ভারত থেকে ইরান : যেভাবে দুই যুদ্ধে বিশ্বমঞ্চে উত্থান অসীম মুনিরের

সাইফুজ্জামান সুমন
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের অস্ত্রবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে বুধবার সময়সীমা বাড়ানোর ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সিদ্ধান্তের পেছনে যারা তাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন, তিনি তাদের নামও উল্লেখ করেন : পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান অসীম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‌‌‘‘ইরান সরকার মারাত্মকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, এই সত্য এবং পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের অনুরোধের ভিত্তিতে আমাদের হামলা স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে।’’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার চেষ্টার কারণে পাকিস্তানের নেতৃত্ব, বিশেষ করে মুনিরের জন্য এটি ছিল ট্রাম্পের পক্ষ থেকে একেবারে প্রকাশ্য প্রশংসা। গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। পর্দার আড়ালের দীর্ঘ আলোচনার পর এটি সম্ভব হয়, যেখানে অসীম মুনির সরাসরি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে আলোচনা করেন।

পরে ১১ এপ্রিল অসীম মুনির ইসলামাবাদে ভ্যান্সের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রতিনিধিদল এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বাধীন দলকে স্বাগত জানান। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনার প্রথম ধাপ ছিল এটি।

সেই আলোচনায় বড় কোনও সমাধান না আসায় মুনির তিন দিনের সফরে তেহরান যান। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনিই প্রথম কোনও আঞ্চলিক সামরিক নেতা হিসেবে ইরানের রাজধানীতে সফর করেন; যার উদ্দেশ্য ছিল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনা।

বর্তমানে অসীম মুনিরকে একজন ‘শান্তিপ্রণেতা’ হিসেবে ট্রাম্প অভিহিত করলেও এই সামরিক প্রধানের বৈশ্বিক উত্থানের মূলে রয়েছে এক বছর আগের কিছু ঘটনা; যা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের যুদ্ধের সূত্রপাত করেছিল।

গত বছরের ২২ এপ্রিল ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মিরের পেহেলগামের বাইসরান উপত্যকায় হামলায় ২৬ পর্যটক নিহত হন। নিহতদের বেশিরভাগই হিন্দু। ভারত এই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করলেও ইসলামাবাদ তা অস্বীকার করে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানায়। ওই হামলার ঘটনার দুই সপ্তাহের মধ্যে দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটে এক দ্রুত পরিবর্তনের সময় মনে করা হয় পরবর্তী এক বছরকে। মুনির চার তারকা জেনারেল থেকে ফিল্ড মার্শাল এবং পরবর্তীতে দেশটির প্রথম চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস (সিডিএফ) হিসেবে পদোন্নতি পান। দেশটির বিরোধী দলগুলোর সমালোচনা সত্ত্বেও তিনি এখন পাকিস্তানের কয়েক দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মুহূর্তের কেন্দ্রীয় চরিত্রে আবির্ভূত হয়েছেন।

• যে যুদ্ধ বদলে যায় সবকিছু
পেহেলগাম হামলার পর গত বছরের ৭ মে পাকিস্তান ও পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মিরের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ‘অপারেশন সিন্দুর’ শুরু করে ভারত। পাকিস্তানও পাল্টা জবাব দেয় এবং দাবি করে, ভারতের বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। পরবর্তীতে নয়াদিল্লি আংশিকভাবে যুদ্ধবিমান হারানোর কথা স্বীকার করে। ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় ১০ মে অস্ত্রবিরতি হওয়ার আগ পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও কামানের গোলা বিনিময় করে।

ট্রাম্প বারবার এই যুদ্ধ থামানোর কৃতিত্ব দাবি করেন। পাকিস্তান তাকে ধন্যবাদ জানায় এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য তার নাম প্রস্তাব করে। অন্যদিকে, ভারত ট্রাম্পের দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, অস্ত্রবিরতি ছিল পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ফল। ইসলামাবাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বিরোধে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করা নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের নীতি।

