠামোয় পরিবর্তন আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন পর্যন্ত সার্বভৌম ঋণসহ বিভিন্ন ধরনের ঋণভিত্তিক অর্থায়নের ওপর যে নির্ভরতা রয়েছে, তা কমিয়ে ইকুইটি বা মালিকানাভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা ঋণ থেকে সরে এসে ক্রমান্বয়ে বিনিয়োগের দিকে বেশি যাচ্ছি। চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। আমরা আশা করি, এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসবে।”
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে যৌথ বিনিয়োগ ও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগকে গুরুত্ব দিতে চায় সরকার। এতে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে ঋণের পাশাপাশি বিনিয়োগভিত্তিক ব্যবস্থার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সরকারের অর্থনৈতিক নীতিতে বিনিয়োগ বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, শুধু ঋণ নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিবর্তে এমন অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে বিনিয়োগকারী ও বাংলাদেশ যৌথভাবে প্রকল্পের অংশীদার হবে। এ ধরনের উদ্যোগ দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করতে পারে।
তবে চীনের সঙ্গে কোন কোন প্রকল্পে যৌথ বিনিয়োগ হবে, তাতে দুই পক্ষের অংশীদারত্বের অনুপাত কী হবে কিংবা নতুন অর্থায়ন কাঠামো কবে থেকে কার্যকর হবে—এসব বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট ঘোষণা আসেনি। ফলে ঋণনির্ভরতা কমানোর এই উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ আলোচনা ও প্রকল্পভিত্তিক সিদ্ধান্তের ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আর্থিক সহায়তা প্রত্যাশা
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারির প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বাংলাদেশের ঋণ ব্যবস্থাপনা, দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং অনুদানভিত্তিক সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। আমির খসরু বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ছে। দেশটি থেকে উড়োজাহাজ, জ্বালানি ও বিভিন্ন পণ্য আমদানির বিষয় তুলে ধরে বাংলাদেশের জন্য আর্থিক সহায়তা ও অনুদানের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের আমদানি বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় নেওয়া পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও সহায়তা প্রত্যাশা করছে সরকার। এ বিষয়ে মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং তাঁরা এ বিষয়ে একমত হয়েছেন বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কী পরিমাণ অর্থ সহায়তা পাওয়া যেতে পারে, তা অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে কি না কিংবা কোন খাতে সহায়তা আসবে—এসব বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানাননি তিনি।
বৈদেশিক বাণিজ্য ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য ঋণ ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এ পরিস্থিতিতে ঋণের পাশাপাশি অনুদান ও বিনিয়োগভিত্তিক অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে সরকার। তবে এ ধরনের সহায়তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ও শর্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
কৃষি খাতে সহায়তা নিয়ে ইফাদের সঙ্গে আলোচনা
অন্যদিকে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ) প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বাংলাদেশের কৃষি খাতে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষি খাতে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। তবে সম্ভাব্য সহায়তার পরিমাণ, নির্দিষ্ট প্রকল্প কিংবা অর্থায়নের ধরন সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানাননি তিনি।
চীনের সঙ্গে বিনিয়োগভিত্তিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বাড়ানো, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা ও অনুদান প্রত্যাশা এবং ইফাদের সঙ্গে কৃষি খাতের সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা—এই তিন উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে চায় সরকার। তবে এসব আলোচনা থেকে বাস্তব অর্থায়ন, বিনিয়োগ বা প্রকল্প সহায়তা নিশ্চিত হতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও চুক্তির অপেক্ষা করতে হবে।