বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে প্রায় ১১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত হিসাবে, ২০২৫ সালের জুন শেষে দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার। এর আগের মার্চ শেষে এ পরিমাণ ছিল ১১০ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪ দশমিক ০৫ বিলিয়ন বা ৪০৫ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ২০ পয়সা ধরে ১১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারের পরিমাণ প্রায় ১৪ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। তবে বৈদেশিক ঋণের ডলারভিত্তিক স্থিতিকে টাকায় রূপান্তর করলে বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে টাকার অঙ্কও বদলে যেতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ ছিল ১১৩ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে। এ হিসাবে ছয় মাসে ঋণ বেড়েছে প্রায় ১ দশমিক ২৯ শতাংশ। এক বছর আগে, ২০২৪ সালের জুন শেষে মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ১১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বেড়েছে প্রায় ১ দশমিক ২৩ শতাংশ।
ঋণের সাম্প্রতিক বৃদ্ধির প্রধান উৎস সরকারি খাত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন শেষে সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯৫ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারে। মার্চ শেষে এ অঙ্ক ছিল ৯০ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ তিন মাসে সরকারি খাতের ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন বা ৪১৯ কোটি ডলার।
অন্যদিকে একই সময়ে বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ কিছুটা কমেছে। মার্চ শেষে এ খাতের ঋণ ছিল ২০ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার, যা জুন শেষে নেমে এসেছে ১৯ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ তিন মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ কমেছে প্রায় ১৪ কোটি ডলার।
ঋণের মেয়াদ বিবেচনায় মোট বৈদেশিক ঋণের বড় অংশই দীর্ঘমেয়াদি। জুন শেষে মোট ঋণের ৮৭ দশমিক ৫২ শতাংশ বা ১০০ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার ছিল দীর্ঘমেয়াদি ঋণ। স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধের সময় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় তাৎক্ষণিক পরিশোধের চাপ কম হতে পারে। তবে বড় অঙ্কের ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের দায় দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে।
ঋণদাতার ধরন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন শেষে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাছ থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৮ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার। দ্বিপক্ষীয় ঋণ ছিল ৩২ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া বাণিজ্যিক ঋণ ছিল ১০ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ ছিল ৫ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার।
বেসরকারি খাতের ঋণ কমার পেছনে স্বল্পমেয়াদি ঋণ, ক্রেতাঋণ বা বায়ার্স ক্রেডিট এবং বাণিজ্যঋণ কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে মোট বৈদেশিক ঋণের সাম্প্রতিক বৃদ্ধির চাপ মূলত সরকারি খাতেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
১৫ বছরে ঋণ বেড়েছে কয়েক গুণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের উপস্থাপিত ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ২০ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। ২০০৮ সালের শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ২০২৪ সালে দলটির সরকারের পতনের আগে বৈদেশিক ঋণের স্থিতি বেড়ে ১০৪ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। অর্থাৎ ২০০৮ সালের শেষের তুলনায় ২০২৪ সালে বৈদেশিক ঋণের স্থিতি প্রায় ৪ দশমিক ৬ গুণ হয়।
এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও বৈদেশিক ঋণের স্থিতি বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন শেষে ১১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ২০২৫ সালের জুন শেষে বেড়ে ১১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। তবে বিভিন্ন সরকারের সময়ের ঋণ তুলনা করতে হলে শুধু মোট স্থিতি নয়, ঋণ গ্রহণের উদ্দেশ্য, পরিশোধ, অর্থ ছাড়, বিনিময় হার এবং অর্থনীতির আকারের পরিবর্তনও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বৈদেশিক ঋণ বাড়লেই তা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও উৎপাদন খাতে ঋণের অর্থ বিনিয়োগ করে প্রত্যাশিত আয় ও কর্মসংস্থান তৈরি করা গেলে তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে। তবে ঋণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার না হলে, প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বাড়লে কিংবা বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধের দায় দ্রুত বাড়লে অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়।
বাংলাদেশের জন্য এখন বড় প্রশ্ন শুধু বৈদেশিক ঋণের মোট পরিমাণ কত, তা নয়; বরং এই ঋণের বিপরীতে কী পরিমাণ অর্থনৈতিক সুফল তৈরি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সুদ-আসল পরিশোধের সক্ষমতা কতটা রয়েছে। সরকারি খাতের ঋণ দ্রুত বাড়ার প্রেক্ষাপটে প্রকল্পের ব্যয়-সাশ্রয়, বৈদেশিক মুদ্রার আয় বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।