পরে ২০ মে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা সর্বসম্মতিক্রমে অসীম মুনিরকে ফিল্ড মার্শাল পদে পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে তার নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মাননা দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে তিনি আইয়ুব খানের পর দেশটির ইতিহাসে দ্বিতীয় কর্মকর্তা হিসেবে ফিল্ড মার্শাল পদমর্যাদা লাভ করেন। তবে আইয়ুব খানের বিপরীতে মুনির সেনাপ্রধানের পদটিও নিজের কাছে রাখেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট অব পিসের (ইউএসআইপি) সাবেক প্রধান ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইমরান খান বলেন, ভারতের সঙ্গে সংঘাত মুনিরের বৈশ্বিক উত্থানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যদিও এর শেকড় ছিল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে তিনি বলেন, গত বছরের মে মাসে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ মুনিরের বিশ্বমঞ্চে উত্থানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মধ্যম শক্তি ও বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার এই যুগে বিষয়টি সবার নজরে এসেছিল। বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের ব্যাপক পশ্চাদপসরণের কারণে পাকিস্তানের বেসামরিক-সামরিক ভারসাম্যহীনতার দিকে কেউই বিশেষভাবে মনোযোগ দেয়নি।

ইমরান খান বলেন, ‘‘তারা একটি পারমাণবিক শক্তিধর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের শক্তিশালী নেতাকে দেখেছে। এর পেছনে ভাগ্যেরও সহায়তা ছিল। পাকিস্তান যখন ভারতের বিরুদ্ধে সক্ষমতা দেখাল, তখন যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায় ট্রাম্প। আর তিনি এমন একজন প্রেসিডেন্ট যিনি শক্তিকে পছন্দ করেন।

• ওয়াশিংটনের দ্বার উন্মোচন
১৮ জুন ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের মধ্যে হোয়াইট হাউসে মুনিরকে মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কোনও বেসামরিক নেতৃত্ব ছাড়াই একজন পাকিস্তানি সামরিক প্রধানের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম একান্ত সাক্ষাতের ঘটনা ছিল এটি।

ওভাল অফিসে নির্ধারিত এক ঘণ্টার চেয়েও দ্বিগুণ সময় ধরে বৈঠক চলে। ট্রাম্প মুনিরকে একজন ‘দুর্দান্ত যোদ্ধা’ এবং ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেন। পরে তিনি প্রকাশ্যে বলেন, পাকিস্তানিরা ‌‘‘ইরানকে অন্য অনেকের চেয়ে ভালো চেনেন।’’

এর ভিত্তি তৈরি হয়েছিল মাসখানেক আগেই। মার্কিন কংগ্রেসে ট্রাম্প জানান, অ্যাবে গেট বোমা হামলার এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সঙ্গে সমন্বয় করেছে পাকিস্তান। সেই সময় ইসলামাবাদও বিরল খনিজ পদার্থ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি সহযোগিতার প্রস্তাবের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে চেয়েছিল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছিল পাকিস্তান; যে কারণে দেশটি ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ও পরে উভয়পক্ষের সঙ্গে কথা বলার মতো বিরল অবস্থানে ছিল।

সেপ্টেম্বরে আবারও ওয়াশিংটন সফরে যান অসীম মুনির। সেখানে ট্রাম্প, ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠক করেন। অক্টোবরে মিসরের শারম আল-শেখ সম্মেলনে গাজা অস্ত্রবিরতি চুক্তির সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের দিকে তাকিয়ে মুনিরকে তার ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে অভিহিত করেন ট্রাম্প।

ইসলামাবাদ-ভিত্তিক সানোবার ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক কামার চিমা বলেন, পেহেলগাম হামলার অনেক আগেই মুনিরের অবস্থান সুসংহত হয়েছিল। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং পাকিস্তানের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছিলেন।

ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ সেই গতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি। চিমা বলেন, ইরানিরা বুঝতে পেরেছে মার্কিনিদের কাছে তাদের বার্তা পৌঁছানোর এবং একটি ভালো চুক্তিতে আসার জন্য মুনিরই সেরা ব্যক্তি।

তবে বিশ্লেষক ইমরান খান মনে করেন, মুনিরের ক্ষমতা সংহতকরণের শুরুটা ছিল আরও আগে; ২০২৩ সালের ৯ মে। সেদিনের দাঙ্গা ও সামরিক স্থাপনায় হামলার ঘটনা তৎকালীন সেনাপ্রধানকে তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সুযোগ করে দিয়েছিল।

ওই দিন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের গ্রেপ্তারের পর সৃষ্ট অস্থিরতায় বিক্ষোভকারীরা লাহোরে কোর কমান্ডারের বাসভবন এবং রাওয়ালপিন্ডিতে জেনারেল হেডকোয়ার্টারসহ সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেন। এর জবাবে সামরিক বাহিনী সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) বিরুদ্ধে ব্যাপক ধরপাকড় এবং বছরব্যাপী দমন-পীড়ন চালায়; যা ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি নির্ণায়ক পরিবর্তন নিয়ে আসে।

• সাংবিধানিক ক্ষমতা সংহতকরণ
গত বছরের নভেম্বরে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে দেশটির সংবিধানের ২৭তম সংশোধনী বিল পাস হয়। এর মাধ্যমে চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস (সিডিএফ) পদটি তৈরি করা হয়, যার দায়িত্ব পান সেনাপ্রধান। এর মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ডিভিশন একই কমান্ডের অধীনে চলে আসে।

এই সংশোধনীর মাধ্যমে ফিল্ড মার্শাল পদটি আজীবনের জন্য স্থায়ী এবং একজন পাঁচ তারকা কর্মকর্তাকে বিচারের হাত থেকে আজীবন দায়মুক্তি দেওয়া হয়। কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের অনুগত বিরোধীদলীয় আইনপ্রণেতাদের প্রতিবাদের মধ্যেই বিলটি সিনেটে ১৬ মিনিটে পাস হয়।

মুনিরের মেয়াদের হিসাবও নতুন করে শুরু হয়। ২০২৭ সালের নভেম্বরে অবসরে যাওয়ার পরিবর্তে তিনি সিডিএফ হিসেবে পাঁচ বছরের নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন; যা অন্তত ২০৩০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হবে। সংবিধানে সংশোধনীয় আনায় পাকিস্তানে বর্তমানে একজন সিডিএফকে অপসারণ করতে পার্লামেন্টের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হলেও একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে সরাতে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট।

দেশটির সরকার বলেছে, ভারতের সঙ্গে চার দিনের সংঘাত থেকে পাওয়া শিক্ষার প্রতিফলন হিসেবে এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং আধুনিক যুদ্ধে সমন্বিত নেতৃত্ব অপরিহার্য।

সানোবার ইনস্টিটিউটের চিমা বলেন, বাইরে থেকে যাকে ক্ষমতার একত্রীকরণ বলে মনে হতে পারে, কিন্তু আমার মতে তা ভিন্ন কিছু।

‘‘সকল প্রতিষ্ঠানই মূলত বিশ্বাস করে যে, সামরিক বাহিনী এমন কাজ করছে যা অন্যরা করতে পারেনি এবং পাকিস্তানের উচিত সেই শক্তির সদ্ব্যবহার করা। জিডিপি বা বিশেষভাবে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক পরিচয়ের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রাসঙ্গিক নয় পাকিস্তান; এর প্রাসঙ্গিকতা নিহিত রয়েছে এর সামরিক বাহিনীর মধ্যে, যা হার্ড পাওয়ার ও সফট পাওয়ার উভয় হিসেবেই কাজ করে।’’

তবে একজন অবসরপ্রাপ্ত থ্রি-স্টার জেনারেল ভিন্ন মত পোষণ করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘‘বাইরের সমর্থন দেশের ভেতরে ক্ষমতা কুক্ষিগত করাকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। কারণ তখন বলা সহজ হয়, ‘‘দেখুন, বিশ্ব আমাদের মডেল পছন্দ করছে’, অথচ দীর্ঘমেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্বল হতে থাকে।’’

• মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানে মধ্যস্থতা
গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর দোহায় হামাসের নেতাদের লক্ষ্য করে একটি ভবনে হামলা চালায় ইসরায়েল। এটি ছিল উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) কোনও দেশে ইসরায়েলের প্রথম হামলা।

আট দিন পর রিয়াদে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে বলা হয়, এক দেশের ওপর হামলা হলে তা অন্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে। অসীম মুনিরকে এই চুক্তির মূল কারিগর হিসেবে দেখা হয়।

ডিসেম্বরে পুনরায় রিয়াদ সফরকালে অসীম মুনির সৌদি আরবের প্রথম শ্রেণির কিং আব্দুল আজিজ পদক লাভ করেন। পদকের প্রশংসাপত্রে বলা হয়, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ এই পদক প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু অসীম মুনির কেবল মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেই সম্পর্ক জোরদার করেন নাই।

২০২৫ সালের মে মাসে মুনির ইরানের সামরিক প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরির সঙ্গে দেখা করেন। এর কয়েক সপ্তাহ পরই ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন বাঘেরি।

ফেব্রুয়ারিতে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে, তখন পাকিস্তান চাপের মুখে পড়ে। একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সীমান্ত ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বন্ধুত্ব।

ইসলামাবাদ বহুমুখী পদক্ষেপ নেয়। মার্চে ট্রাম্পের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেন অসীম মুনির। ৭ মার্চ সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান আল সৌদের সঙ্গে বৈঠক করতে রিয়াদ সফর করেন মুনির। ২৪ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার প্রস্তাব দেয় পাকিস্তান। এর একদিন পর, পাকিস্তানি কর্মকর্তারা ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাব হস্তান্তর করেন।

২৯ মার্চ পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইসলামাবাদে বৈঠক করেন। কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে ১০ দিনের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ইসলামাবাদে মিলিত হন তারা।

ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা আর ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা ঘনিয়ে আসায়, মুনির, ভ্যান্স, উইটকফ ও আরাঘচির মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়। পাকিস্তানের উদ্দেশ্য ছিল কোনও চূড়ান্ত চুক্তি নয়, বরং আলোচনার পথ খোলা রাখা।

যদিও ১১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত প্রথম দফার সরাসরি আলোচনায় কোনও অগ্রগতি হয়নি। তারপরও পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্ব এরপর থেকে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কের উন্নতি সত্ত্বেও নাম প্রকাশ না করার শর্তে আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একজন অবসরপ্রাপ্ত দুই-তারকা জেনারেল বলেছেন, মুনির এবং বৃহত্তর প্রশাসন বুঝতে পেরেছিল, দুর্বল ইরান পাকিস্তানের জন্য সরাসরি সমস্যা তৈরি করবে। তিনি বলেন, ভারত ও ইসরায়েল ‘অপারেশন সিন্দুরে’ একে অপরকে সহযোগিতা করেছে। ইরান দুর্বল হলে আমাদের পশ্চিম সীমান্তেও (ভারতের প্রভাবের কারণে) অস্থিরতা তৈরি হবে।

• অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিভঙ্গি
এসব কূটনৈতিক সফলতার আড়ালে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অবস্থা টালমাটাল। ২০২৫ সালে বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় সহিংসতা গত দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও তার স্ত্রী কারাগারে রয়েছেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার খর্ব হওয়ার বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা দেশটির সমালোচনা করছে।

সংবিধানের ২৭তম সংশোধনী নিয়ে বিরোধী দলীয় বিভিন্ন নেতা ও বিশ্লেষকরা তীব্র সমালোচনা করেছেন। তারা যুক্তি দিয়ে বলেছেন, পাকিস্তানের ইতিহাসে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের কোনও নজির নেই।

বিশ্লেষক ইমরান খান বলেছেন, বৈদেশিক নীতিতে সামরিক বাহিনীর ক্রমবর্ধমান ভূমিকা যতটা না চিন্তার বিষয়, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো মুনিরের মেয়াদের সময়সীমা। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে মুনির কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন, সেই সিদ্ধান্ত কার্যত মুনির নিজেই নেন।

সূত্র : ঢাকা পোস্ট

এলাকার খবর

সম্পর্কিত